ক্যালম ম্যাকফারলেন এখনই স্থায়ী উত্তর নন। কিন্তু গতরাতের পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দিল—অ্যাকাডেমির কোচ মানেই যে ডাগআউটে হারিয়ে যাওয়া মুখ, তা হয়তো সবক্ষেত্রে ঠিক নয়।

ক্যালম ম্যাকফারলেন
শেষ আপডেট: 5 January 2026 13:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ৭ মাস আগে ছিলেন সাউদ্যাম্পটনে৷ ফার্স্ট টিম নয়, অ্যাকাডেমির দায়িত্বে।
৭ সপ্তাহ আগে চেলসির অনূর্ধ্ব-২১ দলে৷
৭ দিন আগে এই চেলসিরই সিনিয়র টিমের বিল্ডিংয়ে পা রাখার ‘বৈধ অধিকার' ছিল না৷
গতকাল সেই ক্যালম ম্যাকফারলেন এতিহাদের ডাগআউটে দাঁড়ালেন৷ রিস জেমস, এনজো ফার্নান্দেজদের নির্দেশ দিলেন৷ অভিভাবকহীন চেলসির কেয়ারটেকার ম্যানেজার হিসেবে উল্টোদিকের প্রতিপক্ষ দিগ্বিজয়ী পেপ গুয়ার্দিওলা! অথচ কিংবদন্তি ম্যানেজার, ১০১১খানা লড়াইয়ের সাক্ষী যিনি, কেরিয়ারের পয়লা অ্যাসাইনমেন্টে সেই তাঁকেই রুখে দিলেন ক্যালম। গতরাতের আগে কেউ যাঁর নামটুকু জানত না, আজ ইংল্যান্ডের তামাম ফুটবল মহল তরুণ ইংরেজ ‘ম্যানেজারে'র বন্দনায় মুখর! পেদ্রো নেটো, কোল পালমাররা সহজ সিটার নষ্ট না করলে স্কোরলাইন ১-১ হওয়ার পরিবর্তে ২-১ কিংবা ৩-১ হতেই পারত!
কে এই ক্যালম ম্যাকফারলেন?
ক্যালম ম্যাকফারলেন (Calum McFarlane) কোনও ‘হঠাৎ গজিয়ে ওঠা’ নাম নন। তিনি বর্তমানে চেলসি-র অনূর্ধ্ব-২১ দলের হেডকোচ। প্রিমিয়ার লিগ ২–এ তাঁর দল শীর্ষ চারের মধ্যে রয়েছে। ৯ ম্যাচে ধারাবাহিকতা, কাঠামো আর স্পষ্ট আইডেন্টিটি দেখিয়েছে।
এটাই চেলসিতে প্রথম মরশুম। তার আগে ছিলেন সাউদ্যাম্পটনের অ্যাকাডেমিতে। সিনিয়র টিম নয়—যেখানে আলো কম, কিন্তু কাজের গভীরতা বেশি। চেলসিতে আসার পর প্রথমে অনূর্ধ্ব-২১ দলের অ্যাসিস্ট্যান্ট কোচ হিসেবে ঢুকলেও খুব দ্রুত তাঁকে হেড কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ক্লাবের অন্দরের বার্তা পরিষ্কার—এই কোচকেই তারা দীর্ঘমেয়াদে দেখছে।
ম্যান সিটির যোগ: গুয়ার্দিওলার ছায়ায় বেড়ে ওঠা
ম্যাকফারলেনের কোচিং ডিএনএ বোঝার জন্য তাকাতে হবে তাঁর আগের ঠিকানার দিকে—ম্যানচেস্টার সিটি। ২০২০ থেকে তিন বছর সিটির অ্যাকাডেমি সেট-আপে কাজ করেছেন। সেই সময়েই ক্লাবে ছিলেন এনজো মারেসকা (Enzo Maresca) এবং পেপ গুয়ার্দিওলা (Pep Guardiola)।
শুধু ট্রেনিং গ্রাউন্ড নয়—একটা ছকভাঙা দর্শন—পজিশনাল প্লে, বল ছাড়া মুভমেন্ট, ছোট ছোট ডিটেলে পর্যবেক্ষণ—এই বিষয়গুলি ম্যাকফারলেনের কাজে স্পষ্ট। চেলসিতে সঙ্গে এনেছেন সিটির সেই পুরনো সংযোগ—অ্যাকাডেমির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর গ্লেন ভ্যান ডে ক্রান (Glenn van der Kraan) এবং রিক্রুটমেন্ট কো-ডিরেক্টর জো শিল্ডস (Joe Shields)। অর্থাৎ, এই নিয়োগ কোনও আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়—একটা পরিচিত কাঠামোরই সুচিন্তিত সম্প্রসারণ।
কেয়ারটেকার মানেই সীমিত সময়: দায়িত্ব কতদিনের?
চেলসির মালিকপক্ষ স্পষ্ট করে দিয়েছে—সিনিয়র টিমের এই দায়িত্ব আপাতত এক ম্যাচের। প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটি-র বিরুদ্ধে লড়াইটাই ম্যাকফারলেনের ব্রিফ। এরপর কী? ক্লাবের ভেতরে আলোচনা চলছে স্থায়ী কোচ নিয়ে—লিয়াম রোজেনিয়র (Liam Rosenior) হট ফেভারিট! কিন্তু তিনি আসার আগে এই এক ম্যাচেই ম্যাকফারলেন যা খেল দেখালেন, তাতে বোঝা গেল—চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস তাঁর বিলক্ষণ রয়েছে। গতকাল চেলসির রক্ষণে ভাঙন ধরেনি, বিল্ড-আপ প্লে-তে আতঙ্ক দেখা যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা—ডাগআউটে তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনও ‘অস্থির’ ভাবও ধরা পড়েনি।
কোচিং দর্শন: স্পষ্টতা আর স্বাধীনতা
ম্যাকফারলেন আগেই জানিয়েছিলেন—তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে ‘খোলামেলা আর সৎ’ যোগাযোগে বিশ্বাসী। পারফরম্যান্স, আচরণ, স্ট্যান্ডার্ড—সব পরিষ্কার করে বলায় আস্থাশীল। কিন্তু একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের ভুল করার স্বাধীনতাও দিতে প্রস্তুত! ফিজিক্যাল দিক থেকে স্পোর্টস সায়েন্স টিমের সঙ্গে সমন্বয়, ট্যাকটিক্যালি ভিডিও অ্যানালিসিস আর মিটিং, মানসিকভাবে ফোকাস আর রেজিলিয়েন্স—এই তিন স্তম্ভে তাঁর কাজ দাঁড়িয়ে। ডেটা ব্যবহার করেন, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। কোচিং আর পর্যবেক্ষণের সহায়ক হিসেবে।
এই দর্শনেরই ঝলক মিলল এতিহাদে। কাগজে কলমে পিছিয়ে থাকা চেলসি খেলল চোখে চোখ রেখে। অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল, কিন্তু ভয়? একবিন্দু নয়! আর এহেন অকুতোভয় দাপটই হয়তো অস্থায়ী কোচের সবচেয়ে বড় পরিচয়! ক্যালম ম্যাকফারলেন এখনই স্থায়ী উত্তর নন। কিন্তু গতরাতের পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দিল—অ্যাকাডেমির কোচ মানেই যে ডাগআউটে হারিয়ে যাওয়া মুখ, তা হয়তো সবক্ষেত্রে ঠিক নয়। সঠিক পরিবেশ, স্পষ্ট দর্শন আর চাপ সামলানোর ক্ষমতা থাকলে—অচেনা নামও রাতারাতি ঘরের মুখ হয়ে উঠতে পারে।