দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেরুদণ্ডে চোট, পাঁজরের হাড়ে চিড়, পাক সেনার কব্জায় ৬০ ঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সয়েও বায়ুসেনার এই সাহসী কম্যান্ডার যে নিজের কর্মে ও কর্তব্যে অবিচল, তার প্রমাণ মিলেছিল তাঁর দেশের ফেরার পরই। ‘হিরো’র মতো কোনও উৎসব বা বাড়িতি উদ্দীপনায় যোগ দেননি, সেনা হাসপাতালে চিকিৎসা সেরেই সটান যোগ দিয়েছিলেন শ্রীনগরের বায়ুসেনার স্কোয়াড্রনে। ককপিটের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে কত তীব্র সেটা একবাক্যেই স্বীকার করেছেন বায়ুসেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। দেশবাসীকে এই সুখবর জানাতে বায়ুসেনার তরফে ঘোষণা করা হয়েছে, খুব শীঘ্রই ককপিটে ফিরতে চলেছেন বায়ুনের উইং কম্যান্ডার অভিনন্দন বর্তমান। তাঁর নতুন পোস্টিংয়ের জায়গা ও দিনক্ষণও একদম পাকা।
শ্রীনগর স্কোয়াড্রন থেকে অভিনন্দন যোগ দিতে যাবেন তাঁর নতুন কর্মক্ষেত্রে। গোপনীয়তা ও সুরক্ষার খাতিরেই সেই জায়গার নাম প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবে বায়ুসেনা সূত্রে খবর, ওয়েস্টার্ন সেক্টর অর্থাৎ পাক সীমান্ত লাগোয়া এলাকার এয়ার বেসেই তাঁকে পাঠানো হতে পারে। দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পাক সীমান্তের এই এয়ার বেসের গুরুত্ব রয়েছে এবং ৩৫ বছরের এই সাহসী কম্যান্ডার সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করতে পারবেন বলে মত বায়ুসেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সিআরপি কনভয়ে পাক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ হামলা চালানোর পর নতুন করে ভারত-পাক দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে। পুলওয়ামার জবাবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাক অধিকৃত কাশ্মীর এবং বালাকোটে ঢুকে বোমা বর্ষণ করে ভারতীয় বায়ুসেনা। তার পর দিন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আক্রমণ করতে আসে পাক বায়ুসেনার এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। তাদের তাড়া করে পাক আকাশসীমার ৭-৮ কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে পড়েন উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান। আকাশযুদ্ধে পাক এফ-১৬ গুলি করে নামিয়ে ফিরে আসার সময়েই বিপত্তি বাঁধে। মিগ বাইসন জেট ভেঙে পড়ার আগেই ইজেক্ট করে ককপিট থেকে বের হন তিনি, যার ফলে তাঁর কোমরে, মেরুদণ্ডে ভয়ানক চোট লাগে। পরে পাক বাসিন্দাদের কাছে শারীরিক হেনস্থা সহ্য করে, পাক সেনাদের অত্যাচার সয়েও বীর সৈনিকের মতো মাথা উঁচু করে দেশে ফেরেন তিনি।
অভিনন্দনের সঙ্গে কথা বলে বায়ুসেনা কর্তারা জানতে পারেন, পাকিস্তানি সেনার হাতে ধরা পড়ার পরে তাঁকে প্রথম ২৪ ঘণ্টা ঘুমোতে দেওয়া হয়নি। চড়া আলো, তার সঙ্গে জোরে গানবাজনা চালিয়ে রেখে তাঁকে জাগিয়ে রাখা হয়েছিল। বায়ুসেনার কর্তাদের মতে, এর একটাই উদ্দেশ্য ছিল। অভিনন্দনকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে দুর্বল করে দিয়ে তাঁর পেট থেকে কথা বার করা, যার কোনটাই সফল হয়নি।
দিল্লির এয়ার ফোর্স সেন্ট্রাল মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন থাকার সময়েই ফের নিজের দায়িত্বে ফেরার আর্জি জানিয়েছিলেন অভিনন্দন। তাঁর সাহস ও পেশাদারিত্ব দেখে বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল বি এস ধানোয়া জানিয়েছিলেন শারীরিক ও মানসিক ভাবে সামান্য সুস্থ হলেই তাঁকে ককপিটে বসার ছাড়পত্র দেওয়া হবে। এয়ার মার্শাল এবং প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল মেডিক্যাল সার্ভিসেস পবন কুমারের কথায়, “যুদ্ধবিমান থেকে ইজেক্ট করে বেরনোর সময় পাইলটের মেরুদণ্ডে ও পাঁজরে যে চাপ পড়ে সেটা কাটিয়ে উঠতে প্রায় ১২ সপ্তাহ সময় লেগে যায়। তার উপর পাক সেনাদের হাতে বন্দি থাকার সময় অভিনন্দনকে চূড়ান্ত মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। সেই ধকল কাটিয়ে ওঠাটাও দরকার ছিল। কিন্তু, তাঁর বীরত্ব ও সাহস দেখে মনে হচ্ছে অবিলম্বেই তাঁকে দায়িত্বে ফেরানো উচিত।” শ্রীনগর এয়ার বেসের ৫১ স্কোয়াড্রন থেকে নিজের নতুন পোস্টিংয়ে দ্রুতই ফিরবেন অভিনন্দন বলে জানিয়েছেন তিনি।