রাজনীতি-স্বার্থসিদ্ধি-আখের গোছানো-মিথ্যে কথা-স্বজনপোষণ… হাতে হাত ধরে চলেছে আজও। রামগড়ের গব্বর দুনীর্তি আর দুঃশাসনের পরাকাষ্ঠা হলেও পর্দার বাইরে আমজাদ খান কিন্তু সুনীতির রূপরেখাটুকু খুব অল্প কথায় বুনে দিয়েছিলেন!

আমজাদ খান
শেষ আপডেট: 30 October 2025 16:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি ডাকাত। মামুলি কোনও অপরাধী বা দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক নন। লালমোহনবাবুর দুশমনের থেকেও দুর্ধর্ষ। রুখাশুখা রামগড়ে তাঁর রাজত্বে ন্যায়ের দণ্ড কাঁপে। নির্বিচারে হত্যা, লুঠ, ভয়—সবই নিত্যনৈমিত্তিক। তবু ‘মা ভবানী’ বলে রক্ততিলক কেটে ত্রাস ছড়ানো নয়, বরং আর্মি জ্যাকেটে বেল্ট হাতে গব্বরকে দেখে ভয় ছিল অনেক বেশি নিঃশব্দ। কখন হাসবেন, কখন খুন করবেন—কেউই জানে না।
‘শোলে’র গব্বরকে এভাবেই ছাঁচে ফেলেছিলেন সেলিম-জাভেদ। পাশ্চাত্যের ছায়ায় তৈরি এই চরিত্র হয়ে উঠেছিল ভারতীয় সংস্কৃতির দানব-প্রতীক। 'কিতনে আদমি থে' শুনলেই থমকে যেত পর্দা। ভয় যেন এক শিল্পরূপ নিত গব্বরের সংলাপে।
অভিনয়ে সেই ভয়কে জীবন্ত করেছিলেন আমজাদ খান—বিস্ফারিত চোখ, গগনভেদী হাসি, আবার আচমকা চুপ করে যাওয়া। কাপড়ের পুটলি খুলে খৈনি ডলার মধ্যেও যেন পাশবিক ভাব। আজ পর্যন্ত এমন ভিলেন ভারতীয় সিনেমা দ্বিতীয়টি দেখেনি। অথচ সেই মানুষটিই বাস্তবে ছিলেন সবচেয়ে স্পষ্টবাদী।
যে ‘অভিনেতা’ গব্বর পর্দায় অতখানি অন্যায়, অবিচার আর অনিষ্টের প্রতিমূর্তি, সেই ‘মানুষ’ আমজাদ খানই কিন্তু সুনীতি-দুর্নীতি, রাজনীতির মারপ্যাঁচ, অভিনেতাদের রাজনীতির ময়দানে নামা নিয়ে শুধু ‘স্পষ্টবাদী’ নন, সময়ের চেয়েও অনেকটাই এগিয়ে! নয়ের দশকে দেওয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার, ইদানীং সমাজমাধ্যমে আকছার ঘুরপাক খায়। যেখানে আমজাদ বলেছেন মিডিয়ার দায়িত্ব, দূরদর্শনের ভূত-ভবিষ্যৎ কিংবা ফিল্ম ম্যাগাজিনের ভাল-মন্দ নিয়ে।
Once upon a time in Bollywood ❤️
Listen....thank me later. pic.twitter.com/bLeIpRvUKy— Gabbar (@Gabbar0099) October 28, 2025
সেখানেই কথাপ্রসঙ্গে উঠেছে ‘কোরাপশনে’র প্রসঙ্গে। প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করেন, ‘ভারতে দুর্নীতি কি ছোট স্তর থেকে ক্রমশ বড় স্তরে ওঠে?’ সওয়াল শেষ হতে না হতেই আমজাদের উত্তর, ‘আমি তো বলব, উলটো… ভারতে দুর্নীতি উপরে শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে নিচুতলায় ছড়িয়ে পড়ে!’ এরপর জুড়ে দেন, ‘এর কারণও রয়েছে। ধরুন, আমি চাকর। যদি মালিক মদ না খায়, জুয়া না খেলে, তাহলে আমার সাহস হবে না, মাতাল হয়ে ঘরে ঢুকি! কিন্তু যদি মনিব আয়েশি হন, তাহলে আমি এটাই মনে করব: আমায় বাধা দেবে কে? ও নিজেই নিজেকে আটকে রাখতে পারে না… আমি কোন ছাড়!’ এর প্রতিবিধান? কোন উপায় আছে দেশ-বদলের? কয়েক দশক আগে আমজাদের ভবিষ্যদ্বাণী: ‘খুব মুশকিল। এর জন্য পুরো খোলনলচে বদলে ফেলতে হবে!’
এর পরেই উঠে আসে বলিউড-রাজনীতির যোগাযোগের প্রসঙ্গ। হেমা মালিনী থেকে অমিতাভ বচ্চন হয়ে অনেক তারকাই রাজনীতিকে বিকল্প পেশা হিসেবে দেখেছেন। আমজাদ কিন্তু এখানেও স্পষ্টবাদী। কারও নাম আলাদা করে না নিলেও দ্ব্যর্থহীন গলায় বলে দেন, ‘একমাত্র দত্ত সাহেবকে (সুনীল দত্ত) ছেড়ে বাকি আর সবাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে রাজনীতিতে গিয়েছেন। সবাই ভাবেন, এতে তাঁর কতটা স্বার্থসিদ্ধি হবে, কীভাবে হবে!’
প্রশ্নকর্তা তক্ষুনি ছুড়ে দেন মোক্ষম সওয়াল: ‘আপনি নিজে কখনও রাজনীতিতে আসবেন?’ একইভাবে আমজাদের দ্রুত জবাব, ‘কোনওদিন না, কোনওদিনই না। কারণ আমি মিথ্যে কথা মোটেও বলতে পারি না!’ পালটা প্রশ্ন: ‘রাজনীতিকদের মিথ্যে বলতে হয়?’ একইভাবে অকপট আমজাদ বলে দেন, ‘রাজনীতি করতে গেলে মিথ্যে বলাটা জরুরি। কত লোককে খুশি করতে হয় বলো তো!’
গুরুগম্ভীর মুখে কথাগুলো যখন আমজাদ খান বলছেন, তাতে ‘গব্বরীয়’ ক্রুরতা নয়, ফুটে ওঠে নিখাদ, নিপাট বাস্তব। দশক পেরিয়ে গেলেও একটি কথাও ফিকে হয়নি। রাজনীতি-স্বার্থসিদ্ধি-আখের গোছানো-মিথ্যে কথা-স্বজনপোষণ… হাতে হাত ধরে চলেছে আজও। রামগড়ের গব্বর দুনীর্তি আর দুঃশাসনের পরাকাষ্ঠা হলেও পর্দার বাইরে আমজাদ খান কিন্তু সুনীতির রূপরেখাটুকু খুব অল্প কথায় বুনে দিয়েছিলেন!