
পঞ্চাশে ফিরে দেখা পঁচিশের হিরো শিবপ্রসাদকে
শেষ আপডেট: 20 May 2024 18:44
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
২০ শে মে ১৯৭৪ এর জাতক আজ দেখতে দেখতে পঞ্চাশে পা দিলেন। ৫০ টি বসন্ত পেরিয়ে তিনি একাধারে পরিচালক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। শহর সহ বাংলা জুড়ে রমরমিয়ে চলছে তাঁর প্রযোজিত 'দাবাড়ু' ছবি। অভিনব বিষয়ে ছবি বানিয়ে যিনি আমাদের বারবার চমকে দেন, তিনি বরানগরের ছেলে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। টালিগঞ্জ পাড়ার চির চেনা শিবুদা।
আজ পঞ্চাশের শিবপ্রসাদের মধ্যে পঁচিশের শিবুকে খুঁজে দেখলে কেমন হয়? জানেন কি যখন শিবপ্রসাদ পঁচিশের কোঠায় তখন তাঁকে নায়ক করে বাংলা ছবি হয়েছিল। আর সেই ছবির পরিচালক ছিলেন নীতিশ রায়, যিনি নন্দিতা রায়ের স্বামী। সেই শুরু শিবপ্রসাদ আর নন্দিতার বন্ধুত্ব। ছবিটার নাম ছিল ', ‘জামাই নম্বর ওয়ান’।
পরিচালক প্রযোজকের আড়ালে অভিনেতা শিবপ্রসাদ খুব একটা সামনে আসতে চান না। কিন্তু 'রামধনু', 'কন্ঠ','হামি' নিজের ঘরের ছবিতে নিজের অভিনয়ের জাত দেখিয়েছেন শিবপ্রসাদ।
শিবপ্রসাদের প্রথম ছবি কিন্তু ‘জামাই নম্বর ওয়ান’ নয়। নায়ক রূপে ‘জামাই নম্বর ওয়ান’ ছিল তাঁর প্রথম ছবি।
বরানগর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন শিবপ্রসাদ। এরপর হিন্দু স্কুল থেকে পাশ করেন তিনি। পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। 'বহুরূপী'তে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর কাছে অভিনয় শিখতেন। পাশাপাশি ঋতুপর্ণ ঘোষের অধীনে ফ্রিলান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন একটি নামী সিনে পত্রিকায়।
১৯৯৫ সাল। রাজা দাশগুপ্ত এক ঝাঁক নতুন ছেলেমেয়েদের নিয়ে শুরু করলেন 'একুশে পা' সিরিয়াল। এখানেই শিবপ্রসাদের প্রথম ছোট পর্দায় অভিনয়।
বড় পর্দায় অভিনয়ের ডাকও এসেছিল পরপরই। কুমার সাহানি রবীন্দ্রনাথের 'চার অধ্যায়' করছিলেন হিন্দিতে। সিনেমার বাইরের লোকদের তিনি মুখ্য চরিত্রে নেন। ছবির নায়ক অ্যাড এজেন্সির ছেলে, উঠতি সুদর্শন মডেল, সুমন্ত চট্টোপাধ্যায় আর নায়িকা কেলুচরণ মহাপাত্রের ছাত্রী ওড়িশি ডান্সার নন্দিনী ঘোষাল। এই ছবিতেই একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন শিবপ্রসাদ। 'চার অধ্যায়' সমালোচক মহলে প্রশংসিত হলেও দর্শকনন্দিত হয়নি। ছবিটি সেভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছয়নি।
শিবপ্রসাদকে লাইমলাইটে এনে দিয়েছিল যে ছবি সেটি ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের 'দহন'। ঝিনুকের ভাই অর্থাৎ ইন্দ্রাণী হালদারের হোস্টেলে থাকা ভাইয়ের চরিত্রে নজর কাড়েন শিবপ্রসাদ। কিন্তু এমন পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতাকে হিরো করে পুরো একটা ছবি করার সাহস দেখান নীতিশ রায় ও নন্দিতা রায়।
১৯৯৮। সবেসবে ইটিভি বাংলা খোলা হাওয়া এনেছে বাংলা বিনোদন জগতে। হায়দ্রাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটিতে শ্যুটিং করতে দৌড়চ্ছেন রোজ টালিগঞ্জের শিল্পীরা। চোখ ধাঁধানো স্টুডিও। কী নেই সেখানে। সেখানেই সেট পড়ল নীতিশ রায়ের ‘জামাই নম্বর ওয়ান’ ছবির।
অনেক কষ্টে বরানগর থেকে শিবপ্রসাদকে নিয়ে আসা হয় রামোজি ফিল্ম সিটিতে। বাঙালির জামাইষষ্ঠী ঘিরে সেই কবে ১৯৩১ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্যের সবাক ছবি হয়েছিল। তারপর জামাই দের নিয়ে সেরকম ছবি নেই। ‘জামাই নম্বর ওয়ান’ বাংলা ছবির সে সাধ মিটিয়েছিল।
ছবির হিরো জামাই শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর বিপরীতে নায়িকা মৌলি গঙ্গোপাধ্যায়। কলকাতা বম্বে মিলিয়ে কাজ করছেন তখন মৌলি। আর বিজ্ঞাপনে মৌলি চেনা মুখ। শিবপ্রসাদ-মৌলিকে ঘিরে গল্প।
শুধু তাই নয়, ,‘জামাই নম্বর ওয়ান’ ছিল তারকা খচিত ছবি। দীপঙ্কর দে র মেয়ে মৌলি। মৌলির মা শকুন্তলা বড়ুয়া। মৌলির বর শিবপ্রসাদ জামাই ষষ্ঠীর দিন শ্বশুরবাড়ি আসছে। তাই সাজো সাজো রব। বাড়ির পরিচারক চিন্ময় রায় সব জোগাড় করছে। এদিকে শিবপ্রসাদের বাবা রঞ্জিত মল্লিক আর মা সন্ধ্যা রায়। তিনি অন্ধ। শিবপ্রসাদকে শিশু বয়সের পর আর নিজের চোখে দেখতে পাননি মা সন্ধ্যা রায়। আবেগ থেকে কমেডি, নানা ক্লাইম্যাক্সে জমজমাট ছবি। এছাড়াও ছিলেন মিতা চট্টোপাধ্যায়, লাবণী সরকার, সুনীল মুখোপাধ্যাযায় ,ফাল্গুনী সান্যাল ও বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। ভিলেন বিপ্লব এখানে এক নারীসুলভ চরিত্রে মাত করেছিলেন। এই ছবির কাহিনি ছিল নন্দিতা রায়ের। নতুন মেয়ে জামাইয়ের বিয়ে ঘিরে গল্প। নীতিশ ও নন্দিতা একটা ফ্রেশ জুটি শিবু-মৌলিকে আনতে চেয়েছিলেন টলিউডে। রকেট মণ্ডলের সঙ্গীতাযোজনে গানের দৃশ্যায়ন খুব আধুনিক ভাবে করা হয়েছিল। রামোজিতে শ্যুট হলেও ছবিটিতে ছিল নিখাদ বাঙালিয়ানা।
কিন্তু 'জামাই নং ওয়ান মুক্তির পর সেভাবে ব্যবসা করতে পারল না। ছোটখাটো চেহারা সুন্দর মুখের চকোলেট বয় হিরো শিবপ্রসাদ বক্সঅফিসে জায়গা করতেই পারলেন না। অথচ কী সাবলীল অভিনয় করেছিলেন তিনি। ছিল না কোনও জড়তা, ছিল না কোনও আড়ষ্টতা।
শিবপ্রসাদ-নন্দিতা পরিচালকদ্বয়ের হাত ধরেই প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি আবার প্রাক্তন থেকে বর্তমানে ফিরেছিল। কিন্তু প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জমানাতেই 'জামাই নম্বর ওয়ান' ভাল সিনেমা হল বা ভাল ডিস্ট্রিবিউটর পায়নি। প্রসেনজিতের দাপটে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় বা কুণাল মিত্রের মতোই শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও সফল হিরো প্রথম যৌবনে হয়ে উঠতে পারেননি।
তবে এর দু বছর পরই ঋতুপর্ণ ঘোষের 'বাড়িওয়ালি' ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র সহকারী পরিচালকের অভিনয় করে শিবপ্রসাদ ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে নন্দিতা রায়ের মনে শিবপ্রসাদকে হিরো করার সুপ্ত বাসনা ছিলই। দুজনের উইন্ডোজ প্রোডাকশনের হাত ধরে একের পর এক ছবিতে শিবপ্রসাদ মুখ্য চরিত্রে আমাদের চমকে দিলেন। পঞ্চাশে শিবপ্রসাদের নতুন ইনিংস শুরু। আরো নতুন নতুন চমকে তিনি আমাদের মন ভরিয়ে দেবেন এই আশায় রয়েছেন দর্শকরা।