
শেষ আপডেট: 21 October 2023 12:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: দেবী দুর্গার আরাধনায় যখন বর্ণ হিন্দুরা মগ্ন, তখন মহিষাসুর স্মরণে দাসাই পরবে মাতলেন জনজাতির মানুষ। তাঁদের কাছে এই উৎসব শোক পালনের। তাঁদের কাছে দুর্গার পরিচিতি ’হুদুড় দুর্গা’ নামে। তাই দেবীপক্ষে বর্ণহিন্দুরা যখন দেবী দুর্গার আরাধনায় মগ্ন থাকেন তখন নাচের মাধ্যমে দুর্গা অর্থাৎ হুদুড় দুর্গাকে খুঁজে বেড়ান তাঁরা। ছদ্মবেশে হুদুড় দুর্গাকে খুঁজে বেড়ানোর এই পর্বই জনজাতির মানুষদের কাছে ‘দাসাই পরব’ নামে পরিচিত।
পূর্ব বর্ধমান জেলার জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষজনের কাছে এই পরবের মাহাত্ম্যই আলাদা। শুক্রবার মহাষষ্ঠীর দিন থেকেই মাতোয়ারা আউসগ্রামের মালিয়ারা জঙ্গলমহল এলাকার মানুষজন। জনজাতি সমাজের একাংশ মনে করেন তাঁরা মহিষাসুরের বংশধর। ২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী গোটা দেশে এখনও ’অসুর জনজাতির’ মানুষের বসবাস রয়েছে। সেই তাঁরাই মহিষাসুর অর্থাৎ হুদুড় দুর্গার পুজারী। তাই দুর্গা পুজোর সময়ে তাঁরা মহিষাসুরের পুজো করেন। রাঢ়বঙ্গ- সহ উত্তরবঙ্গের অসুর জনজাতির মানুষজন বিশ্বাস করেন দুর্গা আসলে কোনও নারী শক্তি নন। তাঁদের মতে দুর্গা শক্তিশালী বলবান পুরুষ। সেই কারণে তাঁদের কাছে দুর্গা ’হুদুড় দুর্গা’ নামেই পরিচিত।
আদিবাসী জনজাতীর মানুষজন এও বিশ্বাস করেন ’অনার্যদের’ দেবতা হলেন ’অসুর’। আর্যরা কখনই অনার্যদের দেবতা ’হুদুড় দুর্গার’ সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। তাই দেবীরূপী দুর্গাকে সামনে এগিয়ে দিয়ে মহিষাসুরের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন দেবতারা। তাঁদের মতে চিরাচরিত দুর্গা পুজোর কাঠামোয় অসুরকে যতই অত্যাচারী দেখানো হোক না কেন, বাস্তবে মহিষাসুর ছিলেন ঠিক তার উল্টো। যুদ্ধে ’অসুর’ কোনও মহিলা ও শিশুদের আঘাত করতেন না। সেই দুর্বলতা জেনে দেবতারা বিজয়লাভ করার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দুর্গাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য । নিজের নীতিতে অবিচল মহিষাসুর তাই দুর্গার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হন। এই বিশ্বাসে ভর করেই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন দুর্গাপুজোর সময়ে ছদ্মবেশে নাচের মাধ্যমে তাঁদের অনার্য ভগবানকে খুঁজে বেড়ান। ভাদ্র মাস শেষ হতেই আদিবাসী মহল্লায় শুরু হয়ে যায় দাসাই পরব পালনের প্রস্তুতি। পুজোর ষষ্ঠীর দিন থেকেই পুরুষরা নারী সেজে ধামসা ও মাদল নিয়ে ’দাসাই নাচে’ মাতোয়ারা হন। দশমী পর্যন্ত চলে এই দাসাই পরব ।
‘অসুর’ জনজাতির লৌকিক বিশ্বাস, অসুররা এই দেশের প্রাচীন জনজাতি। তাদের নেতার নাম ছিল ‘হুদুড়’ দুর্গা’ অর্থাৎ ‘মহিষাসুর’। সাঁওতালি ভাষায় দুর্গা পুংলিঙ্গ। সাঁওতালি ভাষায় ‘হুদুড়’ কথার অর্থ প্রচণ্ড জোরে বয়ে চলা বাতাস । আর্য সেনাপতি ’ইন্দ্র’ ছলনা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এক দেবীকে হুদুড় দুর্গার কাছে পাঠান। ওই দেবী হুদুড় দুর্গাকে বিয়ে করার পর নবমীর দিন হুদুড় দুর্গাকে হত্যা করেন। অসুর জনজাতির মানুষজন এই লোককথাকে বিশ্বাস করেই শতকের পর শতক দুর্গোৎসবের চারদিন শোকের পরব দাসাই পালন করে আসছেন। আদিবাসী পুরুষেরা নারীর বেশে, মাথায় ময়ূরের পুচ্ছ লাগিয়ে বুক চাপড়ে গ্রামে গ্রামে ‘ভুয়াং’ নাচ দেখিয়ে আর দুঃখের গান গেয়ে এই সময়ে তাদের মহিষাসুর বা হুদুড়দুর্গাকে খুঁজে বেড়ান।