
শেষ আপডেট: 16 July 2022 09:31

একবার কড়াকাঠি গ্রামে গিয়ে আবিদা সুলতানার বাড়িতে সারাদিন কাটিয়েছিলাম। কথা দিয়ে ছবি আঁকার ক্ষমতা আছে তার আছে বটে! তার বাড়ি আর বাগানের গল্প শুনতে শুনতে আমার চোখের সামনে একটা স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠত। ওর ঘরদুয়ার দেখার জন্য ছটফট করতাম।
পাড়াগাঁয়ের বাড়িতে একটা মাঝারি মাপের আঙিনা থাকবে জানা কথা। সেই আঙিনায় আবিদা সুলতানা একটুকরো সবুজদ্বীপ রচনা করেছিল। কঞ্চির পলকা গেট ঠেলে ভেতরে যাওয়ার আগে উমুরঝুমুর মেহেদি ফুলের ঝালর সরিয়ে তবেই তার উঠোনে পা দেওয়া যাবে। উঠোনের চারপাশে ঢোল কলমির বেড়া। তাতে সাদা রঙের ফুল। দক্ষিণদিকে একটা নিমগাছ। দক্ষিণে নিমগাছ লাগালে না কি গৃহস্থের কল্যাণ হয়! আবিদা আবার গৃহী হল কবে থেকে! ও তো সারাদিন বাইরেই থাকে। শনি রবিবারেও। বারুইপুরের নজরুল সরণীর গলির মুখে ওর পানের দোকান। মিঠাপাতা আর বাংলাপাতা রাখে। রাখে পানের নানাবিধ মশলা। অনেক রকমের সুগন্ধি জর্দা। মৌরি, মিছরি, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, কিমাম, গুলকন্দ, চমন বাহার, পান বাহার। আবিদা একটা ব্যাপারে কিছুতেই সমঝোতা করে না। খরিদ্দার এসে ফেরৎ যায়। উল্টোদিকের 'মজনু স্টোর'-এ ভিড় বাড়ে। তবুও আবিদা গুটখা, সিগারেট, বিড়ি— এসব রাখে না। আজকাল বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো সিগারেট, তামাক কিনছে দেখলে আবিদার সহ্য হয় না। যদি বলি পান খাওয়াও তো ভালো না। দাঁত নষ্ট হয়। জর্দা অনেক ক্ষতি করে। তখন ও নিজে পান খাওয়ার স্বপক্ষে একাধিক যুক্তি দেখায়। ও নিজেও জর্দা পান খায়। তবে ও যে জর্দা খায়, সেটা স্পেশাল। বড়বাজার থেকে আনায়। কেমন যেন কস্তুরী আতরের মত গন্ধ!
আমি ওর কাছে মাঝে মাঝে মিঠা পাতার পান কিনি আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করি। ভালো করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। নিত্য ট্রেনযাত্রীরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে ফেলে স্টেশনের দিকে চলে যায়। তবুও তার মধ্যেই গল্প চলে।

অনেকটা জমির ওপরে আবিদার এক কামরার ছোট্ট ঘর। মাত্র একটা ঘর!
বলে, "আমি একা মানুষ একটা ঘরই ঠিক আছে। বারান্দার একদিকটা ঘিরে রান্নাঘর বানিয়ে নিয়েছি। চারখানা ইট পেতে তার ওপর গ্যাসের চুলো রেখেছি। পিঁড়েতে বসে রান্না করি। রাতেই পরেরদিনের রান্না করে রাখি। একটা সেকেণ্ড হ্যান্ড ফিরিজ আছে। ক্যানিং-এর বাজারে টিভি, ফিরিজ, কাপড় কাচা মেশিন সারানোর দোকান দিয়েছে সাইফুর, আমার চাচাতো ভাই। আমাকে খুব মানে। সে-ই খুব অল্প টাকায় ফিরিজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একটু ঠাণ্ডা পানি না হলে আমার চলে না।" লাজুক মুখে হাসে আবিদা।
তাহলে ইলেকট্রিক বিল ভালোই আসে?
"তেমুন না। তিনমাস অন্তর আসে। হুকিং করে লাইন টানা যেত! কিন্তু আমার পছন্দ না। আমি দোকানে বিড়ি, সিগারেট, তিরঙ্গা রাখি না। সেই আমি যদি হুকিং করে বিজলি বাতি, ফ্যান, ফিরিজ চালাই— আল্লাপাককে কী জবাব দেব?"
তোমার তো মা, ভাই সবাই আছে! তুমি ওদের সঙ্গে না থেকে আলাদা থাকো কেন?
"সে অনেক কথা। যেদিন এই গরীব বুনটার বাড়ি যাবা, সেদিন সব বলব।"
তবে আমি শুনেছিলাম আবিদার কাছে না কি জ্বীন আছে। ভালো জ্বীন। সেই কারণে যৌবনবতী আবিদা মানুষসঙ্গ ছাড়া একা একাই অনেক বসন্তরাত পার করে দিতে পেরেছে। সেই জ্বীনের জন্যই না কি এই ছোট্ট দোকান থেকে আবিদার এত্ত উন্নতি! সেই জন্যই কি আবিদার গা থেকে কস্তুরী আতরের গন্ধ পাওয়া যায়!
তবে পাশের দোকানদার বলেছিল "ওসব স্রেফ গুলগল্প। ব্যাটাছেলেগুলোকে কাছে ঘেঁষতে দেবে না বলে ওসব জ্বীন ফিনের গল্প ফাঁদিয়ে রেখেছে। একটা হিঁদু ছেলের সঙ্গে ট্রেনে ঢলাঢলি করতে করতে বাড়ি ফেরে। নিজের চোখে দেখেছি। আসলে ও একবার লটারিতে মোটা টাকা পায়। ওই দিয়ে জায়গা কিনে ঘরদোর বানিয়েছে। আত্মীয়স্বজনরা ওকে পছন্দ করে না বলে একা থাকে।"
ভরা আষাঢ় মাসে একদিন ক্যানিং স্টেশনে নেমে ভ্যানে চেপে কড়াকাঠি গাঁয়ে ঢুকলাম। ১৫ টাকা ভাড়া। প্রবেশ পথে উমুরঝুমুর মেহেদি গাছের ফুল আর সুন্দরী আবিদা স্বাগত জানাল। বাঁশের বাতা আর কঞ্চি দিয়ে বানানো গেট ঠেলে ভেতরপানে ঢুকতেই কামিনী আর গন্ধরাজের সৌরভে আচ্ছন্ন হলাম। ঝরে পড়া হলুদ কলকে ফুলেরা উঠোনের চৌকাঠে আলপনা দিয়ে রেখেছে দেখলাম। মল্লিকা আম গাছে হাতের নাগালে ঝুলে রয়েছে আম। বেড়ার গায়ে সুপারি গাছের সারি। ছোট্ট নারকেলগাছে এত্ত বড় ডাবের কাঁদি। সবেদা, জামরুল, চালতা,কামরাঙা গাছও আছে। সব গাছই কলমের। ছোট কিন্তু ঝাঁকড়া। গাছগাছালিতে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। একটা ঘোড়ানিম গাছ দেখলাম। এখনও তেমন বড় হয়নি। যেখানটায় কাঁঠালিকলার গাছ, সেখানে প্রচুর ওল আর মানকচুর গাছ হয়ে রয়েছে দেখলাম। টিউকলের কাছে একটা হাসনুহানাও আছে। উঠোনের যেখানে সেখানে নয়নতারা, সন্ধ্যামালতি গাছ হয়ে রয়েছে। রয়েছে শাকসবজির গাছও। তবে বড় গাছের প্রাধান্য বেশি।
ও আবিদাবুবু এত্ত গাছ কীভাবে যত্ন কর?
বিষ্যুদবার দোকান বন্ধ থাকে। ওইদিন বাগান সাফ করি। এখানে জামাল বলে একজনা ডালপালা ছেঁটে দেয়। গাছগুলান আমার জান।
আমি মনে মনে বলি ওই যে হিন্দু ছেলেটা, যায় সঙ্গে ট্রেনে করে বাড়ি ফের— সেও কি তোমার আরেকটা জান?
দেখলাম একটা জায়গায় প্রচুর কলমি শাক। বর্ষার জল পেয়ে ফুল ফুটেছে। আবিদা বলল, এগুলো ওর পোষা খরগোশের প্রিয় খাবার। দেখলাম দুধ সাদা খরগোশটাকে। নাম মিঠঠু। মিঠঠু বলে ডাক দিলেই কলমিঝোপ থেকে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে আসছে। কাঁঠাল গাছে দেখলাম গাছের গুঁড়িতেও কাঁঠাল ধরে রয়েছে। একটা কাঁঠাল একেবারে শিকড়ের কাছাকাছি। মাটিতে গর্ত করে দিতে হয়েছে। কাঁঠাল সেই গর্ত ধরে মাটির নীচে সেঁধিয়েছে।
বললাম বাগানে পাঁচিল দাওনি! তোমার অনুপস্থিতিতে পাড়ার ছেলেপুলেরা ফল ফুল চুরি করে না?
লগি দিয়ে কাঁঠালের কচি পাতা পাড়তে পাড়তে আবিদা বলল, "আমি পাড়ার সব্বাইকে ফল বিলোই। আর আমার গাছ থেকে যে ক'জন ফল চুরি করেছিল একজন সাপের কামড়ে মরেছে, আর একজন জলে ডুবে।"
বল কী! সাপ ফাপ আছে না কি! চল ঘরে গিয়ে বসি।
তুমি আমার মেহেমান। কুটুম। তোমার কোনও ক্ষতি হবে না।
ঘরের ভেতরটা অদ্ভুত রকমের ঠাণ্ডা। চৌকিতে ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। কেন জানি না বেশ চোখে লাগল। একটা চারপায়া টেবিলও আছে। তার ওপরে সাদা রঙের টেবিল ক্লথ পাতা। দুটো প্লাস্টিকের টুল আর একটা কাঠের চেয়ার। সেই চেয়ারের হাতলে একটা সাদা তোয়ালে রাখা। সারা ঘরে কস্তুরী আতরের গন্ধ। যেন আমি আর আবিদা ছাড়াও আর একজন কেউ আছে! ওই চেয়ারে বসে ভাত খেয়েছিলাম। সাদা ভাত। কচি কাঁঠাল পাতার বড়া, ওলের ডাঁটা দিয়ে কাঁঠাল বীজের তরকারি, কাঁঠালের বীজ দিয়ে চিকেন আর তেঁতুল পাতার চাটনি। দারুণ রান্না করে আবিদা। সাদা প্লেটে ভাত বেড়ে দিয়েছিল। কালীপুজোর সময় স্কুল মাঠে মেলা বসে । ওখান থেকেই প্লেটগুলো কিনেছিল।
খাওয়ার পর গল্প হল অনেকক্ষণ। আবিদা সাদা সালোয়ার কামিজ পরেছে। সুতোর কাজ। ওড়নাটা খুব সুন্দর। আমাকে এক থোকা গন্ধরাজ দিল। একটা লিকলিকে ডাল ভেঙে দিল হাসনুহানার।
বলল "যেতে যেতে ফুটে যাবে। ঘরে রাখবা বুন। রাতে পরি আসবে।"
আমি ফট্ করে বললাম জ্বীন আসবে না?
কথাটা শুনে সে খালি হাসল।
ট্রেনে ফেরার পথে মহিলা কামরায় বসলাম। পাশের একটি বয়স্ক মহিলা বললেন "কী মেখিছ গো বেটি? কেমুন যেন আতর আতর গন্দ!"
কলকাতার দিকে যত এগোচ্ছি, বুঝতে পারছিলাম কস্তুরী আতরের গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
আজ আপনাদের জন্য আবিদার রান্না করা রেসিপি দুটো থাকল।
ওলের ডাঁটা দিয়ে কাঁঠাল বীজের তরকারি
উপকরণ: ওলের ডাঁটা আঁশ ছাড়িয়ে টুকরো করে কাটা অনেকটা, ভাপিয়ে রাখা এক কাপ কাঁঠালের বীজ, দুটো কাঁচালংকা দিয়ে ২ টেবিল চামচ সর্ষে বাটা, কুচি কুচি করে কাটা ২ টো পটল, হলুদ গুঁড়ো, নুন, চিনি, পাঁচ ফোড়ন, সর্ষের তেল, কাঁচা লংকা ৫টা।

প্রণালী: ওলের ডাঁটাগুলো ভাপিয়ে নিয়ে জল ফেলে দিন। ভাপানো ডাঁটাগুলো হাত দিয়ে ভালো করে চটকে নিয়ে ওর মধ্যে নুন, অল্প হলুদ এবং সর্ষেবাটা মিশিয়ে নিন।
এবার কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে পাঁচফোড়ন দিন। পটলকুচিগুলো দিয়ে একটু ভাজা ভাজা করুন। এই সময় ভাপানো কাঁঠালের বীজগুলো দিয়ে একটু নাড়ুন চাড়ুন। বেশ ভাজা হলে ওলের ডাঁটাগুলো দিয়ে দিন। বেশ করে নাড়ুন। নুন পরখ করুন। একটু চিনি দিন। এবার ঢাকা দিন। ঢাকা তুলে দু তিনটে কাঁচা লংকা আর এক চা চামচ সর্ষের তেল ছড়িয়ে নামান।

কাঁঠালদানা চিকেন
উপকরণ: চিকেন ছোট ছোট পিস করে কাটা ৫০০ গ্রাম, নুন দিয়ে ভাপান কাঁঠালদানা ২০০ গ্রাম, ঝিরিঝিরি করে কাটা ৪টে পেঁয়াজ, আদা-রসুন বাটা, ধনে জিরে গুঁড়া, লংকা গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, একটা মাঝারি সাইজের টমেটো কুচি, নুন, কয়েকটা কাঁচা লংকা, সর্ষের তেল, ছোট এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, গোটা গোলমরিচ, তেজপাতা।

প্রণালী: একটা পাত্রে এক লিটার জল বসান। জলে কয়েকটা আস্ত গোলমরিচ, ছোট এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি,তেজপাতা ফেলে জলটা বেশ করে ফুটিয়ে নিন। জলের রং পাল্টে যাবে। আর সুঘ্রাণে ভরপুর হয়ে যাবে। সেদ্ধ মশলাগুলো ফেলে জলটা রেখে দিন।
গ্যাসে কড়াই বসিয়ে সর্ষের তেল দিন। গরম হলে ঝিরি ঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ ব্রাউন করে নিন। বাটা মশলা ,গুঁড়ো মশলা এবং টমেটো কুচি দিন। কষুন। নুন দিন। মশলা ভালো করে কষা হলে চিকেনের টুকরোগুলো দিন। ভাপান কাঁঠালের দানাগুলো দিয়ে আরো কিছুক্ষণ কষুন। এবার আলাদা করে তুলে রাখা মশলা দেওয়া সুগন্ধী উষ্ণ জল মাংসে দিয়ে দিন। ঢেকে দিন। ঝোল ফুটে উঠলে এবং গাঢ় হলে এক চা চামচ জিরের গুঁড়ো এবং কয়েকটা কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে দিয়ে ঢাকনা এঁটে গ্যাস অফ করুন।