
শেষ আপডেট: 20 February 2024 12:34
উত্তমকুমাররা তিন ভাই ছিলেন, অরুণ, বরুণ, তরুণ। অরুণকুমারই পরবর্তীকালে হন উত্তমকুমার। এই তিন ভাইয়ের এক দিদিও ছিল, পুতুল। তবে সে অনেক ছোট বয়সেই মারা গেছিল। তাই উত্তমকুমারের কোনও বোন বা দিদিকে নিয়ে কখনওই চর্চা হয়নি। ভাইফোঁটার দিন উত্তম-সহ তিন ভাইয়েরই কপাল শূন্য থাকত (Uttamkumar on Bhaiphota)। এই দিনটায় বরং সেই পুতুলদির কথা ভেবেই বেশ উদাসীন থাকতেন তিন ভাই।
উত্তমকুমারদের বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো ঘটা করে হত। কালীপুজোতে বাজি পোড়ানোর চলও ছিল। কিন্তু তিন ভাইকে ভাইফোঁটা দেওয়ার মতো কেউ ছিলনা। কয়েকবার অবশ্য তুতো বোন বা দিদিরা উত্তমদের ভাইফোঁটা দিতে আসতেন ভবানীপুরের চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে। তখন বহু আত্মীয়-স্বজনের সমাগমে ঘর গমগম করত। তবু পুতুলদির আসন ফাঁকাই থাকত ভাইফোঁটার দিনে। ছেয়ে থাকত বিষাদও।
তবে পরবর্তীকালে উত্তমকুমার বেশ কয়েকবার ভাইফোঁটা পেয়েছিলেন, প্রায় নিজের মতোই এক দিদির থেকে। তিনি হলেন গায়িকা, সুরকার, প্রযোজক অসীমা মুখোপাধ্যায় (Asima Mukherjee)। উত্তমকুমার অসীমা দেবীর প্রযোজনাতেই 'চৌরঙ্গী', 'মেমসাহেব', 'বাঘবন্দী খেলা'র মতো কালজয়ী ছবিতে অভিনয় করেছেন।

অসীমা মুখোপাধ্যায়ের আজও মনে পড়ে উত্তমকুমারকে ফোঁটা দেওয়ার সেইসব দিন। তার উপর গত বছর অসীমা দেবীর নিজের দাদা প্রয়াত হয়েছেন। তাই এই প্রথম বার সম্পূর্ণ একলা, ভারাক্রান্ত মনে ভাইফোঁটার দিন কাটাচ্ছেন অসীমা।
অসীমা মুখোপাধ্যায় 'দ্য ওয়াল'-এর সঙ্গে ভাগ করে নিলেন উত্তমকুমারকে ফোঁটা দেওয়ার সেইসব স্মৃতি। তাঁর কথায়,'তখন আমাদের শ্যুটিং চলছিল 'বাঘবন্দী খেলা' ছবির। উত্তমকুমার শুধু নায়ক নয়, ভিলেন রূপেও যে কতটা দুর্দান্ত অভিনেতা, তা এই ছবি দিয়েই তিনি প্রমাণ করে গেছেন। 'বাঘবন্দী খেলা' ছবির প্রযোজক ছিলাম আমি। সেই সময়েই আমি উত্তমকুমারকে বলেছিলাম, আপনাকে ভাইফোঁটার দিন ফোঁটা দেব। ওঁর তো কোনও বোন ছিল না, তাই। উনি আমার কথায় রাজিও হয়েছিলেন।

তখন উত্তমকুমার ময়রা স্ট্রিটে থাকতেন। ভাইফোঁটার দিন সব উপকরণ গুছিয়ে আমি উত্তমকুমার-সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে গেছিলাম। উত্তমকুমারের জন্য কিনেছিলাম একটা সুন্দর উপহার। কাঠের ছোট্ট বাক্সের মধ্যে একটা স্টিলের ঝরনা কলম আর কালি রাখার দোয়াত। যাতে উনি অবসর সময় বসে এই কলম-দোয়াত দিয়ে লিখতে পারেন। ছোট্ট সামান্য উপহার, কিন্তু সেটা উত্তমকুমারের খুব পছন্দ হয়েছিল।
অসীমা মুখোপাধ্যায় কিন্তু উত্তমকুমারের থেকে বয়সে অনেক ছোট। তবু ভাইফোঁটার দিন উত্তমকুমার অসীমা দেবীকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন।

এই নিয়ে অসীমা দেবী বললেন, 'ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছতেই দেখলাম, উত্তমকুমার ধাক্কা পাড়ের ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে আমার জন্য রেডি হয়ে বসে আছেন। গ্ল্যামার যেন গা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। কিন্তু ওঁর মুখ দেখে বুঝলাম, ভাইফোঁটা নেওয়ার জন্য সরল শিশুর মতো উদগ্রীব হয়ে আছেন। আমি উত্তমকুমারকে যত্ন করে বসিয়ে, মন্ত্র বলে, ভাইফোঁটা দিলাম। আমি ওঁকে মিষ্টি খাওয়ালাম, উনিও আমাকে মিষ্টি খাওয়ালেন। তারপর উনি আমাকে বলেছিলেন, 'আমি খুব খুশি হলাম। অনেকদিন বাদে ভাইফোঁটা পেলাম।

এরপর উত্তমকুমার আমাকে প্রণাম করলেন। যদিও আমি ওঁর থেকে বয়সে ছোট, তবু উত্তমকুমার আমাকে অসীমাদি বলে ডাকতেন। সেই সূত্রেই এই প্রণাম। উনি যেন সত্যিই আমার ভাই। অত বড় তারকার থেকে এরকম আন্তরিক ব্যবহার ভাবা যায়! এতটাই উদার মনের ছিলেন উত্তমকুমার। এমনি এমনি তিনি মহানায়ক হননি।'
ভাইফোঁটা নিয়ে অসীমা দেবীকে কী উপহার দিয়েছিলেন উত্তমকুমার?


অসীমা দেবী বললেন, 'উত্তমকুমার তখন ওঁর জীবনী প্রকাশ করেন। 'আমার আমি' নামের সেই জীবনী বইটিই উত্তমকুমার আমায় উপহার দেন। এর পরে আমি তিন বছর ওঁকে ভাইফোঁটা দিয়েছিলাম। পরে উনি আমাকে শাড়ি উপহার দেন। এর পর তো উনি চলেই গেলেন চিরতরে।'
তবে এই বছর অসীমা দেবীর মন ভীষণ ভারাক্রান্ত। বুজে আসা গলায় বললেন, 'আমার এত বছরের জীবনে এইবার প্রথম কোনও ভাইফোঁটা নেই। আমার নিজের দাদা গত বছর চলে গেলেন। দাদাকে ছাড়া এ বছর ভাইফোঁটা কাটাচ্ছি। দাদার ছবিতেই চন্দনের ফোঁটা দিলাম এ বছর। বোনেরাই বোঝে এটা কত কষ্টের। আজ আমার মন ভীষণ ভারাক্রান্ত।'
যমের দুয়ার থেকে ভাইকে আগলে রাখতেই এই ভাইফোঁটার ব্রত। কিন্তু এমনই পরিহাস, কাঁটা ব্যর্থ করে যমের কাছে ভাই চলে গেলেও, ভাইয়ের প্রতি বোনেদের মঙ্গল কামনা কখনও ফুরোয় না।