
অঞ্জন দত্ত
শেষ আপডেট: 25 December 2024 12:27
শীতের সকাল। ৪০ বেনিয়াপুকুর লেনের বাসিন্দার হাতে তখন ছিল ‘পুরনো গিটার’। বছর সত্তরের অঞ্জন দত্তর কাছে আস্তে-আস্তে বদলে যাচ্ছে ছোটবেলার শহর। নাম বদলে যাওয়া রাস্তাঘাটের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছেন না আর। ‘দ্য ওয়াল’-এর ক্যামেরার সামনে যখন তাঁর জমে থাকা কথা ব্যক্ত হচ্ছে সময়ে-সময়ে, ঠিক তখনই প্রসঙ্গে উঠে এল প্রায় ২৫ বছর আগে এক ছবি। অঞ্জন দত্তর (Anjan Dutta, Anjan Dutta Interview) প্রথম ছবি। প্রথম হিন্দি ছবি। ‘বড়াদিন’ (Badadin)।
ছবিতে যাঁরা অভিনয় করেছেন, তাঁদের নাম জানলে চমকে যেতে পারেন, আবার না চিনলে গুগল করে নেবেন ঠিকই। শাবানা আজমি, ইরফান খান, মার্ক রবিনসন, তারা দেশপান্ডে প্রমুখ।
আদ্যপান্ত বাঙালি এক মানুষ হঠাৎ কেন হিন্দি ছবি করতে গেলেন? আবার এও শোনা গিয়েছিল, ছবি তৈরির মাঝপথে সব ছেড়েটেরে দিয়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন পরিচালক। চোখে কালো সানগ্লাস আর তেরচা রোদ এসে পড়ছে কপালে, হাতে সিগারেট থেকে গোল্লা পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। এক লম্বা টান দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অঞ্জন বললেন,
‘১৯৯৬ সালে সিনেমাটি শুরু হয়। রিলিজ করতে-করতে ওই ৯৮। আমি আমার শহরটাকে ক্যালকাটা বলেই চিনি। কারণ কলকাতা বললে একটা অন্য ইমেজ মাথায় আসে। আমার ক্যালকাটা ছিল বহুভাষিক, বিস্মৃত। শুধু হিন্দু বাঙালিদের শহর নয়। আমি যে পাড়াতে থাকি, সেখান থেকে আর্মিনিয়ানরা চলে গেছে, পার্সিরা চলে গেছে, অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা কমে গেছে, দু-তিনটে গোয়ান এখনও অবশ্য রয়েছে, বেশিরভাগই আজ মুসলিম, আর আছে কিছু হিন্দু পরিবার। আমার ক্যালকাটায় ওঁরা সবাই থাকতেন। তাই আমার পরিচিত শহরটাতে, আমি ছবি বানাই, গান গাই কিংবা লিখি, সেটা যে কোনও ভাষায় সম্ভব ছিল। মূলত বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি।’
অঞ্জন দত্তর কথায় কলকাতায় থেকে যে কোনও ভাষায় কাজ করা যায়, এই সাহস জুগিয়েছিলেন দুই নারী। ঊষা উত্থুপ এবং অপর্ণা সেন।
‘ঊষা উত্থুপ ছিলেন সর্বভারতীয় পপস্টার। যিনি কলকাতায় থেকে ভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন। আর অপর্ণা সেন। তাঁর প্রথম ছবি ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ একটি ইংরেজি ছবি। ও আমার কাছে অনুপ্রেরণা ছিল। তখন আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল আমি কলকাতায় থেকে ইংরেজি ছবিই করব,’ বললেন অঞ্জন।
১৯৯৬ সাল। আদ্যপান্ত একটি ইংরেজি ছবির গল্প লিখলেন অঞ্জন দত্ত। গ্রামাফোন কোম্পানির সঙ্গে, যোগাযোগ করেন।
‘ছবিটার নাম ছিল ‘বড়াদিন’। ইংরেজি ছবি। ছবিটার বেশি বাজেটও ছিল না। ওরা রাজি হল না। বলল ইংরেজি নয়, হিন্দিতে হবে। হিন্দি করায় অনেক কিছু বদলে গেল, জমছিল না।’ আক্ষেপের সুর অঞ্জন দত্তর গলায়।
এই ‘জমছিল’ না যখন বুঝতে পারলেন অঞ্জন দত্ত, ঠিক তখন হাল ছাড়বেন বলে মনোস্থিরও করেন তিনি। ‘কর্পোরেট প্রেসার, তার উপর গুচ্ছের গান ঢোকানো হল। যা আমি চাইনি। দার্জিলিংয়ে নাচের একটা সিকোয়েন্স শুট হল, কেন তা আমি আজও জানি না। পপুলার হিন্দি ফিল্মের মিউজিক যারা করেন, তাঁরা এলেন যতীন-ললিত। কোরিওগ্রাফি করলেন ফারাহ খান। জাভেদ আখতার গানের কথা লিখলেন। বড়-বড় মানুষ জড়িয়ে গেলেন। একটু বেশিই জড়িয়ে যাচ্ছিল মানুষ। আমি চেয়েছিলাম ছবিটা একটু অন্য রকম করতে। পপুলিস্ট এবং কমার্শিয়ালের মিডওয়ে। আর আমাকে ঠেলা হচ্ছিল পুরোপুরি কমার্শিয়ালের দিকে। বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। তখন জাভেদ আখতার বলেছিলেন ‘এটা করো না, সবাই জানবে তুমিই ছবিটা করছো না। তোমার প্রথম ছবির ক্ষেত্রে, এটা ভাল দেখাবে না। ওঁর কথা শুনেই থেকে গেলাম। ছবিটা যথারীতি ফেল করল!
‘বড়াদিন’ শুধু ফেল করেনি ‘ডাহা’ ফেল করেছিল! ছবির দু-একটা গান ছাড়া বাকি সবই মুখ থুবড়ে পড়েছিল। গুগুলে ছবিটার নাম লিখে খোঁজ নিলে, দেখাচ্ছে বড় ‘ডিজ্যাজটার’! এমন ‘দুর্যোগ’-এর ছবির জন্য অনেকের অনেক কথা ‘মুখ বুজে সয়েছে, অন্যায় কত অপবাদ’। ঠিক তেমনই এই ‘বড়াদিন’ ছবিটি না হলে কোনওদিনই ‘বো বারাক ফরএভার’ এভারগ্রিন হয়ে বাঙালির সিনেমনে থেকে যেত না!
‘সাত-আট বছরের অপেক্ষা করি। ভেবেছিলাম যতদিন এমন প্রযোজক পাব না, যে বিশ্বাস করবে, আমায়, ততোদিন ছবি বানাব না। হিন্দি-ইংলিশেই ছবি করব। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের নিয়েই ছবি করব।’ থামলেন না অঞ্জন।
‘২০০০ সালে আমার এক আর্কিটেক্ট বন্ধু এল, ও পুরনো বাড়িটারি রেস্টোরেশন করত। আমায় বলল আমি বো বারাক-এ ক্রিস্টমাসে তোমার ‘বড়াদিন’ দেখাতে চাই। ও নাকি আর অন্য কোনও ছবি খুঁজে পাচ্ছে না। আমার মনে আছে, সেই সময়ে সিনেমার ক্যান এইচএমভি থেকে নিয়ে গিয়ে ওখানে প্রোজেক্টর লাগিয়ে দেখানো হয়। সেই প্রথম আমি বো বারাক যাই। কালারফুল। ইংরেজি গান হচ্ছে। মিউজিক যাচ্ছে। কেউ নাচছে। আমি তখন জায়গাটায়গা ঘুরে দেখি, এক্সপ্লোর করি। ‘বড়াদিন’ আমায় বো বারাকে নিয়ে এল। আমি ঠিক করি বো বারাক নিয়েই ছবি করব। এটা ভাল ছিল, ফ্লপ ছবিটা না করলে বোধহয় ‘বো বারাক ফরএভার’ হত না।’