পড়াশোনা ও চাকরির পাট চুকিয়ে, নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর স্নেহস্পর্শ পাওয়ার পরে ছবি চলে আসেন পেশাদার নাট্যমঞ্চে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 July 2025 16:47
ছবির মতো সুন্দর দেখতে ছিলেন বলে মা তাঁকে ডাকতেন 'ছবি' বলে। সেই নামেই পরিচিত হন পরে।
তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা ছবি বিশ্বাস। আজ যাঁর জন্মদিন।
১৯০০ সালের ১৩ জুলাই উত্তর কলকাতার বাড়িতে ছবি বিশ্বাসের জন্ম হয়।
পড়াশোনা ও চাকরির পাট চুকিয়ে, নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর স্নেহস্পর্শ পাওয়ার পরে ছবি চলে আসেন পেশাদার নাট্যমঞ্চে। স্টার থিয়েটারে তখন একের পর এক হিট তাঁর সব নাটক। 'ধাত্রীপান্না', 'মীরকাশিম', 'সিরাজউদ্দৌল্লা', 'কেদার রায়' থেকে শুরু করে 'দেবদাস', 'শাহজাহান', 'কাশীনাথ'-- সমস্ত নাটকে প্রধান ভূমিকায় উঠে এলেন ছবি বিশ্বাস।
-1.jpg)
১৯৩৬ সালে 'অন্নপূর্ণার মন্দির' সিনেমায়, তিনকড়ি চক্রবর্তীর পরিচালনায় তাঁর প্রথম অভিনয়। এর পরে আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ বেশ হিট করে। ছবি বিশ্বাসও দর্শকদের নজর কাড়েন। এই ছবিটিই নরেশ মিত্র পরে রিমেক করলে ছবি বিশ্বাসের করা বিশু চরিত্রে অভিনয় করেন উত্তমকুমার। সঙ্গে সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী, অনুপ কুমার, শোভা সেন।
নায়ক থেকে ক্রমেই ছবি বিশ্বাস হয়ে উঠলেন সিনেমার আইকনিক জাঁদরেল পিতা থেকে স্নেহময় শ্বশুর পর্যন্ত। যখন উত্তমকুমার নায়ক তখনও ছবি বিশ্বাস পর্দায় থাকা মানে সে সিনেমার আভিজাত্যই বেড়ে যেত। এমনকি তখনও তাঁকে মুখ্য ভূমিকায় রেখে নায়ক চরিত্রে ছবি বিশ্বাসকে নিয়ে 'শশীবাবুর সংসার', 'দাদাঠাকুর'-এর মতো কালজয়ী ছবি হয়েছে। ছবি বিশ্বাসের পূর্বপুরুষরা ছিলেন বারাসতের জাগুলিয়ার জমিদার। জমিদারি ঘুচে গেলেও রক্তে থেকে গিয়েছিল আভিজাত্যের সেই অহংকার। সেটাই প্রতিফলিত হত চরিত্রে।

সত্যজিৎ রায় তাঁকে নিয়ে করেছিলেন 'জলসাঘর'। বিশ্বম্ভর রায় ছবি বিশ্বাসের নিজের জীবনেরই কথা যেন। এভাবেই একের পর এক ছবিতে মঞ্চ মাতাচ্ছিলেন ছবি। তার পরেই এল ১৯৬২ সালের এই তারিখটা, ১১ জুন। ছবি বিশ্বাস তখনও খ্যাতির মধ্যগগনে। সেদিন সপরিবারে নিজের গাড়ি করে রওনা দেন জাগুলিয়ার উদ্দেশে। সঙ্গে ছিল নাতি। এই প্রথম নয়, কলকাতা থেকে মাঝেমাঝেই গাড়ি নিয়ে নিজের সেই আদি বাড়িতে যেতেন ছবি বিশ্বাস।
১৯৬২-র ১১ জুন অ্যাম্বাসাডরে চেপে জাগুলিয়ার বাড়ি যাচ্ছিলেন ছবি। গাড়ি চালাচ্ছিল ড্রাইভার। কিন্তু কী হল ওঁর, হঠাৎই গাড়ি ড্রাইভ করার শখ হল নিজে। ড্রাইভ করতে ভালই জানতেন। কিন্তু ড্রাইভারই চালাত বেশিরভাগ। সেদিনের সেই ইচ্ছেই যেন ওঁর কাল হল।

দমদমের কাছে এসে উনি ড্রাইভারকে সরিয়ে নিজে অ্যাম্বাসাডর চালাতে লাগলেন। ভালই চলছিল গাড়ি। হঠাৎ বিকেল তিনটে নাগাদ, বারাসত পার হয়ে মধ্যমগ্রামের কাছে ওল্ড যশোর রোডে পৌঁছতেই, উল্টো দিক থেকে আসা ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা। পরে জানা গেছিল, ভ্যানগাড়িটির চাকা আচমকা খুলে যাওয়ায় সেটি ছিটকে এসে গাড়িতে ধাক্কা মারে। গাড়ির সকলে অলৌকিক ভাবে অক্ষত থেকে গেছিলেন, কেবল চালকের আসনের অংশটি তুবড়ে যায়। চালকের আসনে বসা ছবি বাবু স্পট ডেড।
আরজি কর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল ছবি বিশ্বাসের নিথর দেহ। রক্তাক্ত, দুমড়ে গেছে। জনতার ঢল নেমে পড়ল আরজি কর হাসপাতালে। মোটে ৬২ বছর বয়সে চলে গেলেন অভিনেতা। ওঁর নাতি-সহ বাকি পরিবার বেঁচে গিয়েছিলেন সেদিনের দুর্ঘটনায়।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুর পর মন্তব্য করেছিলেন,"ছবিদা চলে গেলেন। এ বার থেকে ব্যারিস্টারের চরিত্রগুলো কেটে মোক্তারের চরিত্র করতে হবে।" উত্তমকুমার বলেছিলেন, "ছবিদা নেই আমার আর ব্যারিস্টারের ছেলের অভিনয় করা হবে না।"
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় তখন জানিয়েছিলেন, 'দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও কোনও ময়না তদন্ত বা কাটাছেঁড়া হবে না ছবি বিশ্বাসের। তাঁকে সসম্মানে বিদায় দেওয়া হবে। কারন তিনি ছবি বিশ্বাস। বাংলা সিনেমার রাজা। রাজার মতোই যাবেন তিনি।'