
শেষ আপডেট: 6 July 2023 11:32
এ মাসে শুরু হতে যাওয়া সংসদের বাদল অধিবেশনে পেশ করা হতে পারে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংক্রান্ত বিলটি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রক ও আইন কমিশনের মতামত জানতে চেয়ে সংসদীয় কমিটির তরফে একটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে খবর। সকলেই জানেন, এক দেশ এক আইন আরএসএসের পুরনো দাবি।
বিজেপি-র নির্বাচনী ইস্তাহারে ছিল কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার। সেটা তারা করেছে। রামমন্দির নির্মাণ প্রায় শেষ। বাকি আছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। দেওয়ানী বিধি কার্যকর হলে বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তান দত্তক নেওয়া, সম্পত্তি ভাগের মতো সকল নাগরিকদের জন্য অভিন্ন নিয়ম থাকবে। কোন কোন অংশে নতুন আইন তৈরি হবে সেই বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব এখনও জনসম্মুখে আসেনি।
ভারত হিন্দু-মুসলমান-জৈন-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-পার্সিদের নিয়ে এক বহুত্ববাদী দেশ। বিভিন্ন ধরনের আচার, অনুষ্ঠান, নিয়ম নীতিতে অভ্যস্থ জনজাতি গোষ্ঠীগুলি। বহু বছরের চলিত প্রথা ও কুসংস্কারকে দূর করতে হলে চেতনার মাধ্যমে মনের অন্ধকার দূর করা অত্যস্ত জরুরি।
মুসলিম সম্প্রদায়ে তালাকের মতো কুপ্রথার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে ১৯৮৬ সালে সাহ বানু মামলা, পরবর্তীতে শায়রাবানু সহ অসংখ্য নারীকে আদালতে মামলা করতে হয়েছিল ন্যায় বিচার চেয়ে। সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট জনগণের মত চেয়ে বিবেচনার জন্য আবেদন করে দেশবাসীর কাছে। এর ফলে সংবাদ মাধ্যম ও বিভিন্ন মত বিনিময়ে তালাক প্রথার বিরুদ্ধে নৈতিক সমর্থন বেড়ে যায়। ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাক নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৯-এর ৩১ জুলাই তিন তালাক বে-আইনি এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এক্ষেত্রে সাফল্য দেশ জুড়ে প্রচারিত হলেও বাস্তব চিত্র কিন্তু ভিন্ন।
অমানবিক তিন তালাকের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে আন্দোলনের ফলে তাৎক্ষণিক তিন তালাক ভারত সরকার নিষিদ্ধ করলেও তালাক প্রথা কিন্তু বন্ধ করেনি। শুধু তালাক-ই-বিদ্ধত অর্থাৎ তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধ হয়েছে।
এখনও পারিবারিক আইন অনুসারে নিয়ম হল, স্ত্রীর সম্পর্কে অভিযোগ নিয়ে আদালত থেকে তালাকনামায় তিন মাসে তিনবার স্ত্রীর কাছে পাঠালে এবং সে গ্রহণ করলে তালাক হয়ে যায়। তালাক দেওয়ার জন্য আদালতে মামলাও দায়ের করতে হয় না। অতি সহজ পদ্ধতি প্রচারে আইন তো হল। মেয়েরা নিরাপদ হল কি? প্রশ্ন তো
থেকেই যায়।
চটজলদি বিল পাশ ও আইন তৈরির আগে ভারতবর্ষের মতো গুরুবাদী দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। ধর্ম ব্যক্তিগত। সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করা উচিৎ।
জনজাতিদের মধ্যে সংস্কার ছিল কাউকে মালা পরালেই মালা বদল অর্থাৎ বিয়ের প্রতীক। ১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে মঞ্চে মালা পরানোর অপরাধে আদিবাসী বুধনি মেজেনকে সাঁওতাল সমাজ বহিষ্কার করেছিল। আসলে সমাজ সংস্কার আন্দোলন ছাড়া শুধুমাত্র আইন দিয়ে কি অশিক্ষিত মানুষদের কূপ্রথা বন্ধ করা সম্ভব? বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। তারপরও বাল্য বিয়ে চলছে কেন? চেতনা ও শিক্ষার অভাবে। একদিন রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে ও বিদ্যাসাগর মহাশয়কে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ ও বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য সমাজে তুফান তুলতে হয়েছিল। এক্ষেত্রে সামাজিক সংস্কার আন্দোলনেই সফলতা আসে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে হলে হিন্দু, মুসলিম-সহ বিভিন্ন ধর্মের ক্ষতিকারক বিধানগুলি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা দরকার। সেগুলি জনসম্মুখে আসা দরকার। আদিবাসী সমাজ এখনও চলে ঐতিহ্য ও প্রথার ভিত্তিতে। ছোটনাগপুরে প্রজাস্বত্ব আইন, সাঁওতাল পরগনার প্রজাস্বত্ত্ব আইন, ঝাড়খণ্ডে জমি সংক্রান্ত আদিবাসীদের বিশেষ
অধিকার তারা পাবে কি এই বিলে?
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের কুফলে লক্ষ লক্ষ নারীর জীবনে এখনও নেমে আসে অন্ধকার। অশিক্ষিত ও মর্যাদাহীন জীবন। এক্ষেত্রে চাই সরকারি আইনি সুরক্ষা। তাই নিষিদ্ধ করা দরকার মুখ তালাক প্রথা এবং বহুবিবাহ। পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার বহাল, নিকাহ হালালা নিষিদ্ধ করা, বিধবা নারী ও তাদের সন্তানদের সম্পত্তির অধিকার, দত্তক আইন চালু করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষ পদক্ষেপ বাঞ্ছনীয়।
জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ে বিভক্ত ভারতবর্ষ। কারণ স্বাধীনতা আন্দোলনে রাজনৈতিকগতভাবে ভারত একহলেও ভাষাগত, জাতিসত্ত্বাগত, উপজাতিগত, প্রাদেশিক এমনকি এক প্রদেশের মধ্যেও নানা এলাকায় বিভিন্নতায় জাতিগঠনের দুর্বলতা থেকে গেছে। বর্তমানে এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ভোট ব্যাঙ্ককে রক্ষা করতে জাতপাতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তৈরি করা হচ্ছে বিভাজন।
প্রধানমন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে বলেন—‘কোন পরিবারের যদি প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা আলাদা আইনথাকে তাহলে কি সেই সংসার চালানো যায়।’ অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে সকলের জন্য একই আইন বলা হচ্ছে।
কোন আইন? রাষ্ট্রীয় আইন? না কি সংখ্যাগরিষ্ঠের আইন? এখনও পরিষ্কার নয়। প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুনসংসদ ভবন উদ্বোধনে দেখা গেল দেশের জ্ঞানীগুণী বিশিষ্টজন ও রাষ্ট্রপতিকে বাদ দিয়ে বেশি গুরুত্ব পেল সাধু, সন্ন্যাসী, মন্ত্রপাঠ, যজ্ঞ, হোম ইত্যাদি। যদিও নিয়ম রক্ষার্থে অন্য ধর্মের নিয়মনীতি যৎসামান্য হলেও রাখা হয়। কিন্তু ধর্মীয় রীতিনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাৎ হিন্দুত্বের প্রাধান্য প্রতিফলিত হতে দেখা গেল। সরকারী কাজের দপ্তর সংসদ ভবন। সেখানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান কেন?
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতিতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিফলিত হতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক, বেদাঙ্গ, জ্যোতিষ পড়ানো ইত্যাদিতে ধর্মীয় বিভাজন ও হিন্দুত্ববাদকে বাড়াতে সহায়ক হবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
তাই ব্যক্তিগত আইনগুলির অকল্যাণকর দিক ও কুপ্রথাগুলির বিরুদ্ধে সামাজিক সংস্কার ও আইনি সুরক্ষা না দিয়ে, দেশের অভ্যন্তরে মত বিনিময় ও মতবাদিক সংগ্রাম গড়ে না তুলে তড়িঘড়ি করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পাশের তৎপরতা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষদের ভাবিয়ে তুলেছে। মূল্যবৃদ্ধি সহ সামাজিক সমস্যাকে জাতপাতের সমস্যাতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ভোট ব্যাঙ্ককে রক্ষা করতে হিন্দুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িকতার শক্তি বৃদ্ধির পথ প্রশস্থ করার আর এক অভিনব পদক্ষেপ নয় তো?
মতামত ব্যক্তিগত
লেখক: নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী এবং রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির সম্পাদক
'সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী' নিয়ে অভিযোগ শুভেন্দুর! কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কমিশনকে প্রশ্ন হাইকোর্টের