
শেষ আপডেট: 8 March 2023 06:27
অথচ তখন কিন্তু অপর্ণা প্রথম সারির পরিচালক। মানসিক প্রতিবন্ধী এবং স্পেশাল চাইল্ড যে ছবি করার বিষয় হতে পারে তখনও টালিগঞ্জ পাড়া ভাবতে পারত না। শেষ অবধি প্রযোজক রাজেশ আগরওয়াল ও সুমিত আগরওয়াল রাজি হলেন ছবি করতে, তবে তাঁরা অপর্ণা সেনকে এক শর্ত দিলেন! যদি অপর্ণা সেন নিজে ছবিতে শাশুড়ি সনকার চরিত্রে অভিনয় করেন, তাহলেই তাঁরা অপর্ণার এই গল্পে ছবি করতে রাজি।
অপর্ণা সেন ততদিনে অভিনয় করা অনেক কমিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি নিজেকে ভেবে সনকা লেখেনওনি। অন্য কোনও অভিনেত্রীকে সনকার চরিত্রে নিতেন। কিন্তু প্রযোজকরা চাইল বক্সঅফিসে হিটমেশিন অপর্ণা সেনের ফেসভ্যালু ব্যবহার করতে। ছবিটা হওয়ার তাগিদে শেষ অবধি রাজি হন অপর্ণা সেন, সনকার ভূমিকায় অভিনয় করতে।
[caption id="attachment_2384788" align="aligncenter" width="170"]
সনকা সাজে ক্যামেরায় চোখ।[/caption]
তার পর তো ইতিহাস! যে মোহময়ী গ্ল্যামারাস অপর্ণা সেনকে দেখতে দর্শক অভ্যস্ত ছিল, তাঁর একেবারে ভিন্ন চেহারায় অপর্ণা নিজেকে গড়লেন সনকা রূপে। উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত বনেদী বাড়ির মধ্যবয়স্কা বউ। নিজের ঠোঁটের উপর জুড়লেন একটা আঁচিল আর সেই সঙ্গে একটা বিধস্ত লুক। যে সংসারে ক্লান্ত, পূর্ণবয়স্কা পাগল মেয়ের দায়িত্বে শ্রান্ত। যেন অনেক ঘরবন্দি গৃহবধূদের নিরুচ্চার না পাওয়া উঠে এল সনকার চরিত্রে।
'পারমিতার একদিন'-এ বারাসতের এক আত্মীয়ার চরিত্রে অপর্ণা কাস্ট করেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়কে। অনবদ্য করেছিলেন ছোট্ট রোলে সুমিত্রা। সত্তর আশির দশকে তো সুমিত্রা-অপর্ণা ছিল অমিতাভ বচ্চন-শশী কাপুর জুটির মতো হিট জুটি। প্রচুর সুপারহিট ছবি দু'জনের একসাথে। শোনা যায়, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় 'পারমিতার একদিন' করার পর বলেছিলেন, "আমার খুব ইচ্ছে ছিল সনকার চরিত্রটা করার, যদি রিনা দিত আমাকে!"
তবে পারমিতার সময়ে তা হল না। ঋতুপর্ণা ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কলটাইমে যদি না পৌঁছন, তাই অপর্ণা সেন নিজেই সোজা গাড়ি নিয়ে চলে আসতেন ঋতুপর্ণার বাড়ি। 'ঋতুমা' বলে ঋতুপর্ণাকে ডেকে একদম গাড়িতে তুলে নিয়ে স্টুডিওতে পৌঁছতেন অপর্ণা। ঋতুপর্ণার পারমিতা চরিত্রে লুকও একদম বদলে দিয়েছিলেন অপর্ণা সেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিবাহ করার পর যখন পারমিতা প্রথম শ্বশুরবাড়ি সনকার পারলৌকিক কাজে আসবে তখন উল্টে চুল আঁচড়ে খোঁপা, কার্বন ফ্রেমের চশমা আর বড় টিপে এক স্থিতধা ঋতুপর্ণাকে যেন আবিষ্কার করালেন অপর্ণা।
'পারমিতার একদিন' লেখার সময় সনকার বাল্যবন্ধু কিশোরীবেলার প্রেমিক মণিদার চরিত্রে সৌমিত্রর কথাই প্রথম মনে আসে অপর্ণার। মণিদার লাঠির ঠুকঠুক শব্দ যেন সনকার দমবন্ধ সংসারজীবনে এক মুঠো খোলা জানলা। সনকার ছেলে যাকে বলে 'ওই শ্যামের বাঁশি বেজে গেছে'।
সনকা-মণিদার ভালবাসা বাল্যপ্রেম, যা বিবাহের পরিণতি পায়নি। কিন্তু সনকার শ্বশুরবাড়িতে মণিদার যাতায়াত আছে। না, সে অর্থে আর কোনও প্রেম বা পরকীয়া নেই, কিন্তু বন্ধুত্ব, ভাললাগার রেশটুকু রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে অনেক না পাওয়ার জ্বালা। তাই সনকা বলে ওঠে, "তোমার সঙ্কোচের জন্য দু-দুটো জীবন নষ্ট হয়েছে মণিদা! ভুলে গেছো সে কথা?"
দুলাল লাহিড়ি তখন চলচ্চিত্র-সিরিয়ালে ভিলেন রূপে বড় নাম। কিন্তু তাঁর পরিচালিত একটি নাটক দেখতে এসেই অপর্ণা সেন সনকার স্বামীর চরিত্রে দুলালকে নেন।
রজতাভ দত্ত পারমিতার প্রথম স্বামীর চরিত্রে অনবদ্য, যাঁর ইন্ডাস্ট্রিতে আসা এই ছবি দিয়েই। সোহিনী সেনগুপ্ত অর্থাৎ 'খুকু', মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ের রোলে জিতে নেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার। সে বছর 'বাড়িওয়ালি'র জন্য সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং 'পারমিতার একদিন'-এর জন্য সোহিনী সেনগুপ্ত একসঙ্গে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার বিজয়িনী হন। বলিউডের বাঙালি অভিনেত্রী রিমি সেনের প্রথম বাংলা ছবিতে হাতেখড়ি 'পারমিতার একদিন'।
এমনকি 'দক্ষিণী'র অনামী গায়ক 'পারমিতার একদিন'-এ গান করেই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। তিনি হলেন শিল্পী প্রবুদ্ধ রাহা। আর গানটা হল 'বিপুল তরঙ্গ রে'। এই ছবিটা যেন এই স্বল্পশ্রুত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে রাতারাতি আইকনিক করে তুলল। অপর্ণা সেনের মেয়েবেলার বান্ধবী জয়শ্রী দাশগুপ্ত সেরা গায়িকার জাতীয় পুরস্কার পান খুকুর লিপে 'হৃদয় আমার প্রকাশ হল' গেয়ে। সেরা বাংলা ছবির জাতীয় পুরস্কারও পান অপর্ণা।
সনকার বড় মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রত্না সরকার। রত্নার অজান্তেই অপর্ণা তাঁর কণ্ঠ ডাব করান পাপিয়া সেনকে দিয়ে। ছবি দেখার পর নিজের কষ্টের কথা ফোন করে রত্না জানিয়েছিলেন অপর্ণাকে। অপর্ণা বলেছিলেন, রত্নার কণ্ঠ অনেক বেশি সফিস্টিকেটেড, একটু ঘরোয়া কণ্ঠ দরকার ছিল, তাই রত্নার নিজের গলার স্বর ছবিতে তিনি রাখেননি।
ঠিক তার গায়ে-গায়ে পরের সপ্তাহে মুক্তি পেল বলিউডের সেই আইকনিক ছবি, হৃতিক রোশন-আমিশা প্যাটেলের ডেবিউ ফিল্ম 'কহো না প্যায়ার হ্যায়'। কিন্তু বক্সঅফিস তোলপাড় করা সেই হিন্দি ছবির পাশেও স্তিমিত হল না 'পারমিতার একদিন'-এর ভিড়। বরং আরও বেশি হাউসফুল হতে লাগল এই বাংলা ছবি। আজকাল শোনা যায় হিন্দি ছবির দাপটে বাংলা ছবি হল পায় না। কিন্তু তখন একটা পারিবারিক আর্টছবিই কলকাতা-সহ মফস্বলের সমস্ত সিঙ্গেল স্ক্রিনে রমরম করে চলেছিল হিন্দি ছবির পাশেই। রিপিট শোয়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কোথায় গেল সেসব দিন!
শুধু তাই নয়, সে বছর এপ্রিল মাসে 'ইটিভি বাংলা' চ্যানেলের পথ চলাও শুরু হয়েছিল 'পারমিতার একদিন' ছবি দিয়েই। প্রথম দিন নববর্ষের দুপুরে 'পারমিতার একদিন' প্রিমিয়ার শো দেখিয়ে চ্যানেল শুরু হয়। তখনও ছবিটা হলে চলছে। যদিও ইটিভি বাংলা আজ লুপ্ত, কিন্তু তার শুরুর ইতিহাসে চিরকাল থেকে যাবে এই ছবি।
এই সখ্য বন্ধুত্ব পার করে একসময় সমপ্রেম ভালবাসারও জন্ম দেয়। চিরাচরিত শাশুড়ি-বৌমা কলহ যেন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় যখন একই স্নানঘরে এক সাথে স্নান করে সনকা-পারমিতা। সেই স্নাত দুই নারী তখন আর শাশুড়ি-বৌমা নয়, দুজন দুজনের সমব্যথী।
অপর্ণা সেন পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "স্নানঘরের দৃশ্য অনেকটা বেশি ছিল ছবিতে। সনকা যে চরিত্রটা, আমি করেছিলাম, তাঁর জীবনে প্রেম চরিতার্থ হল না। না স্বামীর কাছে না মণিময়ের কাছে। স্বামীকে সনকা কোনওদিনই ভালবাসতে পারেনি। আর মণিদা, সেও ছিল কাপুরুষ। সনকা বলেছিল, 'মণিদা একবার যদি বলত আমি স্বামী সংসার ফেলে চলে যেতাম। একবারও পিছু ফিরে তাকাতাম না।'
যে মহিলা এতটা সাহসি, যে মহিলা কবিতা একবার শুনে মুখস্থ বলতে পারতেন, তাঁর সেইসব রোম্যান্টিক দিকগুলো কোনওভাবেই পূর্ণতা পায়নি। তারপর তাঁর ছেলের বউ এল পারমিতা, যে তাকে বুঝল। এদের মিল এদের দুজনের সন্তানই মানসিক ভাবে চ্যালেঞ্জড। সনকার মেয়ে স্কিৎজোফ্রেনিক আর পারমিতার ছেলের সেরিব্রাল পালসি। ফলে দুজন দুজনের দুঃখের ভাগীদার হল।
https://youtu.be/NH2esyM1c-Y
আমি সমপ্রেম দেখাব বলে আলাদা করে ভাবিনি, কিন্তু লেসিবিয়ানিজমের বর্ডার লাইন ভেবেই স্নানদৃশ্যটা দেখাই। সমকামিতার স্পর্শ কিছুটা হলেও ছিল, অস্বীকার করার জায়গা নেই। সেটা সনকার দিক থেকে মনে হয়েছিল খুব স্বাভাবিক। কিন্তু পারমিতার দিক থেকে সে অর্থে সেটা ছিল না পরের দিকে। পারমিতা দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে সুস্থ জীবন পেয়েছিল। সনকা-পারমিতার স্নানদৃশ্য আরেকটু দীর্ঘ ছিল ছবিতে। কিন্তু পরে এডিটিংয়ে সেটা আমি কেটে দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল সেটার প্রয়োজন নেই।"