
শেষ আপডেট: 10 February 2022 16:48
রূপাঞ্জন গোস্বামী
মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনার্সের পাশেই আছে ধোবি তালাও নামের এক এলাকা। পাশ দিয়ে গিয়েছে দাদাভাই নৌরজি রোড। সেই রাস্তা দিয়ে গেলে চোখে পড়বে ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এক সুরম্য প্রাসাদ। নাম স্যার জামশেদজি জিজিবয় স্কুল অফ আর্টস। সবাই চেনে জেজে স্কুল নামে। জেজে স্কুল হল মুম্বইয়ের সবথেকে প্রাচীন আর্ট স্কুল। ঊনবিংশ শতকে স্কুলটি স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন মুম্বইয়ের বিত্তশালী ব্যবসায়ী জামশেদজি জিজিবয়। ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে অঙ্কন বিভাগ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছিল ভাস্কর্য ও স্থাপত্যবিদ্যা। [caption id="attachment_2431612" align="aligncenter" width="720"]
স্যার জেজে স্কুল অফ আর্ট[/caption]
জেজে স্কুল ১৯৫৮ সালে বিভক্ত হয়ে যায় দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে। গঠিত হয় স্যার জেজে ইন্সটিটিউট অফ আর্ট ও স্যার জেজে কলেজ অফ আর্কিটেকচার। জেজে স্কুলের বিখ্যাত প্রাক্তনীদের তালিকায় আছেন, দাদাসাহেব ফালকে, আকবর পদমসি, মকবুল ফিদা হুসেন, আবিদ সুর্তি, অরুণ কোলাটকর, যতীন দাস, লক্ষ্ণণ পাই, গোবিন্দ সালগাঁওকর, সৈয়দ হায়দর রেজা, অমল পালেকর, নানা পাটেকর সহ আরও অনেকে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।
সপ্তাহের কোনও এক কর্মব্যস্ত দিন
দল বেঁধে জেজে স্কুলে ঢুকছেন ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক অধ্যাপিকারা। অঙ্কন বিভাগের সেই বিশেষ ঘরটিতে অনেক আগেই প্রবেশ করেছে চতুর্থ বর্ষের ছাত্ররা। জোরালো সাদা আলোয় ভেসে যাচ্ছে কয়েক হাজার বর্গফুটের ঘরটি। জনা দশেক ছাত্রছাত্রী কাঠের ফ্রেমে লাগিয়ে ফেলেছে ক্যানভাস। ঘড়ি দেখছেন প্রফেসর। অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছেন একজনের জন্য।
[caption id="attachment_2431617" align="aligncenter" width="680"]
প্রতীকী ছবি[/caption]
যাঁর জন্য সবাই অপেক্ষায়, তিনি ততক্ষণে অটো থেকে নেমে পড়েছেন জেজে স্কুলের গেটে। পেটাই চেহারার কৃষ্ণকায় মধ্যবয়সী মহিলাটি হাঁটতে শুরু করেছেন দ্রুতগতিতে । তিনি জানেন তাঁর জন্য সবাই অপেক্ষা করে আছেন। মহিলাটি ঘরে ঢুকতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন প্রফেসর। হাসি ফুটে ওঠে তাঁর মুখে।
কোনও কথা না বলে মহিলাটি দ্রুত চলে যান ঘরের মাঝখানে রাখা, একটি নিচু টেবিলের দিকে। কাঁধের ব্যাগ মেঝেতে নামিয়ে, বসে পড়েন টেবিলে। মহিলাটির দিকে এগিয়ে আসেন প্রফেসর। মহিলাটিকে প্রফেসর বলেন, "আজ চতুর্থ বর্ষের প্রথম ক্লাস। তাই সহজ ভঙ্গিতে বসতে হবে।" এরপর প্রফেসর দেখিয়ে দেন, কীভাবে মহিলাটি টেবিলে বসবেন। কীভাবে রাখতে হবে পা ও হাত। কতটা বাঁকাতে হবে কোমর। কীভাবে ও কোনদিকে তাকাতে হবে।
[caption id="attachment_2431619" align="aligncenter" width="759"]
প্রতীকী ছবি[/caption]
মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ান মহিলাটি। একে একে খুলে ফেলেন শাড়ি, ব্লাউজ, অন্তর্বাস ও পেটিকোট। প্রফেসরের দেখিয়ে দেওয়া ভঙ্গিতে কাঠের টেবিলে বসে পড়েন সম্পুর্ণ নিরাবরণ লক্ষ্মী আম্মা। ক্যানভাসে কীভাবে নগ্ন লক্ষ্ণীকে ফুটিয়ে তুলতে হবে তা ছাত্রছাত্রীদের বুঝিয়ে দেন প্রফেসর। খুব কাছ থেকে নগ্ন নারী দেখার ঘোর কাটিয়ে ওঠা ছাত্রছাত্রীরা মন দেয় ক্যানভ্যাসে। হাতের পেন্সিল বা চারকোল ক্যানভাসে আওয়াজ তোলে "খস খস" "খস খস"। পাথরের প্রতিমার মত অচল অনড় হয়ে, একই ভঙ্গিতে বসে থাকেন লক্ষ্মী আম্মা।
[caption id="attachment_2431631" align="aligncenter" width="840"]
প্রতীকী ছবি[/caption]
এভাবেই কেটে যায় সাত ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে লক্ষ্মী আম্মাকে বসতে হয়েছে বিভিন্ন ভঙ্গিতে। মাঝে মাঝে মিলেছে অল্প কিছুক্ষণের বিশ্রাম। সেই সময় লক্ষ্মী আম্মা গায়ে ফেলে রেখেছিলেন শাড়ি। কারণ তিনি জানেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার নগ্ন হতে হবে তাঁকে।
মাটুঙ্গার লক্ষ্মী আম্মা
মাত্র ন'বছর বয়সে বাবা মায়ের সঙ্গে তামিলনাড়ু থেকে মুম্বইয়ে এসেছিলেন লক্ষ্মী আম্মা। বাবা মা দিনমজুরের কাজ করতেন। থাকতেন মাটুঙ্গার বস্তিতে। ছোটবেলায় লক্ষ্মী বস্তির মেয়েদের স্কুলে যেতে দেখতেন। স্কুলে যাওয়ার জন্য বায়না করতেন। বাবা মা রাগ করে বলতেন," স্কুলে গিয়ে কী হবে! ওসব পড়াশোনা বাবুদের ছেলে মেয়েদের জন্য।"
খুব কম বয়সে লক্ষ্মীর বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা মা। লক্ষ্মীর স্বামী ছিলেন বদ্ধ মাতাল। লিভারের অসুখে ভুগে মারা গিয়েছিলেন বিয়ের কিছু বছর পর। লক্ষ্মীর ছোট ছেলের বয়স তখন দুই। আকাশ ভেঙে পড়েছিল সদ্যযুবতী লক্ষ্মীর মাথায়। চোখের সামনে থাকা পৃথিবী পালটে গিয়েছিল একদিনের মধ্যে। লক্ষ্মীকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিল বহু হাত।
[caption id="attachment_2431641" align="aligncenter" width="746"]
লক্ষ্মী আম্মা[/caption]
সন্তানদের বাঁচানোর জন্য পাগলের মত চাকরির খোঁজ করা শুরু করেছিলেন দিশেহারা লক্ষ্মী। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন, শরীর না দিলে চাকরি মিলবে না। তাইই হয়েছিল, মাসের পর মাস কেটে গেলেও মেলেনি চাকরি। বাধ্য হয়ে লক্ষ্মী তাই যৌনকর্মীর পেশা গ্রহণ করার কথা ভাবছিলেন।
লক্ষ্মী থাকতেন মাটুঙ্গার সরস্বতী স্কুলের কাছে। তামিল মহিলা রাজাম্মা ছিলেন তাঁর প্রতিবেশী। তিনি মাঝে মাঝে জেজে স্কুলে কাজ করতে যেতেন। কিন্তু কী কাজ তা কোনওদিন লক্ষ্মীকে বলেননি। লক্ষ্মী একটা কাজ খুঁজে দেওয়ার কথা বলেছিলেন রাজাম্মাকে। কিন্তু তিনি লক্ষ্মীর কথায় গুরুত্ব দিতেন না। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনের পর দিন। অর্থের অভাবে প্রায় অনাহারের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিল লক্ষ্মী ও তাঁর শিশু সন্তানেরা।
[caption id="attachment_2431644" align="aligncenter" width="720"]
প্রতীকী ছবি[/caption]
জেজে স্কুলে প্রথম দিন
রাজাম্মাকে অনুসরণ করে লক্ষ্মী একদিন পৌঁছে গিয়েছিলেন জেজে স্কুলে। শাড়ি পরা অবস্থায় রাজাম্মা কাত হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন একটি টেবিলে। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল ছেলেমেয়ের দল। রাজাম্মাকে দেখে তারা কীসব আঁকছিল বড় সাদা কাগজে। সরলমনা লক্ষ্মী অবাক হয়ে রাজাম্মাকে তামিলে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন, "আম্মা এটা কী চাকরি?" অচেনা নারীর কণ্ঠ পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন প্রফেসর। বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, "রাজাম্মা এ কে?" কিছু না ভেবেই রাজাম্মা বলে ফেলেছিলেন,"এ মডেল।"
হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন প্রফেসর। কারণ ফিগারেটিভ পেন্টিং, পোট্রেট, 'অ্যানাটমি অ্যান্ড ফর্ম' ক্লাসের জন্য কমবয়সি লাইভ মডেল বহুদিন ধরে খুঁজছিলেন তিনি। লক্ষ্মীর শারীরিক গঠন পছন্দ হয়েছিল প্রফেসরের। তিনি রাজাম্মাকে বলেছিলেন, লক্ষ্মীকে বিষয়টি ভাল করে বুঝিয়ে দিতে। সবার সামনে নগ্ন হতে হবে শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন লক্ষ্মী। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল ছোট ছোট দুটি সন্তানের মুখ। তাই প্রফেসরের প্রস্তাবে রাজী হয়ে গিয়েছিলেন নিরুপায় লক্ষ্মী।
[caption id="attachment_2431636" align="aligncenter" width="759"]
প্রতীকী ছবি[/caption]
লক্ষ্মীকে পোশাক খুলতে বলেছিলেন প্রফেসর। মুখ নিচু করে শরীর থেকে একে সব পোশাক সরিয়ে ফেলেছিলেন বছর কুড়ির লক্ষ্মী। তারপর মডেলের টেবিলে বসে বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। লক্ষ্মীর দিকে এগিয়ে এসেছিলেন প্রফেসর ও ছাত্রছাত্রীরা। লক্ষ্মীকে তাঁদের দিকে তাকাতে বলেছিলেন প্রফেসর। ঘরে উপস্থিত প্রফেসর ও ছাত্রদের চোখে সামান্যতম লালসা বা বিদ্রুপের আভাস পাননি লক্ষ্মী।
প্রফেসর ও ছাত্রছাত্রীরা বলেছিলেন, তাঁরা লক্ষ্মীর পাশে আছেন। ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনে লক্ষ্মীকে নগ্ন হতে হবে ঠিকই। কিন্তু কেউ কোনওদিন লক্ষ্মীকে সামান্যতম স্পর্শও করবে না। তাঁর কোনও অসম্মান হবে না। লক্ষ্মীর আবার মনে পড়েছিল দুই সন্তানের ক্ষুধার্ত মুখ। ম্লান মুখে প্রফেসরের নির্দেশমত টেবিলে বসে পড়েছিলেন নিরাবরণ লক্ষ্মী।
লক্ষ্মীকে কিছুক্ষণ পরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রফেসর। পেটের তাগিদে লজ্জা বিসর্জন দেওয়ার বিনিময়ে লক্ষ্মী পেয়েছিলেন মাত্র ষাট টাকা। কিন্তু সেই টাকা সেদিন লক্ষ্মীর কাছে ছিল কোটি টাকার থেকেও বেশি। প্রফেসরকে প্রণাম করে, লক্ষ্মী ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছিলেন মাটুঙ্গার দিকে। সন্তানদের পেটে যে সকাল থেকে কিছু পড়েনি।
[caption id="attachment_2431655" align="aligncenter" width="1200"]
মাটুঙ্গার বস্তিতে থাকেন লক্ষ্মী আম্মা[/caption]
কেটে গিয়েছে তিরিশ বছর
নিয়মে লক্ষ্মী আম্মা এখন প্রৌঢ়া। বছরে ছ'মাস জেজে স্কুল থেকে ডাক আসে। তাও রোজ নয়। যেদিন ক্লাস থাকে সেদিন। তখন পোশাক খুলে বসতে হয় ন্যুড পেন্টিং রুমের টেবিলে। বাকি ছ'মাস বিভিন্ন চিত্রশিল্পীর স্টুডিওতে লক্ষ্মী আম্মা ঘুরে বেড়ান কাজের আশায়। কখনও মেলে কখনও মেলে না।
নগ্ন হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার সময়, লক্ষ্মী আম্মার ঘাড় পিঠ কোমরে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। টান ধরে পেশীতে। তবুও নড়েন না লক্ষ্মী আম্মা। কারণ লক্ষ্মী জানেন, নড়লে তাঁর শরীরের খাঁজগুলি পালটে যাবে। বিফল হয়ে যাবে ছাত্রছাত্রীদের এতক্ষণের পরিশ্রম। তাই যন্ত্রণা সহ্য করে প্রস্তরীভূত অহল্যা হয়ে বসে থাকেন লক্ষ্মী আম্মা। স্বেচ্ছায় হারিয়ে যান সাংসারিক চিন্তার সাগরে। জীবনযন্ত্রণার ঢেউগুলির নিচে ডুবে যায় লক্ষ্মী আম্মার শারীরিক যন্ত্রণা।
[caption id="attachment_2431661" align="aligncenter" width="450"]
প্রতীকী ছবি[/caption]
জেজে স্কুলে কী কাজ করেন, লক্ষ্মী তা কোনওদিনও কাউকে জানাতে পারেননি । সন্তানদের বলতেন তিনি জেজে স্কুলে সাফাইয়ের কাজ করেন। কিন্তু প্রতিবেশীদের কানে কোনওভাবে পৌঁছে গিয়েছিল লক্ষ্মীর কাজের খবর। অশ্লীল গালিগালাজ, টিটকিরি থেকে ঠাট্টা তামাসা, বাদ যায়নি কিছুই। সমাজের চোখে লক্ষ্মী হয়ে গিয়েছিলেন নষ্ট নারী। রাস্তায় বেরোলে পিছু পিছু আসত লম্পটের দল। কিন্তু লক্ষ্মীর কঠোর চোয়াল ও হিমশীতল চাউনি দেখে পিছিয়ে যেত।
নিজের হাতে সাজিয়েছিলেন ভবিষ্যতের চিতা
বছর দশেক আগে একটি স্থায়ী চাকরি পেয়েছিলেন লক্ষ্মী। আকাশ ভেঙে পড়েছিল প্রফেসর ও ছাত্রছাত্রীদের মাথায়। তাঁদের আশ্বস্ত করে লক্ষ্মী বলেছিলেন, কাজটি তিনি নেবেন না। লক্ষ্মী জানেন, তিনি চলে গেলে ছেলেমেয়েদের ন্যুড স্টাডির ক্লাসই বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ এই নিষিদ্ধ পেশায় আসতে চায়না কেউই।
ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে সেদিন লক্ষ্মীকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, "লক্ষ্মী আম্মা তুমি আমাদের কাছে সত্যিই দেবী লক্ষ্মী।" এরপর আর কোনওদিন, অন্য কোনও কাজের চেষ্টা করেননি লক্ষ্মী আম্মা। আগামীদিনের বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের সাফল্যের পথ নিজের চোখের জলে ধুয়ে দিয়েছেন। নিজের ভবিষ্যতের চিতা সাজিয়ে।
আরও পড়ুন: অর্ধনগ্ন নারী, শরীরে লেপটে আছে ভিজে শাড়ি, ক্যানভাসে বিদ্রোহ করেছিলেন হেমেন মজুমদার
তবে আজ আর ছাত্রদের সামনে নগ্ন হতে লজ্জা পান না লক্ষ্মী আম্মা। তিনি জানেন, শিক্ষার জন্য ডাক্তারির ছাত্রদের যেমন দরকার তাজা লাশ। ঠিক তেমনই ফাইন আর্টসের ছাত্রছাত্রীদের চাই রক্ত মাংসের নগ্ন নারী ও পুরুষ। প্রত্যেক বছর নতুন ব্যাচের ছেলে মেয়েরা ন্যুড পেন্টিং রুমে আসে। তারা লক্ষ্মীকে ভীষণ ভালোবাসে।একবার লক্ষ্ণীর বড় ছেলে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পড়েছিল। নিজেদের টাকা খরচ করে ও রক্ত দিয়ে লক্ষ্মী আম্মার ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলেছিল ছাত্রছাত্রীরা।
হঠাৎ এসেছিলেন প্রচারের আলোয়
পুরোনো ছাত্রছাত্রীরা জেজে স্কুলে এলে আজও লক্ষ্মী আম্মাকে খোঁজেন। আগের মতই নিয়ে যান চা নাস্তা খাওয়াতে। এভাবেই একদিন স্কুলে এসেছিলেন স্কুলের প্রাক্তনী ও বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার রবি যাদব। ১৯৯৫ সালে, ছাত্র থাকা অবস্থায় লক্ষ্মী আম্মার ন্যুড স্টাডি করেছিলেন তিনি। ভাইয়া রবির সঙ্গে সেদিন অনেক পুরোনো গল্প করেছিলেন লক্ষ্মী আম্মা। বাকিটা ইতিহাস। মারাঠি ভাষায় রবি যাদব বানিয়েছিলেন লক্ষ্মী আম্মার বায়োপিক 'ন্যুড'। ২০১৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল সিনেমাটি।
[caption id="attachment_2431664" align="aligncenter" width="700"]
লক্ষ্মী আম্মার বায়োপিক 'ন্যুড'[/caption]
সেই সময়, সামান্য কিছুদিনের জন্য প্রচারের আলো পড়েছিল লক্ষ্মী আম্মার শরীরে।সিনেমাটির মাধ্যমে লক্ষ্মী আম্মার ছেলেরা জেনেছিল তাদের মায়ের জীবনযুদ্ধের কাহিনি। লক্ষ্মী আম্মা ভেবেছিলেন, সবকিছু জানার পর প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা তাঁকে ঘৃণার চোখে দেখবে। কিন্তু সিনেমাটি দেখার পর লক্ষ্মী আম্মাকে জড়িয়ে ধরেছিল ছেলেরা। জীবনের সবথেকে বড় আতঙ্ক থেকে সেদিন মুক্তি পেয়েছিলেন লক্ষ্মী আম্মা।
আজ গ্রাস করছে এক নতুন আতঙ্ক
সাতঘণ্টার একটি সিটিংয়ের জন্য আজ লক্ষ্মী আম্মা পান মাত্র চারশো টাকা। সেটাও চলে যেতে বসেছে। অনেক প্রফেসর বলতে শুরু করেছেন, ফিগারেটিভ পেন্টিং ও পোট্রেট ক্লাসের জন্য উপযুক্ত মডেল জেজে স্কুলে নেই। যে কয়েকজন পুরুষ ও নারী মডেল আছেন, তাঁদের বয়স চল্লিশ ও পঞ্চাশের কোঠায়।
ছাত্রছাত্রীরা এই সব পুরোনো মডেলদের পুরোনো পেন্টিং দেখে মডেলদের শরীরের রহস্য জেনে ফেলছে। তাই ন্যুড স্টাডি করার আগ্রহ কমে গিয়েছে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। পুরোনো হয়ে যাওয়া শরীরগুলি নিয়ে নতুন কিছু শেখানোর আগ্রহ কমে গিয়েছে প্রফেসরদেরও। তাই খোঁজ চলছে কমবয়সি নারী ও পুরুষ মডেলের।
[caption id="attachment_2431668" align="aligncenter" width="966"]
প্রচারের আলোয় এসেছিলেন সামান্য কিছু দিনের জন্য[/caption]
"নাই বা পেলাম টাকা, অমর হয়ে থেকে গেলাম"
লক্ষ্মী আম্মা জানেন, তাঁর ন্যুড ক্লাসের অনেক ছাত্রছাত্রীই বিখ্যাত হয়েছে ছবি এঁকে। লক্ষ্মীর আম্মারই ন্যুড পেন্টিং নিলামে বিক্রি হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকায়। ঠাঁই পেয়েছে বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি, শিল্পপতির ড্রইংরুম বা হোটেলের সবথেকে দামী স্যুটে। কিন্তু তার জন্য কোনওদিন একটি টাকাও দাবি করেননি লক্ষ্মী আম্মা।
যে সব চিত্রশিল্পীরা ব্যাক্তিগত স্টুডিওতে লক্ষ্মী আম্মাকে ডাকতেন। আজ তাঁদের ফোন আসাও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও ধরে আসা গলায় লক্ষ্মী আম্মা বলেন, "নাই বা পেলাম টাকা, অমর হয়ে থেকে গেলাম ছবিগুলির মধ্যে। এ ভাগ্য ক'জনের হয়!"
তবুও আজ যখন ন্যুড পেন্টিং রুমের টেবিলে নগ্ন হয়ে বসেন লক্ষ্মী আম্মা, তাঁকে গ্রাস করে ভবিষ্যতের আতঙ্ক। খুবই কম টাকা পেতেন, তাই তেমন কোনও সঞ্চয় করতে পারেননি। যেটুকু জমিয়েছেন, কাজ না থাকলে সেটুকুও ফুরিয়ে যাবে কয়েক মাসের মধ্যে।
পুরোনো প্রফেসরদের মুখ থেকে শুনেছেন, তাঁর আগে কাজ করে যাওয়া মডেলদের মর্মান্তিক পরিণতির কথা। কাউকে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে রাস্তায় ঘুরতে দেখা গিয়েছে। কাউকে দেখা গিয়েছে ফ্লাইওভারের নিচে ভিক্ষা করতে। কাউকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে ফুটপাথে। তাহলে কি লক্ষ্মী আম্মারও ঠিকানা হতে চলেছে ফুটপাথ! ময়লা চটের নীচে শুয়ে থাকা অবস্থায় আসতে চলেছে নির্মম মৃত্যু!
টেবিলে বসে বাস্তবজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, আতঙ্কের সাগরে ডুবতে থাকা লক্ষ্মী আম্মা। তাঁর শুকিয়ে আসতে থাকা শরীর, যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ ও আতঙ্কিত চাউনি ছাত্রছাত্রীদের ক্যানভাসে জন্ম দেয় অনন্য কিছু চিত্রের। লক্ষ্মী আম্মার চোখের জলে ধোওয়া সে সব ক্যানভাস হয়ত কোনওদিন বিক্রি হবে লক্ষ লক্ষ টাকায়।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'