একসময় ক্রিকেটে ড্র স্বাভাবিক ছিল। এখন ফল চাই। টিভি সম্প্রচার, দর্শক, বাণিজ্য—সব মিলিয়ে খেলা হয়েছে দ্রুত, তীক্ষ্ণ, নাটকীয়। ডবল সুপার ওভার সেই বিবর্তনেরই অনিবার্য ফলশ্রুতি।

বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকা
শেষ আপডেট: 11 February 2026 16:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে (Narendra Modi Stadium) টি-২০ বিশ্বকাপের (T20 World Cup 2026) গ্রুপ ডি ম্যাচে বুধবার যা হল, তা ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল। দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa) বনাম আফগানিস্তান (Afghanistan)—কুড়ি-কুড়ি মিলিয়ে চল্লিশ ওভারেও মীমাংসা হয়নি। স্কোর সমান… ১৮৭। এরপর সুপার ওভার। কিন্তু তাতেও ফল বেরোল না। শেষমেশ জোড়া সুপার ওভারের নাটক শেষে লড়াই জিতে নিল প্রোটিয়ারা।
কুইন্টন ডি কক (Quinton de Kock) ও রায়ান রিকেলটনের (Ryan Rickelton) অর্ধশতরানের উপর ভর করে দক্ষিণ আফ্রিকার ১৮৭/৬। জবাবে রহমানউল্লাহ গুরবাজের (Rahmanullah Gurbaz) ৪২ বলে ৮৪ রানের বিধ্বংসী ইনিংস আফগানিস্তানকে ম্যাচে রাখে। এরপর সুপার ওভার… তারপর আরেকটি। ক্রিকেট যেন রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার!
কিন্তু কীভাবে বাইশ গজের যুদ্ধে এল ডবল সুপার ওভার? কেন চালু নিয়ম বদলাতে হল? এর কৌশলগত গুরুত্বই বা কতটা?
বাউন্ডারি কাউন্টের মৃত্যু, নতুন যুগের শুরু
ডবল সুপার ওভারের সূত্রপাত খুঁজতে গেলে ফিরতে হয় ২০১৯ সালে। লর্ডসে আইসিসি বিশ্বকাপ ফাইনাল (ICC World Cup 2019 Final)। ইংল্যান্ড (England) বনাম নিউজিল্যান্ড (New Zealand)। ম্যাচ টাই। সুপার ওভারও টাই। তারপর? বাউন্ডারি কাউন্টে ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন। এই নিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল বিতর্ক। ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন—ফাইনালের ফল কি সত্যিই বাউন্ডারি গুনে ঠিক হবে? ব্যাট-বলের লড়াইয়ের বদলে অঙ্কের হিসেব ভাগ্য গড়ে দেবে?
চাপের মুখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) নিয়ম বদলায়। সিদ্ধান্ত হয়—সুপার ওভার টাই হলে আবার সুপার ওভার হবে। যতক্ষণ না স্পষ্ট বিজয়ী পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ খেলা চলবে। এই সংশোধনই ক্রিকেটকে নিয়ে যায় ‘ডবল সুপার ওভার’ যুগে।
আইপিএল থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ: উত্তেজনার বিস্ফোরণ
২০২০ সালে আইপিএলে (IPL 2020) প্রথমবার দেখা মিলেছিল ডবল সুপার ওভারের। সে এক নাটক বটে! মুম্বই ইন্ডিয়ান্স (Mumbai Indians) বনাম কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব (Kings XI Punjab)। ১৭৬ রানে টাই। প্রথম সুপার ওভারেও সমতা। দু’নম্বর সুপার ওভারে লেখা হল অন্তিম ফল, জানা গেল বিজয়ীর নাম।
এই ম্যাচ বুঝিয়ে দিয়েছিল—ডবল সুপার ওভার শুধু রোমাঞ্চ নয়, কৌশলের পরীক্ষাও। একবার ব্যবহার করা বোলার দ্বিতীয় সুপার ওভারে বল করতে পারেন না। যে ব্যাটার প্রথম সুপার ওভারে আউট হন, তাঁর দ্বিতীয়টিতে নামা বারণ। অর্থাৎ ‘প্ল্যান বি’ না থাকলে সমূহ বিপদ।
২০২৪ সালে বেঙ্গালুরুতে ভারত (India) বনাম আফগানিস্তান (Afghanistan) টি-২০ ম্যাচেও ডবল সুপার ওভারের টানটান উত্তেজনা। রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) প্রায় তিন ঘণ্টা ব্যাট করার পর দ্বিতীয় সুপার ওভারে দু’টি ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করেন। স্পষ্ট হয়ে যায়—এ শুধু দক্ষতার লড়াই নয়, সমানভাবে সহনশীলতার পরীক্ষা।
গত বছর নেপাল (Nepal) বনাম নেদারল্যান্ডস (Netherlands) ম্যাচে দর্শকরা উপভোগ করেছেন ডবল নয়… ট্রিপল সুপার ওভার। এটাও নিয়মসিদ্ধ। কারণ আইন মোতাবেক—বিজয়ী না পাওয়া পর্যন্ত খেলা চলবে।
কৌশল, স্নায়ু ও ভবিষ্যতের ক্রিকেট
ডবল সুপার ওভার ক্রিকেটকে দাবার মতো কৌশলী করে তুলেছে। অধিনায়ককে ভাবতে হয়—প্রথম সুপার ওভারে সেরা ডেথ বোলারকে ব্যবহার করবেন, না রেখে দেবেন সম্ভাব্য দ্বিতীয়টির জন্য? ব্যাটিং অর্ডার সাজাবেন কীভাবে? আজকের দক্ষিণ আফ্রিকা-আফগানিস্তান ম্যাচে সেটাই দেখা গেল। প্রথম সুপার ওভারের চাপ কাটিয়ে দ্বিতীয়টিতে স্নায়ু ধরে রাখার লড়াই। অন্তিম বলে ফল নির্ধারণ—বাইশ গজ নয়, এ যেন গ্ল্যাডিয়েটরের রক্তাক্ত ময়দান!
একসময় ক্রিকেটে ড্র স্বাভাবিক ছিল। এখন ফল চাই। টিভি সম্প্রচার, দর্শক, বাণিজ্য—সব মিলিয়ে খেলা হয়েছে দ্রুত, তীক্ষ্ণ, নাটকীয়। ডবল সুপার ওভার সেই বিবর্তনেরই অনিবার্য ফলশ্রুতি।