
সত্যজিৎ রায়
শেষ আপডেট: 24 April 2025 14:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সত্যজিৎ রায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের অসাধারণ প্রতিভা। ১৯৯২ সালের আজকের দিনে মহাপ্রয়াণের পথে পাড়ি দেন মানিকদা। কিন্তু আজও, তাঁর সিনেমা থেকে মানুষ শিখছে, এমনকি হলিউডের পরিচালকরাও তাঁর সিনেমাটিক কৌশল নিজেদের ছবিতে ব্যবহার করছেন। অস্কারজয়ী এই পরিচালক, যিনি ভারতীয় সিনেমাকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন, তাঁকে বলা হয় ‘চলমান চলচ্চিত্র বিদ্যালয়’। সমাজ, রাজনীতি আর নারীকেন্দ্রিক গল্প বলা ছিল মানিকবাবুর ছবির বিশেষত্ব। বিশ্বাস করতেন, সিনেমা এক শক্তিশালী অস্ত্র — আর এই বিশ্বাসই তাঁকে করে তুলেছেন সিনেমা শিক্ষার্থীদের কাছে এক জীবন্ত গাইডলাইন।
সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray, Satyajit Ray death anniversary) শুধু একজন কিংবদন্তি পরিচালকই ছিলেন না, একজন লেখক, শিল্পী, চিত্রকর,গীতিকার, প্রচ্ছদশিল্পী ও পোশাক ডিজাইনার। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সত্যজিৎ রায় কখনও কোনও ফিল্ম স্কুলে পড়েননি। শুধুই সিনেমা দেখে শিখেছেন, আর তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’-র মাধ্যমে সিনেমার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই প্রতিভা ও দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই তিনি পেয়েছিলেন ‘অস্কার অনারারি অ্যাওয়ার্ড’। তিনিই একমাত্র ভারতীয় যিনি এই সম্মান পেয়েছেন। আজ সত্যজিৎ রায়ের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। কীভাবে তাঁর সিনেমা আজও আমাদের শেখায়, আর কেন তিনি এক ‘ইনস্টিটিউশন অফ সিনেমা’...
সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray, Satyajit Ray death anniversary) তাঁর সিনেমার মাধ্যমে সমাজের সে সব সকল সমস্যাকে তুলে ধরতেন, যেগুলো সেই সময়ের অন্য পরিচালকরা ভাবতেও সাহস করতেন না। তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালি’ই ছিল প্রমাণ। এরপর ‘জলসাঘর’, ‘চারুলতা’, ‘দেবী’ ও ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র মতো সিনেমার মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের নানা বিষয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ‘পথের পাঁচালি’র একটি দৃশ্য আজও সিনেমাপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে— যেখানে অপু আর দুর্গা কাশফুলের মাঠে দৌড়ে চলেছে, ট্রেন দেখতে। ঋতু পরিবর্তনের বার্তা দেয় সেই কাশফুল, ট্রেনের গতি আর চরিত্রদের ছুটে চলা— সব মিলিয়ে যেন গ্রাম থেকে শহরের দিকে যাত্রার এক অসাধারণ রূপক।
পাঁচ-ছয়েক দশকে, যখন সিনেমার অর্থ ছিল ‘নায়ক’ আর তাতে পুরুষ চরিত্রই থাকত কেন্দ্রে। মানিকবাবু তখন নারী এবং নারীদের গল্প বলছিলেন। ‘দেবী’, ‘চারুলতা’, ‘মহানগর’, ‘ঘরে বাইরে’-র মতো ছবিতে নারীদের আত্মসম্মান, আবেগ ও সংগ্রামকে যেভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সে সময়ে তা একেবারেই ব্যতিক্রম।
সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray, Satyajit Ray death anniversary) ছবিতে ভালোবাসা, দুঃখ, আশা আর হতাশার মতো মানবিক অনুভূতিগুলো গভীরভাবে ধরা পড়ে। মানুষে-মানুষে সম্পর্কের জটিলতাও তিনি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর ছবিতে। দর্শক খুব সহজেই এই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
মানিকবাবুর (Satyajit Ray, Satyajit Ray death anniversary) ছবিতে সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব, তাঁর দৃশ্যগুলোই কথা বলতো। সংলাপের চেয়ে দৃশ্য অনেক বেশি অর্থবহ করে। ‘নায়ক’ ছবির স্বপ্নদৃশ্য হোক বা ‘চারুলতা’ ছবিতে চারুলতা আর অমলের মধ্যে আবেগঘন সেই নীরব কথোপকথন— সবই মনের গভীরে ছাপ রেখে যায়।
পাঁচ-ছয় কিংবা সাত-আটের দশকে তৈরি সত্যজিতবাবুর ছবি যেন আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি এমন বিষয় বেছে নিতেন যা যে কোনও শ্রেণির দর্শকের মনে দাগ কাটে।
(Satyajit Ray, Satyajit Ray death anniversary) অনেক ছবিতে যেমন সামাজিক বিষয় উঠে এসেছে পাশাপাশি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক মন্তব্যও ছিল। তিনি রাজনীতি, দুর্নীতি আর বৈষম্যকে তাঁর সিনেমায় তুলে ধরতেন নিপুণভাবে। যেমন, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ ছবিতে দুই নবাবের দাবা খেলার আড়ালে ব্রিটিশ আগ্রাসনের রূপক দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। এ ছাড়াও ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘জনঅরণ্য’, ‘গণশত্রু’, ‘ঘরে বাইরে’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সিনেমাগুলিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ উঠে এসেছে। এমনকি ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটি ছোটদের ছবি হলেও, উঠে এসেছে সে সময়ের রাজনীতির প্রেক্ষাপটও। তবে তা কোনওভাবে প্রকট নয়। অন্তর্লীন।
সত্যজিতের (Satyajit Ray, Satyajit Ray death anniversary) ছবিতে সঙ্গীত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রথম দিকে তিনি রবি শঙ্কর, বিলায়েত খান, আলি আকবর খানের মতো প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। পরে নিজেই পশ্চিমী সংগীত শিখে নিজের সিনেমায় সুর সংযোজন শুরু করেন, যার শুরু ‘তিন কন্যা’র মাধ্যমে। তাঁর সুরারোপে ‘সোনাটা’, ‘ফুগ’ ও ‘রন্ডো’র মতো পশ্চিমী ধাঁচের সংগীতের ব্যবহারও হয়েছে।
সত্যজিৎ রায় ছিলেন এক্সপেরিমেন্টেশনে বিশ্বাসী। ‘চারুলতা’র পর তিনি নানা ধরনের ছবি বানিয়েছেন— ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা কাহিনি, এমনকি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভিত্তিতেও। এই সময়ে তিনি লেখেন ‘দ্য এলিয়েন’ নামক চিত্রনাট্য, যা শেষমেশ ছবি হয়ে ওঠেনি। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জনঅরণ্য’, ‘নায়ক’— এসব সিনেমা তার সৃজনশীলতার নিদর্শন। সত্যজিৎ রায় শুধু ছবিই বানাননি, তিনি ছবিকে বাঁচিয়ে রেখে গেছেন। তাঁর কাজ আজও প্রাসঙ্গিক, জীবন্ত এবং প্রতিটি সিনেমাপ্রেমীর জন্য নিরবিচারে এক শিক্ষা।