দ্য ওয়াল ব্যুরো: শরীরের মতো মনও ভোগে। অসুখ হয় মনেও। মানুষের মনের গতিবিধি যেমন ভিন্ন। তেমনি তার অসুখের ধরনও আলাদা। মনের সবচেয়ে বড় অসুখ হল
উদ্বেগ (Anxiety)। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, উদ্বেগ হল মনের একটা জটিল অবস্থা, যেখানে স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনার পথটা বন্ধ হয়ে যায়। ভয়, ছটফটানি, চাঞ্চল্য, দুঃখ, ফোবিয়া সব মিলেমিশে এমন এক জটপাকানো অবস্থা তৈরি হয়, যে তার ছাপ পড়ে সারা শরীরেই। উদ্বেগ ক্রনিক হয়ে গেলে তখন আর মনের অবস্থা থাকে না, জটিল অসুখে পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞরা, তখন তার নাম দেন অবসাদ, ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।
উদ্বেগ হল মনের সবচেয়ে বড় শত্রু। শুরুটা এই অসুখ দিয়েই হয়। তার থেকেই ডালপালা ছড়ায় মনের নানা বিচিত্র রোগ। বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সূচনাটাও উদ্বেগ দিয়েই হয়। অসুখ গুরুতর হলে মন বেয়ে সোজা পৌঁছে যায় হার্টে। ফলে হার্টের রোগ, শ্বাসকষ্ট এমনকি পেশী ব্যথা, পেটের রোগ, রক্তচাপের ওঠানামা—সবই দেখা দেয় একে একে। করোনা কালে এই উদ্বেগই সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। ভাইরাসের সংক্রমণ, মৃত্যু, লকডাউনের একঘেয়েমি, অন্দরবাসে সম্পর্কের নানা টানাপড়েন সব মিলিয়ে মনের নানা জটিল রোগে ভুগছে মানুষ। অবসাদগ্রস্থও হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমণ বলে শুধু নয়, উদ্বেগ হানা দিতে পারে যে কোনও সময় ও পরিস্থিতিতেই। আর উদ্বিগ্ন মন ওষুধে সারে না। তার জন্য দরকার মনের যত্ন।
উদ্বেগ থেকেই অবসাদ, রোগ বাড়লে ‘অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার’
অতিরিক্ত চিন্তা, ভাবনা, উৎকণ্ঠা উদ্বেগের নানা দিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবকিছুতেই চিন্তার বাতিক তৈরি হয়ে গেলেই মুশকিল। সামান্য ব্যাপারেও উদ্বেগ বাড়বে। দুশিন্তা থেকেই অবসাদ বাসা বাঁধবে। তার থেকে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস, ফোবিয়া। চঞ্চল, চিন্তাগ্রস্থ মনের রোগ কখন যে ক্রনিক ডিসঅর্ডারে পৌঁছে যাবে তার টেরও পাওয়া যাবে না।
‘অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেসন অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা’ (ADAA) তাদের একটি গবেষণার রিপোর্টে বলেছিল, অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকেই
‘জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার’ (GAD) হয়। প্রতি বছর বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ এই রোগে ভোগেন। এই ডিসঅর্ডার ছ’মাসের বেশিও স্থায়ী হয়। তখন তাকে ক্রনিক ডিসঅর্ডার বলে। এই পর্যায়ে পৌঁছে গেলে রোগীকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়মিত কাউন্সেলিং করাতে হয়।

কম বয়সীদের মধ্যে আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত বয়ঃসন্ধি বা তার আশপাশে। সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের নানা চাপ, বন্ধুবান্ধব-আত্মীয় মহল থেকে নানারকম মন্তব্য, বা পড়াশোনা-কেরিয়ারের চিন্তা সব মিলিয়েই সামাজিক মেলামশায় একটা ভয় বা আতঙ্ক তৈরি হয়। একাকীত্বে ভুগতে থাকে অনেকে, নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। একে বলে ‘সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার।’ এই রোগ মনে ধরলে সাবধান হওয়া দরকার। একাকীত্বের বোধ থেকেই মনের আরও জটিল পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ে।
করোনা কালে উদ্বেগ থেকে ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার
করোনাভাইরাস এবং এই ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব হল
‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (PTSD) । এক অজানা ভাইরাসের সংক্রমণ, চারদিকে এত মৃত্যু, হঠাৎ করেই স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ হারিয়ে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে যাওয়া—এই সবকিছুই ছাপ ফেলেছে মনে। দেখা গেছে, ভাইরাসের সংক্রমণ সারিয়ে ওঠার পরে তার ভয় যায়নি রোগীর মন থেকে। পোস্ট-কোভিড পর্যায়েও ট্রমার শিকার হয়েছেন অনেকে। এই ধরনের মনের রোগ আরও নানা কারণে হতে পারে। আচমকাই কোনও সম্পর্ক ভেঙে গেলে বা মনে বড় কোনও ধাক্কা লাগলে এই ধরনের ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই সময় মনের আরও একটা রোগ দেখা যাচ্ছে, যাকে বলে
‘অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার’ (OCD) । করোনা কালেই মনের এই উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই বলেছেন, তাঁরা বারে বারে হাত ধুচ্ছেন, বা মাস্ক পরেছেন কিনা সেটা বারে বারে দেখে নিচ্ছেন। অনেকেই প্রতি দশ মিনিট অন্তর হাতে স্যানিটাইজার ঢালছেন। ভাইরাসের ভয় বা আতঙ্ক থেকেই কিছু অভ্যাস বাতিকে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। অবসেসিভ ডিসঅর্ডার দেখা দিচ্ছে মানুষের মধ্যে।
উদ্বেগ ধাক্কা দেয় হৃদয়ে

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্বেগ থেকে ফোবিয়া বা আতঙ্ক তৈরি হয় মনে। যার থেকেই উৎকণ্ঠা বাড়ে। ‘প্যানিক ডিসঅর্ডার’-এ আক্রান্ত হয় রোগী। মনোসংযোগ কমে যায়, মাত্রাতিরিক্ত চিন্তায় হৃদগতি বাড়ে। বুকে ব্যথা হতেও দেখা গেছে অনেকের। শ্বাসের গতি ধীর হয়। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও দেখা দেয়। অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ও প্যানিক ডিসঅর্ডার যদি একটানা চলতে থাকে তাহলে অবসাদ, মাথাব্যথা, ঝিমুনিভাব, কাজে অনীহা দেখা দেয়। এমনকি স্নায়ুর উপরেও তার প্রভাব পড়ে। শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে যায়। রক্তচাপেরও তারতম্য হতে পারে। প্যানিক ডিসঅর্ডার ক্রনিক হয়ে গেলে শরীরে এনজাইম ক্ষরণও অনিয়মিত হয়ে যায়। খাবার হজমে সমস্যা হয়, পেটের রোগও দেখা দিতে পারে। খিদে কমতে থাকে, বিপাকক্রিয়ায় বড়সড় প্রভাব পড়ে। স্ট্রেস থেকে লিভারের অসুখ হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন 'সাইকোলজিক্যাল ডিসট্রেস' থেকে জটিল লিভারের রোগও ধরতে পারে।
তছনছ হয় রোগ প্রতিরোধ শক্তি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমতে থাকে। স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ হলে তার ছাপ পড়ে শরীরে। আঘাত লাগে মস্তিষ্কেও। শ্বাসযন্ত্রের উপরেও এর প্রভাব পড়ে। ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) থাকলে উদ্বেগের কারণে শ্বাসের সমস্যা তৈরি হয়। হাসপাতালে ভর্তি করতেও হতে পারে রোগীকে। হাঁপানি বা ফুসফুসের রোগ থাকলে উদ্বেগের কারণে সেটা আরও বাড়তে পারে। বিশেষত ক্রনিক রেসপিরেটারি ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ে।
উদ্বিগ্ন মনের যত্ন
উদ্বেগ সারাতে হলে নিজেকেই আগে উদ্যোগ নিতে হবে। চিন্তা-ভাবনায় রাশ টানতে হবে। মনে অযথা কোনও ভাবনা এলে, মেডিটেশন করে মন অন্যদিকে রাখা যেতে পারে। এ সময়ে পরিবারের মানুষ একে অন্যের প্রতি ধৈর্যশীল, সহানুভূতিশীল হওয়া ছাড়া উপায় নেই। রাগ না করে কাছের মানুষের সব কথা শুনতে হবে, ভরসা যোগাতে হবে। যাঁরা একাকিত্বে ভুগছেন, ফোনে কথা বলে তাঁদের সঙ্গ দিতে হবে। মেলামেশা বাড়াতে হবে। কেউ একাকীত্বে ভুগছে মনে হলে তাকে সঙ্গ দিতে হবে, কথাবার্তা, আলোচনা বাড়াতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চা মন হাল্কা রাখে। স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ কমায়। সমস্যা তীব্র হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছাড়া গতি নেই। তখন নিয়মিত কাউন্সেলিং করানোর দরকার।