.webp)
শেষ আপডেট: 28 November 2023 19:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেও একই নভেম্বর মাস। দিনটা ১২-র বদলে ১৩ তারিখ। সময়টা যদিও প্রায় সাড়ে ৩ দশক আগের। রাতের শিফটে খনিতে কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। অন্ধকারের মধ্যেই চলছিল কয়লা তোলার কাজ। তার মধ্যেই কীভাবে যেন হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করেছিল ভিতরে। কিছুক্ষণ মাত্র, সেই জল ভাসিয়ে দিয়েছিল মাটির তলার কৃষ্ণগহ্বর। আটকে পড়েছিলেন ৬৫ জন শ্রমিক, অবিকল উত্তরকাশীর মতোই। এক-দু ঘণ্টা নয়, এক-দু দিনও নয়, টানা ৪ দিন জল ঢুকে পড়া খনির অন্ধকারই ছিল ৬৫টা প্রাণের 'ঠিকানা'। অবস্থা এমনই হয়েছিল যে উদ্ধারকারীর দলও প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। যদিও রুদ্ধশ্বাস অভিযানের শেষে জীবিত অবস্থাতেই বের করে আনা সম্ভব হয়েছিল সকলকে।
উত্তরাখণ্ডের ঘটনা কানে আসার পর থেকে সেদিনের কথা মনে করে কেঁপে কেঁপে উঠছেন জগদীশ প্রজাপতি। সেদিন তিনি ছিলেন ওই ৬৫ জনের একজন। রানিগঞ্জের মহাবীর খনিতে সেদিন নাইট শিফটে কাজ করছিলেন তিনি। হঠাৎ করে জলে ভেসে গিয়েছিল পুরো জায়গাটা। প্রথমে পায়ের পাতা, তারপর হাঁটু, কোমর ছাপিয়ে আরও বাড়তে শুরু করেছিল জল। ততক্ষণে আলো নিভে গেছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বাকিদের সঙ্গে। এদিকে জল বেড়েই চলেছে।
কী হবে, কীভাবে বেরোবেন, আদৌ বেরোতে পারবেন কিনা, কিচ্ছু বুঝতে পারছিলেন না জগদীশ। তবে ডুবে মরা থেকে বাঁচতে বাকিদের সঙ্গেই আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়লার একটা উঁচু ঢিপিতে। না আছে বিদ্যুৎ, না অন্য কিছু। থাকার মধ্যে একটা টেলিফোন লাইন। তার মাধ্যমেই খবর পাঠিয়েছিলেন বাইরে থাকা লোকজনকে। তারপরেই শুরু হয়েছিল উদ্ধারকাজ। কিন্তু তখনও বোঝা যায়নি, এ বড় কঠিন ঠাইঁ। এত সহজ হবে না আটকা পড়া মানুষগুলোকে বের করে আনা।
হাল ধরল ইসিএল। তাদের সার্ভেয়াররা প্রথমেই নির্ভুল গণনায় বের করে ফেললেন, ঠিক কোন জায়গায় আটকে রয়েছেন ৬৫ জন। ঠিক হয়, উপর থেকে গর্ত খুঁড়ে তখনকার মতো খাবার, পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছানো হবে তাঁদের কাছে। সেই মতো শুরু হয় বোর হোল খোঁড়ার কাজ। তার সাহায্যের খাবার পাঠানো হয়।
এই পর্যন্ত তো হল। কিন্তু শ্রমিকদের বের করে আনা হবে কীভাবে? ভিতরে তো জল থইথই। নিকষ কালো আঁধারে গায়ে গা লাগিয়ে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে ৬৫টা প্রাণ। এর আগে ছোটোখাটো উদ্ধারকাজ করলেও এই মাপের অভিযান চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না ইসিএলের। তখন খবর দেওয়া হল ধানবাদের একটি বিশেষ দলকে। এছাড়া আসরে নামে কোল ইন্ডিয়া এবং আরও একটি বেসরকারি খনন সংস্থা।
কিন্তু এসব করতে করতেই সময় কাটতে শুরু করে। উদ্ধারকারী দলের কাছে যা ১ ঘণ্টা, জগদীশ প্রজাপতির কাছে তা যেন তখন আস্ত একটা দিন! কদিন বাদেই তাঁর বড় মেয়ের বিয়ে। কৃষ্ণগহ্বরে বসে বসেই তখন ভাবছেন, মেয়েটার কী হবে? তিনি না থাকলে আদৌ কি বিয়েটা হবে? আর কোনওদিন কি স্ত্রী-সন্তানদের মুখ দেখতে পারবেন তিনি? তাঁর যা হবে হবে, কিন্তু সংসারটা যে ভেসে যাবে!
বাইরে তখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা। কোল ইন্ডিয়ার মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার যশবন্ত গিলের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে উদ্ধারের বিশেষ নকশা। ঠিক হয়, লোহা দিয়ে বানানো হবে বিশেষ ক্যাপসুল। সেই ক্যাপসুলের মধ্যে করে বের করে আনা হবে ওই শ্রমিকদের। সেই পরিকল্পনা মতো ১৪ নভেম্বর রাত থেকেই শুরু হল ক্যাপসুল তৈরির কাজ। একটা গোটা দিনও লাগেনি, তার মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় লোহার ক্যাপসুল। খনির সামনে আনা হতেই নিজে ভিতরে ঢুকে তা পরখ করে দেখলেন যশবন্ত। ততক্ষণে রাত নেমেছে। এক একটা মিনিট যেন এক একটা দিন।
যশবন্ত নিজে ক্যাপসুলে করে নামলেন খনির ভিতর কালো আঁধারে। এক এক করে সেই লোহার বর্মের আস্তরণে ঢোকানো হয় শ্রমিকদের। শুরু হয় অন্তিম পর্বের উদ্ধারকাজ। ১৬ তারিখ সকালের মধ্যে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে আনা হয়েছিল সকলকেই। ৪ দিন পর খোলা পৃথিবীর জল-হাওয়া দেখে নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আটকা পড়ে থাকা মানুষগুলো। তারপর হাসপাতাল, চিকিৎসা। আস্তে আস্তে সুস্থ জীবনে প্রত্যাবর্তন। তবে স্মৃতিটুকু রয়ে গেছে। আক্ষরিক অর্থেই জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়। সে কি আর মুছে ফেলা সম্ভব?
১৯৮৯ সালে পেরেছিলেন তাঁরা। সফল হয়েছিল মিশন রানিগঞ্জ। সফল হবে মিশন উত্তরাখণ্ডও। ১২ নভেম্বর সেখানে সুড়ঙ্গ ধসে আটক ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধারের কাজ এখন অন্তিম পর্বে। আশায় বুক বেঁধেছেন জগদীশ প্রজাপতি। ইতিবাচক ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হবে, ধুকপুকে বুক নিয়ে অপেক্ষায় তিনি। সেই আশাতেই বুক বেঁধেছে সারা দেশও।