
শেষ আপডেট: 22 January 2019 12:36
'নয়া লোগ' দৈনিকে সেই হেডিং[/caption]
দাবানলের আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লো খবরটি ভারত জুড়ে। জাতীয় সংবাদ মাধ্যম ছুটে গেলো অযোধ্যা-ফৈজাবাদে। নেতাজির মৃত্যু রহস্য, সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য। আর এই রহস্যটির সঙ্গে সবার অলক্ষে জড়িয়ে গেলো আরেকটি রহস্য, যা এখনও ভেদ করা সম্ভব হয়নি। হয়তো কোনও দিন সম্ভবও হবে না। তবুও, উত্তর ভারতের অনেক মানুষ একটা কথা মানেন। অযোধ্যা-ফৈজাবাদে লোকচক্ষুর অন্তরালে বসবাসকারী গুমনামি বাবা ওরফে ভগবানজীই হলেন ভারত মায়ের বীর সন্তান, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
এরপরে গুমনামি বাবার খোঁজ মেলে ১৯৮২ সালে উত্তরপ্রদেশেরই ফৈজাবাদে। ফৈজাবাদের অভিজাত ও প্রভাবশালী সিংহ পরিবারের আলিশান ম্যানসনের পিছনে ছিলো বেশ কয়েকটি ছোট একতলা বাড়ি। বাড়িগুলি ভাড়া দিতেন সিংহ পরিবার। ১৯৮২ সালে এক স্থানীয় ডাক্তার, এরই একটি বাড়ি ভাড়া নেন এক সাধুবাবার নামে। ৩০০ স্কোয়ার ফুটের বাড়িটির ভাড়া ৪০০ টাকা। বাড়িটিতে এসে ওঠেন সেই দীর্ঘদেহী, বিরলকেশ, শ্মশ্রুমণ্ডিত, ধবধবে ফরসা চেহারার গুমনামি বাবা। মৃত্যুর পর্যন্ত এই বাড়িতেই বাস করেছেন গুমনামি বাবা।
১৯৮৫ সালে গুমনামি বাবার মৃত্যুর পর, সিংহ পরিবারের সদস্য ও বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ প্রকাশ্যে আনেন অজ্ঞাতবাসে থাকা গুমনামি বাবার কাহিনী। গুমনামি বাবাই নেতাজি, একথা জোর দিয়ে জানালেও শক্তি সিংহ জানিয়েছিলেন, তিনি জীবনে বাবার মুখ দেখেননি। কারণ বাবা সারাক্ষণ ঘরেই থাকতেন। খুব সামান্য লোকেরই তাঁর ঘরে প্রবেশাধিকার ছিলো।
শক্তি সিংহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, "তিনি সব সময় আমাদের সঙ্গে জানলা দিয়ে কথা বলতেন। তাঁর মুখ দেখা যেত না"। বাবা নাকি রোলেক্স ঘড়ি পছন্দ করতেন, দামী ৫৫৫ সিগারেট খেতেন, তাঁর কাছে আনকোরা নোটও দেখেছেন কেউ কেউ। মাটন কিমা খেতে ভালোবাসতেন। পছন্দ করতেন বাঙালিদের প্রিয় শুক্তো।
[caption id="attachment_73025" align="aligncenter" width="640"]
বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ[/caption]
গুমনামি বাবাই নেতাজি, এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক অশোক ট্যান্ডন৷ তিনি বলেছিলেন, নেতাজির অনেক আত্মীয় রাম ভবনে এসে নাকি ‘গুমনামি বাবা’র সঙ্গে দেখা করে যেতেন৷ তিনি দাবি করেছিলেন, ১৯৮৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গুমনামি বাবার মৃত্যুর পরে সিংহ পরিবারের পক্ষ থেকে নেতাজির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নেতাজির ভাইঝি ললিতা বসু, গুমনামি বাবার বাসভবনে (রাম ভবন) এসেছিলেন৷
গুমনামি বাবার ঘরে প্রবেশ করে, বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে ললিতা দেবী নাকি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এবং তিনি স্বীকার করেছিলেন ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলি সবই তাঁর কাকা নেতাজি সুভাষের। এরপরে ললিতা বসু গুমনামি বাবার আসল পরিচয় জানতে চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন ৷
পাশে পেয়েছিলেন ‘সুভাষ চন্দ্র বসু বিচার মঞ্চ’ নামে স্থানীয় একটি একটি সংগঠনকে৷ আদালত বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে একটি বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠনের নির্দেশ দেয়৷ গুমনামি বাবার ঘর থেকে বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ২৪টি ট্রাঙ্কে করে চলে যায় ফৈজাবাদ জেলা ট্রেজারির ডাবল লক সেকশনে।
[caption id="attachment_72998" align="aligncenter" width="759"]
খোলা হচ্ছে ট্রাঙ্ক[/caption]
গুমনামি বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র[/caption]
একটি বাঁধানো ছবি ছিলো, সেটি নেতাজীর পিতা জানকীনাথ ও মাতা প্রভাবতীর। এছাড়াও ছিলো ভাইবোনদের সঙ্গে ছোটবেলায় নেতাজীর ছবি। তিনটে 'হাফ-বেন্ট ডাবলিন' ধূমপানের পাইপ। জার্মানি ও ইতালির সিগার। গোল ফ্রেমের চশমা, বাইনোকুলার, রোলেক্স অয়েস্টার পার্পেচ্যুয়াল ঘড়ি, স্পুল ক্যাসেট টেপ রেকর্ডার, পোর্টেবল বেলজিয়ান টাইপরাইটার, একটি রেডিও। এছাড়াও ছিলো ভারতীয় রাজনীতির ওপরে লেখা অজস্র বই। সুভাষচন্দ্রের জীবনীমূলক বই। আর ছিলো স্বাধীনতার আগের ও পরের বহু সংবাদপত্র ও আনন্দবাজার পত্রিকার বিপুল সংগ্রহ।
বাক্সগুলিতে পাওয়া গিয়েছিল, প্রচুর চিঠিপত্র ও নথি। নথির মধ্যে ছিলো, আজাদ হিন্দ ফৌজের পরিচিতদের তালিকা ও হাতে আঁকা সাইবেরিয়ার মানচিত্রও। এর মধ্যে বেশকিছু বই অজ্ঞাত কোনও ‘বোন'-এর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন গুমনামি বাবা। পাওয়া গেছিলো বেশ কয়েকটি টেলিগ্রাম। যেগুলো দুর্গা পুজো এবং ২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষে গুমনামি বাবাকে পাঠিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রবীণ সেনানায়করা।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকর[/caption]
জাস্টিস সহায় ও জাস্টিস মুখার্জী (ডান দিকে)[/caption]
গুমনামি বাবা কী নেতাজি? এ প্রসঙ্গে কী বলছে মুখার্জী কমিশন? ওপেন প্ল্যাটফর্ম ফর নেতাজি'র মুখপাত্র সায়ক সেন তথ্য জানার অধিকার আইনের মাধ্যমে এই প্রশ্নটির উত্তর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছিলো, গুমনামি বাবা ও ভগবানজির সম্বন্ধে কিছু তথ্য মুখোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টের ১১৪-১২২ পাতায় রয়েছে। মুখার্জী কমিশন তার সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, গুমনামি বাবা ওরফে ভগবানজি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন না।
নেতাজি কন্যা অনিতা বসু পাফ[/caption]
এটিও ছিলো গুমনামি বাবার সংগ্রহে[/caption]
৫) নেতাজির অন্তর্ধানের চার বছর পর, কলকাতার গোয়েন্দা অফিসার অনিল ভট্টাচার্য একটি সিক্রেট নোট লিখেছিলেন। তাতে লেখা ছিলো "ধারওয়ার (বম্বে) হইতে ভিড়াইয়া রুদ্রাইয়া কাম্বলি শ্রী শরৎ বসুকে জানাইতেছে যে, ‘সাধু' ভাল আছে। এবং স্ট্যালিন কবে ভারতে আসিবে লেখক তাহা জানিতে চাহিতেছে"। এই নোটের অর্থ কী ও সাধু কে? তিনি কী গুমনামি বাবা?
৬) গুমনামি বাবার দাঁতের DNA এবং বসু পরিবারের কিছু সদস্যের রক্তের DNA পরীক্ষা করা হলেও কোন মিল পাওয়া যায়নি। মুখার্জী কমিশন এই তথ্যটি কমিশনের রিপোর্টে পেশ করেছিলেন! পরবর্তীকালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে মুখার্জী কমিশনের দেওয়া DNA সংক্রান্ত রিপোর্টকে কেন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছিলেন ?
৭) কীসের ভিত্তিতে অখিলেশ যাদব সরকার তদন্ত কমিশনের জন্য সাড়ে ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল?
৮) সহায় কমিশন জানিয়েছিল, কংগ্রেস সরকারের এক মন্ত্রী গুমনামি বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। রবীন্দ্র শুক্লা নামে এক ব্যক্তি, কমিশনে একথা জানিয়েছিলেন। সেটা ছিল ১৯৮১-৮২ সালের ঘটনা। রবীন্দ্র শুক্লাকে গুমনামি বাবা বলেছিলেন, এক বাঙালি ভদ্রলোককে এক জায়গায় পৌঁছে দিতে। সেই ভদ্রলোককে রবীন্দ্র শুক্লা নিজের মোটরসাইকেলে চড়িয়ে বাজারে নিয়ে যান। কানহাইয়া লাল বলদেবের দোকান থেকে কাপড়ও কেনেন সেই ভদ্রলোক।
এরপর রবীন্দ্র শুক্লা তাঁকে বিড়লা ধরমশালায় নামিয়ে দেন। পরে রবীন্দ্র শুক্লা টেলিভিশনে দেখে বুঝতে পারেন সেই ভদ্রলোক আসলে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এই তথ্য লিখিত ভাবে রবীন্দ্র শুক্লা সহায় কমিশনকে জানিয়েছিলেন। গুমনামি বাবার কাছে গোপনে কেন গিয়েছিলেন কংগ্রেস সরকারের এই বাঙালি মন্ত্রী?
৯) বিশেষজ্ঞরা গুমনামি বাবার হস্তাক্ষরের সঙ্গে নেতাজির হাতের লেখার মিল পেয়েছিলেন ? নেতাজি ও গুমনামি বাবার হস্তাক্ষরের অস্বাভাবিক মিল কি নিছকই কাকতালীয়?
[caption id="attachment_73005" align="aligncenter" width="720"]
সরযূর তীরে গুমনামি বাবার সমাধি[/caption]
১০) গুমনামি বাবা যদি ভারতীয় সাধু হন, সমকালীন ভারত ও বিশ্ব-রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করতেন কেন?
১১) গুমনামি বাবার সংগ্রহে স্বাধীনতার আগের ও পরের বহু সংবাদপত্র ছিলো। তার মধ্যে প্রচুর লাইন কেন পেন দিয়ে কেটে দিয়েছিলেন বাবা?
১২) বাবার সংগ্রহে প্রচুর বিদেশি বই ছিল। এর মধ্যে বেশকিছু বই উপহার পেয়েছিলেন এক অজ্ঞাত ‘বোন'-এর কাছ থেকে। কে এই 'বোন'?
১৩) গুমনামি বাবা সর্বত্যাগী ভারতীয় সাধু হলে কী ভাবে নির্দ্বিধায় দামী দামী জিনিসপত্র ব্যাবহার করতেন এবং আমিষ খেতেন? বিদেশি টাইপরাইটার-বাইনোকুলার-ক্রোনোমিটার-কম্পাস ও প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ নথি একজন সাধুর কী কাজে লাগে?
১৪) নেতাজির সহযোদ্ধা লীলা রায় ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির গোয়েন্দাকর্তা পবিত্রমোহন রায়ের সঙ্গে ১৯৬০-এর দশক থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাবার সম্পর্ক ছিল কেন?
১৫) ২০১০ সালে, এক ডকুমেন্টারি ছবিতে মুখার্জী কমিশনের জাস্টিস মুখার্জী, অফ-ক্যামেরা কেন বলেছিলেন তিনি "100 per cent sure", যে তিনিই (গুমনামি বাবা) নেতাজি।
১৬) নেতাজির পরিবারের কেউ মানতে চান না যে গুমনামি বাবাই নেতাজি। তাহলে তাঁদের পরিবারের ললিতা বসুর বক্তব্য বাকিদের সঙ্গে মেলেনি কেন?
১৭) একটি মানুষের মৃত্যুর আগের বা পরের একটিও ছবি নেই কেন? রেশন কার্ড বা অন্য কোনও সরকারি নথি ছিল না কেন?
১৮) গুমনামি বাবাকে অর্থ সাহায্য করতেন কারা?
১৯) ১৯৬৩ সালে খবরের শিরোনামে আসেন শৌলমারীর এক সাধু কে কে ভাণ্ডারী। যাঁরা সেই সাধুকে দেখেছেন তাঁরা জানিয়েছিলেন সেই সাধু আর কেউ নন‚ স্বয়ং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস। কিন্তু অচিরেই এই দাবি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু আজও কেন ঘুরে ফিরে আসছে গুমনামি বাবার নাম?
২০) ভারতেই ছিলেন, অথচ আজও জানা গেলো না গুমনামি বাবা কে? তাঁর আদি নিবাস কোথায়? কী তাঁর আসল নাম? তাঁর পদবীই বা কী?
২১) রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকরের মতো মানুষ যখন গুমনামি বাবাকে চিঠি লিখছেন। তিনি কি সাধারণ কোনও মানুষ হতে পারেন?
২২, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকর চিঠিতে গুমনামি বাবাকে 'বিজয়ানন্দজী' বলে সম্বোধন করেছিলেন কেন? গুমনামি বাবার আশ্রমিক নাম কি বিজয়ানন্দ? কোনও আশ্রম থেকে তিনি দীক্ষা নেন? তাঁর দীক্ষাগুরু কে ছিলেন?
২৩) অন্যান্য সাধুর মতো গুমনামি বাবার কোনও সন্ন্যাসী চেলার সন্ধান মেলেনি কেন? কেন তাঁর ভক্তরা সবাই গৃহী?
[caption id="attachment_73052" align="aligncenter" width="702"]
আজও নেতাজি জাতির মননে চিরজাগ্রত[/caption]
প্রশ্নগুলির উত্তর সম্ভবত পাওয়া যাবে না। তবে, আজন্ম স্বাধীনচেতা, উন্নতশির, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, তাঁরই স্বাধীন করা দেশে কাপুরুষের মতো গুমনামি বাবা হয়ে অজ্ঞাতবাসে থাকবেন, এটাও মানা সম্ভব নয়।
কারণ, তিনি জনসমক্ষে এসে আহবান করলে, কোটি কোটি ভারতবাসী সব ফেলে ছুটে যেতেন তাঁর কাছে। উত্তাল হয়ে উঠতো আসমুদ্র হিমাচল। লালকেল্লায় তিনিই উত্তোলন করতেন জাতীয় পতাকা। নিবন্ধটির শেষে মূল প্রশ্ন একটাই উঠে এলো। যিনি জীবনে বলেননি তিনিই নেতাজি, সেই গুমনামি বাবা যদি নেতাজি নাই হন, তিনি তবে কে ??
[caption id="attachment_73492" align="alignright" width="127"]
রূপাঞ্জন গোস্বামী[/caption]