
শেষ আপডেট: 26 January 2024 13:50
অনেকে বলেন বাউল সাধকরা ক্রান্তদর্শী। তাঁদের অন্তরচোখ রয়েছে। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে তাঁরা ভবিষ্যৎ দেখতে পান। তাঁরা শিক্ষিত নাকি আধা শিক্ষিত তাতে তাঁদের এই জীবনবোধ ও দর্শনে ফারাক পড়ে না।
সত্যিই তো। নইলে ক্লাস এইট পাশের বিদ্যে নিয়ে কেউ লিখতে পারেন, ‘একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া/জনম ভরে চলিতেছে/মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি/কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’।
শুধু কি তাই, সে গানে লিখলেন—‘মন, দেহঘড়ি চৌদ্দতলা, তার ভিতরে দশটি নালা, একটা বন্ধ নয়টা খোলা গোপনে এক তালা আছে..’
এ পার বাংলায় এই লোকসঙ্গীত তথা বাউল গান বহু লক্ষ মানুষ শুনেছেন। সে গানের কথা সুর মনে লালন করেছেন। কিন্তু জানেন কয়জনা যে এই গানের স্রষ্টা আসলে ওপার বাংলার। তিনি আবদুর রহমান বয়াতি।
বেঁচে থাকলে এই বাউল সাধকের এখন বয়স হত ৮৮ বছর। ইংরেজি বছরের প্রথম দিনটাতে তাঁর জন্ম। তখনও দেশভাগ হয়নি। ওপার এপার মিলিয়ে একটাই বাংলা। ১৯৩৬ সাল। বাবা তোতা মিয়া ঢাকার দয়াগঞ্জের বাজারে একটা ভাতের হোটেল চালাতেন। দিনের বিক্রিবাটা খাওয়া দাওয়া নিকোনো শেষ হয়ে গেল সেই জোড়াতাপ্পি দেওয়া চালের নিচে বসত গানের আসর। যে কজন মানুষ সেখানে আসতেন তাঁরা মনের দিক থেকে অপার ধনী ছিলেন। যেমন তাঁদের কথা, তেমনই গলায় সুর। একেক জন দিকপাল বাউল। খালেক দেওয়ান, হালিম চিস্তি, রজ্জব আলি দেওয়ান, দলিল উদ্দিন, আলাউদ্দিন বয়াতি, বাউল মারফত আলী আকছার আসতেন বলে শোনা যায়।
আবদুল রহমান বয়াতি এমন গানের পরশে বেড়ে ওঠেন। আসলে সে হয়তো ছিল পরশ পাথরের মতো। শিশু মন কাদার সমতুল। শিশু বয়াতির মনে সুর, কথা ও সাধনা যেন গেঁথে যায়। তাই কৈশোর থেকেই তিনি ঘর ছাড়া। যেখানে বাউল গানের আসর বসত, সেখানের আবদুর রহমান ঠেলেঠুলে আগে গিয়ে বসতেন। গান শুনতে শুনতে পায়ে তাল ঠুকতেন।
ওপার বাংলায় আবদুর রহমানের যেন অষ্টোত্তর শত পরিচয়। তিনি একাধারে বাউল, আবার চারণকবি, তিনি গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন। একটা মানুষ তাঁর জীবদ্দশায় গানের অ্যালবাম করে গেছেন প্রায় পাঁচশ। সৃষ্টিতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, বিরহতত্ত্ব প্রেমতত্ত্ব, সহ বিভিন্ন আঙ্গিকের গান রচনা করেছেন প্রায় চার হাজার।
সেই সব গানের মধ্যে বহু গান এ পার বাংলায় অধিক প্রচলিত। অথচ তাঁরই যে গান ও সুর তা অজানা থেকে গিয়েছে হয়তো। যেমন ইদানীং বাংলায় বহু গানের অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়, “দে দে পাল তুলে দে/ও মাঝি হেলা করিস না/ছেড়ে দে নৌকা মাঝি/ যাবো মদিনা..।‘ এ গান বয়াতিরই লেখা ও সুর দেওয়া।
বয়াতির পরিবারের উত্তরসূরিরা বলেন জীবনের এক পর্যায়ে পৌঁছে সুর তাঁকে আরও বিবাগী করেছিল। তিনি নিজের উদ্যোগেই শিখে নিয়েছিলেন, দোতারা, একতারা, হারমোনিয়াম। তার পর ৮২ সাল নাগাদ নিজের বাউল দল গড়ে তোলেন। সেই দলেরও নাম ছিল ‘আবদুর রহমান বয়াতি’। গানের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে তিনি পটু ছিলেন বলে ওপার বাংলায় অনেকে তাঁকে সব্যসাচী বাউলও বলতেন।
এপার বাংলায় যেমন পূর্ণদাস বাউল বা তাঁর পর কার্ত্তিক দাস বাউল কিংবা এখন পার্বতী বাউলের খ্যাতি গোটা ভুবন জোড়া, তেমনই ছিলেন আবদুর বয়াতি। দুনিয়ার যেখানেই বাঙালিরা রয়েছেন, সেখানেই গান গাইতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন আবদুর বয়াতি। এমনকি জর্জ বুশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন একবার হোয়াইট হাউজেও পারফর্ম করেছেন তিনি।
আওয়ামি লিগের প্রবীণ নেতাদের মুখে শোনা যায়, আবদুর রহমান বয়াতির গুণমুগ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানও। ১৯৭৩ সালে একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে বয়াতির গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই গান শুনেই বাংলাদেশ টেলিভিশনের তখনকার মহানির্দেশক মোস্তফা মনোয়ারকে ফোন করেন মুজিব। তার পর আবদুর রহমান বয়াতির জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন।
সারাজীবন সুর ও সংগীতের সাধনা নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া এই গুণীজন শেষ জীবনে এসে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। প্রায়ই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। একপর্যায়ে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। এই হাসপাতালে তিনি অনেক দিন চিকিৎসারত অবস্থায় ছিলেন।
২০১৩ সালের বয়াতি রোগে ভুগে মারা যান। জীবনের শেষ দিকটা খুব একটা ভাল কাটেনি। ছেলে আলম বয়াতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শেষ সময়ে তাঁর বাবা ওষুধ পর্যন্ত খেতে চাইতেন না। যেন কী এক অজানা অভিমানে তাঁর মনে টানাপোড়েন চলত। পরিবারের কাউকে সে কথা বলেননি। বুঝতেও দেননি। সাধকের বাউল মনে তখনও কোনও গান লেখা চলছিল কিনা কে জানে!