
শেষ আপডেট: 15 January 2021 09:59
তৈরি হবে, তেমনটা নয়। তবে সংক্রমণজনিত জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমবে। এবারে যে প্রশ্নটা মাথা চাড়া দিয়েছে, তা হল করোনার নতুন স্ট্রেন কি ভ্যাকসিনে কাবু হবে?
ফাইজার, মোডার্না, অক্সফোর্ড সহ বিভিন্ন ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থা ও রিসার্চ ইউনিটগুলির দাবি, ভ্যাকসিন এমনভাবে বানানো হয়েছে যা করোনার সুপার-স্প্রেডার জিনও নষ্ট করতে পারে। বিশেষত, ডিএনএ ভ্যাকসিন, আরএনএ প্রযুক্তিতে তৈরি ভ্যাকসিন, অ্যাডেনোভাইরাসকে ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি ভ্যাকসিন, ইনঅ্যাকটিভ ভ্যাকসিন ইত্যাদিন ছোঁয়াচে স্ট্রেন নির্মূল করার ক্ষমতা রাখে। ফাইজার তো বলেই দিয়েছে, এই টিকায় কাজ না হলে করোনার নতুন স্ট্রেন নষ্ট করার মতো এমআরএনএ (মেসেঞ্জার আরএনএ)টিকা তারা কম দিনেই বানিয়ে ফেলতে পারবে। এখন দেখে নেওয়া যাক, এই নতুন স্ট্রেন আসলে কী, কতটা সংক্রামক, কীভাবে ভ্যাকসিনে নষ্ট হতে পারে।
দুই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথম মিউটেশনকে বলা হচ্ছে N501Y। এটি এক ধরনের মিউটেশন যেখানে দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনের ACE-2 সঙ্গে ভাইরাসের স্পাইক (S) প্রোটিনের জোট বাঁধার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ৬৯-৭০Del মিউটেশন। মানে হল স্পাইক প্রোটিনের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি বদল ঘটিয়েছে ভাইরাস। স্পাইক প্রোটিন অসংখ্য অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি। যার মধ্যে ৬৯ ও ৭০ নম্বর অ্যামাইনো অ্যাসিডের কোড একেবারে মুছে দিয়েছে ভাইরাস। সহজ করে বলতে হলে, স্পাইক প্রোটিনের ভেতরে দুটি অ্যামাইনো অ্যাসিডের অস্তিত্বই মিটিয়ে দিয়েছে। এর কারণ একটাই, মানুষের দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনকে ফাঁকি দিয়ে ঝপ করে কোষের ভেতরে ঢুকে পড়া। গবেষকরা এমনও বলছেন যে, ১৭ রকমের বদল হয়ে ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের চেহারাই নাকি বদলে গেছে।
করোনা সংক্রমণের সব উপসর্গই থাকতে পারে। আবার রোগী অ্যাসিম্পটোমেটিক বা উপসর্গহীনও হতে পারে। তবে সাতটি মূল লক্ষণ দেখে সতর্ক হতে হবে, যেমন—অবসাদ, খিদে কমে যাওয়া, তীব্র মাথা যন্ত্রণা, পেট খারাপ, মানসিক বিভ্রান্তি, পেশির ব্যথা, ত্বকে জ্বালাপোড়া ব্যথা বা র্যাশ।
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষকরাও বলেছেন, এই উপসর্গগুলি দেখা গেলেই বুঝতে হবে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। আর যদি বিদেশ ভ্রমণ করে থাকেন, তাহলে লালারসের নমুনার জিনোম সিকুয়েন্স করিয়ে নিতে হবে। কারণ, নতুন স্ট্রেন অনেক সময়েই রিয়েল টাইম আরটি-পিসিআর টেস্টে ধরা পড়ে না।
সম্পূর্ণ ভাইরাস (Whole Virus) নিয়ে তৈরি ভ্যাকসিন দু’রকম হয়। প্রথমত, আস্ত ভাইরাসকে দুর্বল করে তার থেকে ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট ডিজাইন করা হয়। এই ভ্যাকসিন শরীরে ঢুকলে ভাইরাল স্ট্রেন প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে, কিন্তু কোনও সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে না। দ্বিতীয়ত, ভাইরাসের জিনের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে ভ্যাকসিন তৈরি হয় যা শরীরে ঢুকলে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না। তবে ইমিউন সিস্টেমকে চাঙ্গা করে তোলে। দুরকম ভ্যাকসিনেরই কাজ হল শরীরের বি-কোষ ও টি-কোষকে সক্রিয় করে ইমিউন রেসপন্স বা রোগ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলা।
ভাইরাসের প্রোটিন (Protein Subunit) (করোনার ক্ষেত্রে স্পাইক প্রোটিন) আলাদা করে ল্যাবরেটরিতে বিশেষ উপায় বিশুদ্ধ করে ভ্যাকসিন তৈরি হয়। যেহেতু সংক্রামক প্রোটিন দিয়ে ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট তৈরি হয় তাই এর সঙ্গে অ্যাডজুভ্যান্ট বা ইমিউনো মডুলেটর যোগ করা হয়। অ্যাডজুভ্যান্ট প্রোটিনের খারাপ গুণগুলো ঢেকে দেয়। ভ্যাকসিনের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে দেয় না।
নিউক্লিক অ্যাসিড (Nucleic Acid) থেকে তৈরি ভ্যাকসিন দুরকম—ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) ভ্যাকসিন ও আরএনএ (রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড)ভ্যাকসিন। আরএনএ বা মেসেঞ্জার আরএনএ নিয়ে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে আমেরিকা মোডার্না ও ফাইজার।
ফাইজার জানিয়েছে আরএনএ-র বিন্যাসকে কাজে লাগিয়েই ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট BNT162 তৈরি হয়েছে, যে কোনও সংক্রামক প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারবে। এই ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট তৈরির জন্য সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রামক আরএনএ স্ট্রেন স্ক্রিনিং করে আলাদা করে প্রথমে ল্যাবরেটরিতে বিশেষ উপায় পিউরিফাই করা হয়েছে। এই পর্যায়ে ভাইরাল স্ট্রেনকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয় যাতে শরীরে ঢুকলে তার সংক্রামক ক্ষমতা কমে যায়। এই নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল আরএনএ স্ট্রেন তখন কোষে ঢুকে প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না। অথচ এই জাতীয় ভাইরাল স্ট্রেনের খোঁজ পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে বি লিম্ফোসাইট কোষ বা বি-কোষ। নিজেদের অজস্র ক্লোন তৈরি করে রক্তরসে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে। অ্যান্টিবডি বেসড ইমিউন রেসপন্স বা অ্যাডাপটিভ ইমিউন রেসপন্স (Adaptive Immune Response) তৈরি হয় শরীরে।
মোডার্নার টিকাও ঠিক একইভাবে কাজ করবে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এমআরএনএ সিকুয়েন্সকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই ভ্যাকসিনের নাম এমআরএনএ-১২৭৩ (mRNA-1273)। এই ভ্যাকসিন মানুষের দেহকোষে ঢুকে করোনাভাইরাসের মতো প্রোটিন তৈরি করার নির্দেশ দেবে। সেই প্রোটিনের বাইরে খোলসটা হবে ঠিক সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের মতোই। অথচ করোনার মতো অতটা সংক্রামক নয়। দেহকোষ তখন এমন ধরনের প্রোটিন দেখে তার প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।
ভাইরাল ভেক্টর (Viral Vector) নিয়ে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি-অ্যাস্ট্রজেনেকা। ভারতে সেই ফর্মুলাতেই কোভিশিল্ড টিকা তৈরি করেছে পুণের সেরাম ইনস্টিটিউট। ভেক্টর মানে হল আলাদা কোনও ভাইরাসকে আধার হিসেবে ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরি করা। অক্সফোর্ড শিম্পাঞ্জীর শরীর থেকে সর্দি-কাশির ভাইরাস অ্যাডেনভাইরাসের স্ট্রেন নিয়ে তাকেই ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ভেতরে করোনার স্ট্রেন পুরে চ্যাডক্স টিকা তৈরি হয়েছে। যেহেতু অন্য ভাইরাসের আড়াল আছে তাই করোনার স্ট্রেন সরাসরি কোষে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারবে না। অথচ ইমিউন সিস্টেমকে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে বাধ্য করবে। কাজেই আমাদের দেশে যে কোভিশিল্ড টিকার ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে আর দুদিন পরেই, তা শরীরে যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারবে বলেই আশা গবেষকদের।