
শেষ আপডেট: 29 April 2022 07:31
বন্ধুর ঘাড়ে চেপে 'শোলে' সিনেমার নকল করছেন ছোটবেলার ইরফান খান।[/caption]
মাস্টার্স করার সময়ে ১৯৮৪ সালে নয়াদিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি) অধ্যয়নের জন্য বৃত্তি পান ইরফান। এনএসডি থেকে তিনি নাট্যতত্ত্বে ডিপ্লোমাও করেন। অভিনয়কে ভালবেসে অ্যাকাডেমিক স্তরের পড়ার পাশাপাশি নাটক নিয়ে পড়ার সুবাদে ইরফান এর পরে বম্বে চলে আসেন।
বম্বের এক কামরার ঘরে শুরু হয় অন্য এক স্ট্রাগল। টিউশনি করতেন ইরফান, এসি ঠিক করা থেকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজও করতেন পকেটমানি রোজগার করতে। সে সময়ে দূরদর্শনে ছোট ছোট স্লটে ধারাবাহিক, টেলিছবি হত। সেখানেই কথাসাগর ধারাবাহিকে প্রথম সুযোগ পেলেন অভিনয় করার। এরপর টেলিভিশন নাটক লাল ঘাস ও পর নীলে ঘোড়ে-তে ভ্লাদিমির লেনিন চরিত্রে অভিনয় করেন। এটি মিখাইল শাতরভের রুশ নাটকের উদয় প্রকাশের অনুবাদের উপর ভিত্তি করে নির্মিত।
দূরদর্শন যুগ শেষ হয়ে আসে কেবল্ টিভির যুগ। স্টার প্লাস, সোনি টিভিতে শুরু হিন্দি মেগার যুগ। স্টার প্লাসের 'দর' ধারাবাহিকে প্রধান খলচরিত্রে অভিনয় করেন ইরফান। কেকে মেননের বিপরীতে এই ধারাবাহিকে তিনি একজন ধারাবাহিক খুনির চরিত্রে অভিনয় করেন। স্টার প্লাসে প্রচারিত স্টার বেস্টসেলার্স-এর কয়েকটি পর্বে অভিনয় করেন।
ইরফান বলতেন, তিনি কোনও দিনও স্টার হতে চাননি। সেই তথাকথিত বলিউড নায়ক লুক তাঁর ছিল না। কাপুর কিংবা খান পরিবারের সিলমোহরও ছিল না। ছিল না অর্থবলও। শুধুই স্বপ্ন দেখা দুটো চোখ, আর ভাল অভিনয় করার খিদে নিয়ে তিনি পা রেখেছিলেন বলিউডে।
[caption id="attachment_215114" align="aligncenter" width="720"]
'এক ডক্তর কি মউত' ছবির দৃশ্য।[/caption]
প্রথম চলচ্চিত্রে সুযোগ এল 'সালাম বম্বে' ছবিতে অভিনয় করার। অভিনয় ভাল করলেও, প্রচার পেলেন না সেভাবে। তবে হিরে চিনল জহুরীর চোখ। তপন সিনহা তাঁকে ডেকে পাঠালেন, সিলেক্ট করলেন 'এক ডক্টর কি মউত' সিনেমার জন্য। রমাপদ চৌধুরীর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে অমূল্যর ভূমিকায় অভিনয় করলেন ইরফান খান।
এই সিনেমায় কাজের পরেই আর্ট ফিল্মে খুলে গেল তাঁর দরজা। ইতিমধ্যে করেছেন আমাদের বঙ্গকন্যা রূপা গাঙ্গুলীর সঙ্গে বাসু চ্যাটার্জীর ছবি 'কমলা কি মউত'।
[caption id="attachment_215111" align="aligncenter" width="720"]
রূপা গাঙ্গুলির সঙ্গে।[/caption]
গোবিন্দ নিহালনির 'দৃষ্টি' ছবিতে কাজ করলেন ডিম্পল কাপাডিয়া, শেখর কাপুরের সঙ্গে। সেইসঙ্গে চলছিল টিভিতে অভিনয়ও। বেশ কিছু জনপ্রিয় ধারাবাহিকে অভিনয় করেন ইরফান খান। চাণক্য, ভারত এক খোঁজ, সারা জাহাঁ হামারা, বনেগি আপনি বাত, চন্দ্রকান্তা, শ্রীকান্ত, অনুগুঞ্জ, অধিকার,স্পর্শ, সফর, মোহব্বতে, নয়া দৌড়, শশশ্ কৌই হে ইত্যাদি।
এর পরে সুযোগ এল বেশ কিছু ফিল্মে। দ্য গোল, কসুর, গুনাহ, হাসিল, ফুটপাথ।
অনেক টিভি সিরিজ ও ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও ইরফান সব চেয়ে বেশি প্রশংসা আর সাফল্য পান বিশাল ভরদ্বাজের 'মকবুল' ছবির মাধ্যমে। শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ নাটক নিয়ে এ ছবি হয়। ইরফান খানের উপরে অনেকটাই পড়ে প্রচারের আলো।
এর পরে ইরফান খানকে নিয়ে অনবদ্য ছবি করলেন একজন জার্মান পরিচালক। জার্মান পরিচালক বাংলা ক্রসওভার ছবি কি অসাধারণ বানিয়েছেন, তাতে ইরফান কতটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন, তা দেখার জন্যই দেখতে হবে এই চিরন্তন লাভস্টোরি, যা বড্ড বাস্তব। যা রীতিমতো কাঁদায়। 'শ্যাডোস অফ টাইম'। এই ছবিতে ইরফান-সহ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শোভা সেন, তানিষ্ঠা চ্যাটার্জীও ছিলেন।
'রোগ', 'চকোলেট', 'রাজকুমারী', 'দুবাই রিটার্ন' ছবিতেও নজর কাড়েন ইরফান।
[caption id="attachment_215128" align="aligncenter" width="500"]
নেমসেক।[/caption]
ইরফানের সঙ্গে বাঙালি কানেকশনও বারবার জুড়ে গেছে। তাই তো ঝুম্পা লাহিড়ীর বেস্ট সেলার বই 'নেমসেক' যখন ছবি হল, তখন টাবুর বিপরীতে মীরা নায়ার ইরফানকেই বেছে নিলেন। বাঙালি কবির চরিত্র কী দুর্দান্ত ফুটিয়েছিলেন ইরফান! হয়তো আসল কারণ তাঁর পছন্দের আটপৌরে রুচি।
স্লামডগ মিলিয়নার, লাইফ অফ পাই এর মতো ছবি যেমন করেছেন ইরফান, তেমনই নায়ক হিসেবে করেছেন 'বিল্লু' র মতো বানিজ্যিক ছবি। কঙ্কনা সেনশর্মার বিপরীতে অনুরাগ বসুর 'মেট্রো' ছবিতেও কী দারুণ তিনি! সেই সঙ্গে হায়দর, লাঞ্চবক্স বা পিকুর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দেখলে বোঝা যায় কত বড় আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা তিনি।
যখন ১৯৯৩ সালে জুরাসিক পার্ক রিলিজ করেছিল তখন ব্ল্যাকে টিকিট কেটে ইরফান খান দেখেছিলেন সেই আইকনিক হলিউড ছবি। কিন্তু কে জানত, ঠিক ২২ বছর পরে এই ছবির সিকোয়্যালে তাঁকেই অভিনয় করতে দেখা যাবে! 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ড' ছবিতে ২০১৫ সালে অভিনয় করলেন ইরফান খান। ভারতীয় হিসেবে এ নজির খুব একটা নেই। ইতিহাস গড়লেন তিনি।
[caption id="" align="alignnone" width="1280"]
জুরাসিক ওয়ার্ল্ডে ইরফান।[/caption]
তবু তিনি মাটিতে পা দিয়েই চলতেন। এটাই তাঁর জীবন-সারল্য। ‘স্লামডগ মিলেনিয়ার’, ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান’, ‘লাইফ অব পাই’, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’-এর মতো ঈর্ষণীয় অস্কার জয়ী সিনেমা রয়েছে তাঁর সিভিতে। কিন্তু খুব সাধারণ জীবন যাপন করে গেছেন তিনি।
তাঁর কাছে ভাষা কোনও দিনও অভিনয়ের বাধা হয়নি। তাই বাংলাদেশের ছবি 'ডুব'-এও অভিনয় করে দুই বাংলার ভালবাসা পান তিনি।
ইরফানের স্ত্রী-ও একজন বাঙালি। সুতপা শিকদার। স্ত্রী সুতপাই তাঁর পেছনে ভরসার হাত। তাই ইরফানের জীবনযাত্রা, পছন্দ, ভালবাসাও ছিল বাঙালিদের মতোই। রসগোল্লা, সন্দেশ থেকে সমস্ত পূজাবার্ষিকী তাঁর ঘরে থাকত। কচুর লতি দিয়ে ভাত খেতেন, প্রিয় ছিল মাছের ঝোল। এমনকি বহু বাঙালি পুরুষের মতো তাঁর পছন্দের পোশাকও লুঙ্গি।
[caption id="attachment_215118" align="aligncenter" width="443"]
স্ত্রী সুতপার সঙ্গে।[/caption]
ইরফানের জীবনে ছন্দপতন ঘটেছিল ২০১৮ সালেই। সেই বছর মার্চ মাসেই আচমকা ছড়িয়ে পড়েছিল ইরফানের অসুস্থতার খবর। নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার ধরা পড়ে অভিনেতার। এই মারণ রোগের সঙ্গে লড়াইতে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী সুতপা। লন্ডনেও গেছিলেন চিকিৎসা করতে। চিকিৎসা শেষে ইরফান বলেছিলেন “সুতপাই আমার জোর। সবসময় আমার পাশে ছিল ও। আজ আমি যে অবস্থায় আছি, মনোবল ফিরে পেয়েছি, যেটুকু সুস্থ রয়েছি—-এই সবটায় ওঁর অবদান। কতটা বলে বোঝানো যাবে না। ওর জন্যই এখন বাঁচতে চাই।”
[caption id="attachment_215126" align="aligncenter" width="585"]
সপরিবার।[/caption]
সেই ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়ার সময় থেকেই একে অপরের সহপাঠী ছিলেন ইরফান ও সুতপা। সুতপা-ইরফান এর প্রেমের পরে দীর্ঘদিন লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন তাঁরা। শুরুর দিকে ইরফানের রোজগার খুব একটা ছিল না, ছিল স্ত্রীর সাহচর্য আর পাশে থাকা। শুধু তাই নয়, পারিবারিক জটিলতা এড়ানোর জন্য সুতপাকে বিয়ে করে হিন্দু হতে চেয়েছিলেন ইরফান, যা খুব বিরল। হিন্দু স্ত্রীদেরই সাধারণত মুসলিম ধর্মে রূপান্তরিত করা হয়।
সুতপা চিত্রনাট্য লেখেন। তাঁদের দুই ছেলে-- বাবিল ও আয়ান।
মারণ রোগ থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ইরফান ফের গত বছরে কাজে ফিরেছিলেন। আংরেজি মিডিয়াম ছবির শ্যুট করেন তিনি। ২০১৭ সালে তৈরি ‘হিন্দি মিডিয়াম’ ছবির সিক্যুয়েল ‘আংরেজি মিডিয়াম’। এই মনের জোরই ছিল তাঁর পাথেয়। কখনই চাইতেন না সহকর্মীদের সহানুভূতি। হোমি আদাজানিয়ার পরিচালনায় ২০ মার্চ মুক্তিও পায় ‘আংরেজি মিডিয়াম’। কিন্তু লকডাউনের কারণে হল থেকে উঠে যায়। তবু সান্ত্বনা, রিলিজের খবর জানার পরেই চলে গেলেন ইরফান।
ক্যান্সার ক্রমেই বাড়ছিল। ব্রেন থেকে কোলনে ছড়িয়ে পড়ে। আবার ভর্তি হন হসপিটালে। বুধবার মৃত্যুর আগের মুহূর্ত স্ত্রী পুত্রদের সঙ্গে কাটিয়েই শেষ বিদায় নিলেন এই মহান অভিনেতা, যা বড়ই অকালে। হয়তো আরও অনেক আন্তর্জাতিক মানের কাজ তাঁর করার ছিল।
৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি ৫০টির বেশি দেশীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার-সহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাঁকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীতেও ভূষিত করে।
হয়তো প্রতিভাবান ভালো মানুষদের মেয়াদ অল্পদিনই হয়। তাঁরা এতই দুর্লভ যে পৃথিবীতে তাঁদের বেশি দিন ধরে রাখতে আমরা পারি না। তাই জীবনযুদ্ধ শেষে আজ ৫৪ বছর বয়সেই চলে গেলেন ইরফান খান। বলিউডে তথা ভারতীয় সিনেমায় ইন্দ্রপতন ঘটল।
দর্শক-অনুগামীদের চোখের ধারায় ভালবাসার উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রইলেন ইরফান খান।