
খানকা রহমানির পড়ুয়ারা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে চলেছে।
শেষ আপডেট: 9 April 2024 17:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯০১ সালে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হজরত মৌলানা মহম্মদ আলি মুঙ্গেরি। লক্ষ্য ছিল সমাজ সংস্কার, শিক্ষার আলোকে ছড়িয়ে দেওয়া ও আত্মার বিশুদ্ধিকরণ। মৌলানার আদর্শ ছিলেন তাঁর পথপ্রদর্শক, শেখ হজরত মৌলানা ফজল-এ-রহমান গঞ্জ মোরাদাবাদি। তাঁর আদেশেই কানপুর ছেড়ে মৌলানা আলি মুঙ্গেরি এসেছিলেন বিহারের মুঙ্গেরে, তৈরি করেছিলেন 'খানকা রহমানি'। ফারসি ভাষায় 'খানকা' শব্দের অর্থ সুফি মতাদর্শীদের জমায়েত ও উপাসনাস্থল। আজ একশো বছর পার করে আজও মুঙ্গেরের এই খানকা রহমানি পথ দেখাচ্ছে অজস্র ছাত্রছাত্রীদের।
মহম্মদ সালাউদ্দিনের বয়স ৬৪। গত ৩২ বছর ধরে তিনি এই খানকা রহমানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। নিজে লেখাপড়া শেখেননি। কিন্তু তাঁর দুই পুত্রই সুপ্রতিষ্ঠিত। মহম্মদ নাজমুদ্দিন যেমন। স্নাতক হয়েছেন মুঙ্গের থেকে, মাস্টার্স করেছেন মেরঠের চৌধুরী চরণ সিংহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, হরিয়ানা থেকে করেছেন বিএড, পরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে মাস-কমিউনিকেশন নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। পাশাপাশি, শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা পাশ করেছেন, এই মুহূর্তে মুঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন মহম্মদ মুদাসসর ওসমানি, মহম্মদ হাসান ও আকবর। প্রত্যেকেই স্নাতক ও শিক্ষক শিক্ষণে প্রশিক্ষিত এবং বিহারের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের শিক্ষক হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তাঁরা সকলেই এই খানকায় 'হাফফাজ' হিসেবে রয়েছেন।
নাজমুদ্দিনের ভাই, সালাউদ্দিনের অপর পুত্র সাহাবুদ্দিনও এই মুহূর্তে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর দ্য প্রোমোশন অফ উর্দু ল্যাঙ্গোয়েজে আধিকারিক। তিনিও জামিয়া মিলিয়া, হায়দরাবাদ ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথাক্রমে বিএ, এমএ ও এমফিল পাঠ শেষ করেছেন, পাশাপাশি সর্বভারতীয় নেট পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছেন।
তাঁদের সকলেরই পড়াশোনার শুরু এই খানকায়, তার অন্তর্গত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'জামিয়া রহমানি'-তে।
১৯২৭ সালে খানকার প্রতিষ্ঠাতাদের সেবা সংগঠন 'রহমানি ফাউন্ডেশন'-এর অর্থানুকূল্যে পথ চলা শুরু এই জামিয়া রহমানির। শুধু কোরান-শরীফ মুখস্ত করা নয়, বরং সঠিকভাবে আরবি ভাষা অধ্যয়ন করার দিকে জোর দেওয়া হত শুরু থেকেই। এখন এখানে তার পাশাপাশি পড়ানো হয় ইংরেজি, বিজ্ঞান ও অঙ্ক। রীতিমতো অত্যাধুনিক 'ট্যাবলেট' দেওয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের। নেওয়া হয় 'স্মার্ট ক্লাস'।
এতেই শেষ নয়। খানকার তরফে নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে এক নতুন ব্যাচ, 'রহমানি৩০'। এই ব্যাচের লক্ষ্য বিশেষ ভাবে আগ্রহী ছাত্রছাত্রীদের জয়েন্ট এন্ট্রান্স (মেন) এবং আইআইটির প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা। দেশের একাধিক রাজ্যে তৈরি করা হয়েছে এর শাখা। রয়েছে মেডিক্যাল প্রবেশিকা ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পরীক্ষার জন্য আলাদা প্রবেশিকাও। খানকার তরফে রয়েছে আবাসিক ছাত্রছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা। মোট ১২০০ পড়ুয়ার জন্য তিনবেলা নিয়মিত তৈরি হয় খাবার। আর এর সবটাই হয় কার্যত নিখরচায়। পাশাপাশি, দরিদ্র্য, দুঃস্থ পড়ুয়াদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সাফল্যও মিলেছে এতে। প্রতিষ্ঠানের কর্তা জানিয়েছেন, রহমানি৩০ শুরুর পর থেকে ৫১৩ জন পড়ুয়া দেশের বিভিন্ন আইআইটিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। ৮৩৮ জন জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে বিভিন্ন এনআইটিতে ভর্তি হয়েছেন। অনেকে অলিম্পিয়াডেও অংশ নিয়েছেন।
বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব এসেছেন এখানে। স্বাধীনতার আগে এই খানকায় এসেছেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, পরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। এসেছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম। শিক্ষার এই ঐতিহ্যকেই প্রচারের আড়ালে নিঃসাড়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছে মুঙ্গেরের এই প্রতিষ্ঠান।