
শেষ আপডেট: 30 January 2019 13:23
৩ জুন ১৯৩০ থেকে ২৯ জানুয়ারি ২০১৯। ৮৮ বছরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন দেশের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ। আর এই মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় রাজনীতির ময়দানের ‘জায়ান্ট কিলার’ হারিয়ে গেলেন চিরতরে। মন্ত্রী হিসেবে জর্জ কেমন ছিলেন, সেই স্মৃতিচারণ করেছেন অনেকেই। কিন্তু মানুষ জর্জ, বন্ধু জর্জ কেমন ছিলেন, তাঁর জীবনদর্শনই বা কী ছিল... দ্য ওয়াল-কে গল্প শোনালেন শম্পা দাস।
ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে জরুরি অবস্থা চলছিল। টানা ২০ দিন ভারত জুড়ে রেল ধর্মঘট করে আলোচনা-সমালোচনার সব আলো নিজের দিকে টেনে এনেছিলেন জর্জ। তাঁকে গ্রেফতারও করা হয় সে সময়ে। এক বর্ণও পাঞ্জাবি বলতে না পারা জর্জ গ্রেফতারি এড়াতে ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন এক পাঞ্জাবি ভদ্রলোকেরই। আশঙ্কা প্রকাশ করে আমায় বারবার বলছিলেন, একটুও পাঞ্জাবি বলতে পারেন না, কী হবে ধরা পড়লে!
গ্রেফতারির পরে যখন সকলকে দাঁড় করিয়ে আমায় চিহ্নিত করতে বলা হয়, পাগড়ি পরা জর্জকে দেখে আমিও সটান চিনি না বলে দিয়েছিলাম। তার পরে এয়ারপোর্ট থেকে জর্জকে নিয়ে সোজা আমাদের দক্ষিণ কলকাতার পার্ক সার্কাসের বাড়িতে চলে আসি।
আসলে রাজনীতি আমার বিষয় নয় সেই অর্থে, কিন্তু ওঁকে দেখে উৎসাহ পেয়েছি সব সময়। সমতা পার্টিতে আমি বেশ কিছু বছর স্টেট প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এখনও যে ‘হিন্দমোটর ফার্মার পঞ্চায়েত’-এ আমি ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ, তাতেও ওঁর জীবনদর্শন আমায় অনুপ্রেরণা দেয়। উনি আমার ছেলে অগ্নিদেবকেও (চিত্র পরিচালক অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়) বড্ড ভালবাসতেন।
কর্নাটকের ম্যাঙ্গালোরের এক ক্যাথলিক পরিবারে জন্মেছিলেন জর্জ। ১৯৪৮ সালে জর্জের বাবা-মা তাঁকে বেঙ্গালুরুতে পাঠিয়েছিলেন যাজক হিসেবে পড়াশোনা করতে। কিন্তু পরের বছরেই বম্বেতে গিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সে সময়েই অন্যতম এক শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠেন জর্জ ফার্নান্ডেজ। এই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি৷ এ সময়ে তিনি ফুটপাথে ঘুমিয়েছেন, ঘামে ভেজা শহর দেখেছেন কাছ থেকে। আর এ ভাবে তিনি বেড়ে উঠেছেন বলেই নিজের জামাকাপড় কেচে মেলার অভ্যাস ছিল ওঁর। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েও সেই অভ্যাস উনি বজায় রেখেছিলেন।
আপাদমস্তক সাদামাঠা জীবনে বিশ্বাসী জর্জ সব সময় খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। আমি ওঁর জন্মদিনে ১২টা পাজামা-পাঞ্জাবি পাঠাতাম প্রতি বছর, যা সারা বছর পরতেন উনি। নেতা মন্ত্রীদের মতো সাদাই পরতে হবে, এমন কোনও ফ্যাসিনেশন কাজ করত না তাঁর। পুঁথিগত শিক্ষার ডিগ্রি তাঁর খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তিনি এত বই পড়েছেন, যে তাতেই ওঁর জীবনদর্শন বাকিদের থেকে আলাদা ছিল। সাংবাদিকতা এবং কৃষিবিজ্ঞানেও পারদর্শী ছিলেন জর্জ।
এই জর্জের বিরুদ্ধেই কফিন কেলেঙ্কারির মিথ্যা অভিযোগ তুলল কংগ্রেস। আর প্রচলিত মিডিয়াগুলো সেটাই হু হু করে প্রচার করল। এক জন সৎ, সাধারণ মানুষের ভাবমূর্তি বিশ্রী ভাবে নষ্ট করে দিল।
১৯৬৭ সালে তাঁর সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ। ওই বছরই দক্ষিণ মুম্বাই থেকে কংগ্রেস নেতা এসকে পাটিলকে হারিয়ে প্রথম বার লোকসভার সদস্য হন জর্জ ফার্নান্ডেজ। তখনই তাঁকে ‘জায়ান্ট কিলার’ আখ্যা দেওয়া হয়। তিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মোট ন'বার লোকসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে শেষ বার রাজ্যসভার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পরে মোরারজী দেশাই মন্ত্রিসভায় জর্জ ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী৷ ১৯৮৯-৯০ সালে ভিপি সিং মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শেষ ৭-৮ বছর অ্যালঝাইমার্সে ভুগছিলেন জর্জ। কাউকে চিনতে পারতেন না। তবে জর্জের স্ত্রী জয়া বারবারই আমাকে ডেকেছেন। আমি এসে দাঁড়ালে চিনতে পারতেন উনি। 'আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে' গানটি গাইতেন। ওঁর বাড়ির দরজা সব সময়ই সকলের জন্য খোলা থাকত। অন্য ভিভিআইপিদের মতো গেটে সিকিউরিটির বিষয় ছিল না। আজও নেই।
জর্জের কাছে শেষ বছরগুলোতেও আমি এসেছি বারবার। একদম শেষের দিকটায় কোমায় চলে গেলেন উনি। তবে ওঁর ভাবনা আমাদের সঙ্গে থেকেই যাবে। সেই ভাবনাকে সম্মান করেই দিল্লির লোধী শ্মশানে ওঁর শেষকৃত্য হবে আগামী কাল। জর্জ জন্মেছিলেন খ্রিস্টান পরিবারে, কিন্তু ধর্ম নিয়ে কোনও দিনই কোনও বাড়াবাড়ি ছিল না তাঁর। এমনকী মাঝে নিজেকে নাস্তিকও বলতেন। তাই তাঁর ইচ্ছেকে সম্মান করেই তাঁকে সমাহিত করা হচ্ছে না।
অনুলিখন: মধুরিমা রায়