
শেষ আপডেট: 19 October 2023 17:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিডের পাশাপাশি হাজির আরও এক রোগ। করোনার সঙ্গেই গুলেনবারি সিন্ড্রোমেও (জিবি) আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে, আমাদের রাজ্যেও এমন রোগীর সন্ধান মিলেছে। যদিও এ রাজ্যে আক্রান্তদের প্রত্যেকেই বৃদ্ধ।
এমন এক ভয়ঙ্কর রোগ যা আস্ত মানবশরীরকে পক্ষাঘাতগ্রস্থ করে দেয় কিছুদিনের মধ্য়েই। ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলোকে গ্রাস করতে থাকে। স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল করে দেয়। তারপর থাবা বাড়ায় ব্রেনের দিকে। শেষে মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে মৃত্যু ঘটায় রোগীর। এই অসুখ শরীরকে তছনছ করতে থাকে হিংস্র শ্বাপদের মতো। নিষ্ফল আক্রোশে নিজেকে শেষ হতে দেখা ছাড়া রোগীর আর কোনও উপায়েই থাকে না। কথা বলার ক্ষমতাও চলে যায়।
১৮৫৯ সালে প্রথম এই রোগের কথা শোনা যায়। অতি বিরল স্নায়ুর অসুখ যা একধরনের অটোইমিউন ডিসঅর্ডার। শরীরের নার্ভাস সিস্টেম ও ইমিউন সিস্টেমকে তছনছ করে দেয়। ডাক্তারি ভাষায় এই রোগের নাম গুলেনবারি সিন্ড্রোম বা গিলিয়েনবার সিনড্রোম (ব্রিটিশ উচ্চারণে) Guillain-Barre (gee-YAH-buh-RAY) , সংক্ষেপে জিবিএস।
এটি হল অ্যাকিউট ইনফ্ল্যামেটরি ডিমায়েলিনেটিং পলির্যাডিকিউলো নিউরোপ্যাথি (Acute inflammatory demyelinating polyradiculoneuropathy (AIDP))। স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই রোগে। নিউরনের মায়েলিন শিথটা (Myelin Sheath) নষ্ট হতে থাকে। তাই শরীরে স্নায়ুর কার্যকারিতা আর থাকে না। স্নায়ু সঙ্কেত পাঠাতে পারে না। সে কারণেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে রোগী। এই রোগটিকে ইমিউন মেডিয়েটেড ডিজিজও বলা হয়। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, অ্যাকিউট মোটর অ্যান্ড সেনসরি অ্যাক্সোনাল নিউরোপ্যাথি (Acute motor and sensory axonal neuropathy (AMSAN))। মোদ্দা কথা, শরীরের সমস্ত অঙ্গ বিকল হতে থাকে, মাল্টি-অর্গ্যান ফেলিওর হয় রোগীর। বিশ্বে এই রোগ ছিল অতি বিরল। এখন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন ডাক্তারবাবুরা।
স্নায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমে হাত-পা ঝিনঝিন করতে শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে হাত-পা অসাড় হতে থাকে। হাত দিয়ে কিছু ধরতে পারেন না রোগী। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। বডি ব্যালান্সটাই হারিয়ে যেতে থাকে। কারও ক্ষেত্রে আবার চোখের পাতা বন্ধ হচ্ছে না, এমনও হতে পারে। তিন থেকে চার দিনের মধ্যে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন রোগী, কারও সাহায্য ছাড়া চলতে পারা যায় না।
প্রথমে পা তারপর গোটা শরীর প্যারালাইসিস হয়ে যায়। মুখমণ্ডলও অসাড় হতে থাকে, ফেসিয়াল প্যারালাইসিসও হয় রোগীর। শক্ত হয়ে যায় ঘাড়ে পেশি। মাথা নাড়ানোর ক্ষমতাও থাকে না। ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্বাসনালীর পেশি, সেই কারণে শ্বাসকষ্ট শুরু হতে থাকে। বিকল হতে থাকে ফুসফুস, কিডনি। চোখের পেশি কাজ করে না, রোগী শ্বাস নিতে পারে না, কথা বলতে পারে না, নিজের অনুভূতি বোঝানোর ক্ষমতাও থাকে না।
ডবল ভিশন হতে থাকে, ব্লাডার প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে না। হার্ট রেট বেড়ে যায়, রক্তচাপ আচমকা কমে যেতে বা বেড়ে যেতে পারে।
যে কোনও বয়সেই এই রোগ হানা দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে খাবারে ভেজাল, জীবনযাপনের পদ্ধতি, বাড়তে থাকা দূষণ, নানারকম ওষুধের সাইড এফেক্টস, নতুন কোনও ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি নানা কারণে এই অসুখ (Guillain–Barré syndrome) বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাত-পা অবশ হতে থাকা বা শরীরের সাড় চলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখলেই ডাক্তার দেখাতে হবে। শিরদাঁড়ার রস বা সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড নিয়ে পরীক্ষা করে রোগ ধরা হয়। গোটা নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হওয়ার আগে থেরাপি শুরু হলে রোগী বেঁচে যেতে পারেন।