
শেষ আপডেট: 1 September 2020 15:12
মংপু রবীন্দ্র মিউজিয়াম।[/caption]
মৈত্রেয়ী দেবীকে তাঁর অতিথি সম্বোধন করতেন ‘গৃহিণী’, ‘গৃহস্বামিনী’, ‘গৃহকর্ত্রী’ বলে। এই গৃহিণীর গৃহসজ্জাটি কেমন ছিল? কোনওরকম বাড়াবাড়ি নয়, প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে, যেমন ফুল-পত্র ইত্যাদি দিয়ে প্রাকৃতিক মাধ্যমেই ঘর সাজাতেন মৈত্রেয়ী। যেমন বাঁশের ফুলদনিতে রাখতেন নীল রঙের জ্যাকারান্ডা বা কারনেশন, হলিহক ফুল। একবার বাগানে এই হলিহক, বন্য লিলির সারি দেখে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এ কিন্তু ফুলের রাজ্য, ফুলের দেশ।’ এই ফুলের দেশে পরিমিত সজ্জায় সজ্জিত একটি গৃহে শীত, বর্ষা, বসন্ত উত্তরবঙ্গের তিন ঋতুকেই অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ আর বোধহয় সেজন্যই চার-চারবার মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর অতিথি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জীবনের অনন্ত সন্ধ্যার শান্তি তিনি পেয়েছিলেন মৈত্রেয়ীদের কাছে এসে আর সেই মুহূর্তগুলির কথা শঙ্খ ঘোষ তুলে ধরেছেন তাঁর লেখা তথ্যচিত্র ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’-এ।
[caption id="attachment_255742" align="alignnone" width="600"]
মংপু রবীন্দ্র মিউজিয়াম।[/caption]
উত্তরবঙ্গের অবিন্যস্ত আতিথেয়তার প্রতীক, হিমালয়ের উন্মুক্ত প্রান্তরের এক ছোট্ট গ্রামে অবস্থিত এই বাড়িটির আনন্দের কাহিনি মৈত্রেয়ী শুনিয়েছেন তাঁর লেখা বই ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’-এ। আর মৈত্রেয়ীর কথা এখনও শোনা যায় এ বাড়ির দীর্ঘদিন তত্ত্বাবধানে থাকা শিশির রাওয়াতের কাছে। কবির ডুলিবাহকের পৌত্র শিশির রাওয়াত মংপুর বাড়িটির দীর্ঘদিনের গাইড ছিলেন। পর্যটকরা এলে তাদের তিনি বাড়িটা ঘুরে দেখান পরমানন্দে; শোনান গুরুদেব আর তাঁর উত্তরসাধক মৈত্রেয়ীর এ বাড়িতে যাপনের দিনগুলির কথা। কিন্তু শিশির রাওয়াতরা এখন আর চান না এখানে কোনও পর্যটক আসেন।
এবারের পূজায় মংপুতে
উত্তরবঙ্গে পর্যটকের আসা বা মরসুম শুরু হয় মে-জুন মাসে, তারপর পূজার ছুটিতে আবার আসেন পর্যটকরা। সেই ভরা মরসুমে কালিম্পং তথা উত্তরবঙ্গের সমগ্র পাহাড় ও ডুয়ার্সে প্রায় ১০০ শতাংশ ভরে যায় বিভিন্ন হোটেল, লজ ও হোম স্টে-গুলি। সামনেই পুজোর ছুটি কিন্তু মানুষ এখনও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যেতে ভয় পাচ্ছেন। লকডাউনের জন্য দীর্ঘ কয়েক মাস সব কিছু বন্ধ ছিল, তাতে উত্তরবঙ্গের পর্যটনের ক্ষতি হয়েছে ২০০০ কোটির বেশি।
[caption id="attachment_255743" align="alignnone" width="600"]
সিটং হোম স্টে।[/caption]
এই সময় মংপু এবং সমগ্র উত্তরবঙ্গে পর্যটক না থাকলেও হোটেল রক্ষণাবেক্ষণ করা, বিদ্যুতের বিল মেটানো, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সহ একাধিক খাতে খরচ করতেই হচ্ছে হোটেল, রিসর্টগুলিকে। কিন্তু আয় কিছুই হচ্ছে না। হোম স্টেগুলি অবশ্য আয়তনে ছোট হওয়ায় তুলনামূলকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। তবু একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে মংপু এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় (যেমন কমলা বাগানের জন্য বিখ্যাত সিটং) থাকা প্রায় ৫০টিরও বেশি হোম স্টে-র বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এদের অনেকেরই বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নেই। তবু গোষ্ঠী সংক্রমণ রুখতে পর্যটন ব্যবসায়ীরা সামাজিকভাবেই চান না এখন কোনও পর্যটক আসুন।
ফিরে আসি মৈত্রেয়ীর কথায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে মহাপ্রাজ্ঞ ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে দর্শনলাভের সৌভাগ্য যেমন তাঁর হয়েছিল, তেমনই মংপুর মতো গ্রামে তিনি পেরেছিলেন ছোট ছোট জনপদগুলিকে একত্রিত করে কবির সম্মুখে পঁচিশে বৈশাখ উদযাপন করতে। অতীতের সেই গৌরবময় সময়গুলির মতো আজও পাহাড়বাসী করোনার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে লড়ছেন। কোনও একটি হোম স্টে যদি কোনও পর্যটককে গ্রহণ করে তা হলে সেই পরিবারকে একঘরে করা হবে।
‘আমিও ওদের এই নীতিকে সমর্থন করি। কারণ এই রোগের কোনও ওষুধপথ্য নেই। সেক্ষেত্রে ওরা একজোট হয়ে যা করছেন তা প্রশংসনীয়।’ জানালেন মৈত্রেয়ী-পুত্র প্রিয়দর্শী সেন, যিনি তাঁর জীবনের প্রথম ১২ বছর অতিবাহিত করেছেন এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে এবং তারপরেও বারবার এসেছেন মংপুতে।
কিন্তু তা হলে পর্যটনের কী হবে? ‘মাস-ট্যুরিজমকে প্রশ্রয় না দিয়ে, অল্পসংখ্যক পর্যটক নিয়ে কিছু নতুন প্রয়াস, যেমন তাঁবুর মধ্যে থাকা এবং পর্যটক যারা আসছেন তারা নিজেরাই রান্না করে নিচ্ছেন-- এমনিভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা করা যেতে পারে। কারণ ভুলে গেলে চলবে না যে শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গ নয়, সমগ্র দেশের জিডিপি-র একটা বড় অংশ পর্যটন থেকে আসে।’ বলেন দেবাশিস চক্রবর্তী, যিনি দীঘদিন ধরে এই অঞ্চলে কমিউনিটি ওয়ার্কার এবং ‘এক্সপেরিয়েন্স বেঙ্গল’ নামে প্রচুর হোস স্টে-র তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
মংপুতে সবাইকে নিয়ে মৈত্রেয়ী গড়ে তুলেছিলেন রবীন্দ্র-স্মৃতি শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্র। যেখানে অর্ঘ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ উন্নয়ন চিন্তা। সেই উন্নয়ন এখন করোনার সংক্রমণে স্থগিত। পূজার ছুটিতে কি এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে?
ছবি সৌজন্য : https://ww.experience bengalhomestays.com