
গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন।
শেষ আপডেট: 24 December 2024 19:33
সুমন বটব্যাল
বন্যেরা বনে সুন্দর। সেই বন্য জন্তুকে বাগে আনতে শেষ কবে এমন রাজকীয় আয়োজন করেছে বন দফতর? জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা তো বটেই, মনে করতে পারছেন না দফতরের দুঁদে কর্তারাও।
রবিবার, শুরুর দিকে শুধু হৃষ্টপুষ্ট ছাগল রাখা হচ্ছিল। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বুনো মহিষ, শুয়োর! বাঘিনি জিনাতকে খাঁচাবন্দি করতে মরিয়া বন দফতর মঙ্গলবার থেকে বান্দোয়ানের রাইকা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ব্রেকফাস্টেও ডিনারের থালি সাজিয়ে রাখছে!
৭২ ঘণ্টা পার। তবু টোপে পা না দিয়ে পদে পদে যেন বন দফতরকেই বিদ্রুপ করছে জিনাত! কিন্তু কেন? কেন বারে বারে বন দফতরের ফাঁদ ব্যর্থ হচ্ছে? এটা কি শুধুই কাকতালীয়? নাহ্, বনকর্তাদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এ প্রসঙ্গে দলছুট হাতির 'রেফারেন্স' টেনে আনছেন তাঁরা।
ফি-বারই জঙ্গলমহলে আসে হাতির দল। পথ ভুলে কোনও দাঁতাল বা হাতি মানুষের সঙ্গে সংস্পর্শে চলে এলে তাকে আর দলে ফিরিয়ে নেয় না দলটি। এক বনকর্তার কথায়, "হাতিরও নিজস্ব নিয়ম নীতি রয়েছে। কোনও হাতির গায়ে মানুষের স্মেল বা গন্ধ লেগে গেলে তাকে আর দলে নেওয়া হয় না, এটাই ওদের অভ্যন্তরীণ রীতি।"
পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার জঙ্গলে এমন অনেক দলছুট হাতি দেখা যায়। বন দফতরের পরিভাষায়, এই হাতিগুলিকে 'রেসিডেন্সিয়াল' বলা হয়।
বন কর্তাদের অনুমান, হাতির মতো মানুষের 'স্মেল' বাঘ-বাঘিনির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। খাঁচাতে যে ছাগল, মোষ বা শুয়োর রাখা হচ্ছে, সেগুলির প্রতিটির সঙ্গেই মানুষের গায়ের গন্ধ লেগে রয়েছে। কারণ, কেউ না কেউ তো সেগুলিকে ধরে খাঁচায় ভরেছে। এক্ষেত্রে অনেক দূর থেকে সেই গন্ধ পেয়ে গিয়ে সম্ভবত, বাঘিনি জিনাত খাঁচায় বন্দি পশুর ধারেকাছেও আসছে না।
অগত্যা, কোন পথে বাঘিনিকে আয়ত্তে আনা যায় তা নিয়ে এদিনও দফায় দফায় বৈঠক করছেন বন দফতরের দক্ষিণ-পশ্চিম চক্রের মুখ্য বনপাল বিদ্যুৎ সরকার, পুরুলিয়ার ডিএফও অঞ্জন গুহ, কংসাবতী দক্ষিণ বনবিভাগের ডিএফও পূরবী মাহাতো এবং সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের একাধিক আধিকারিকরা।
জানা যাচ্ছে, সোমবার রাতের মতো মঙ্গলবার রাতেও বান্দোয়ানের রাইকা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় বাঘিনির জন্য রাজকীয় ডিনারের আয়োজন রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতেও খাঁচার মধ্যে ঘুম পাড়ানি বন্দুক তাক করে বসে থাকবেন কয়েকজন বনকর্মী। একই সঙ্গে জিনাতের খোঁজ পেতে এদিন বিকেল থেকে বন দফতরের 'পরামর্শে' জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় লাঠি, বাঁশ নিয়ে টহলদারিও শুরু করেছেন রাইকা পাহাড় সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা।
লাঠি, বাঁশ কেন? বছর পাঁচেক আগে তো এভাবেই গণপিটুনিতে লালগড়ের জঙ্গলে একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল। বনকর্তারা বলছেন, বণ্যপ্রাণ রক্ষার ক্ষেত্রে পুরুলিয়ার বাসিন্দারা খুবই ওয়াকিবহাল। ফলে সেই ঝুঁকির সম্ভাবনা নেই। মূলত, বাঘিনিকে ভয় দেখানোর জন্যই লাঠি, বাঁশ নিয়ে গ্রামবাসীদের 'পাহারা'র পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাতে যদি ভয় পেয়ে আড়াল থেকে জনসমক্ষে আসে জিনাত। মুহূর্তে ছুটে যাবে ঘুম পাড়ানি গুলি!
আর সেই 'আশা'তেই পাহাড়ে-জঙ্গলে আরও একটা শীতের রাত জাগছেন বনকর্তারা। গ্রামবাসীরাও।