দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারা পৃথিবীতে ২১৩টি দেশ কোভিড আক্রান্ত। সংক্রমণ শুরুর ছ’মাস পরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই কোটি। মারা গিয়েছেন আট লাখেরও বেশি মানুষ। রাশিয়ার তৈরি ভ্যাকসিন নিয়েও নিঃসংশয় হতে পারেনি বিশ্বের অনেক দেশ। তার মধ্যেই টিকা-জাতীয়তাবাদ নিয়ে উঠে এলো কিছু প্রশ্ন।
গত ২০ অগস্ট একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথা হু। তাতে বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন-চুক্তি বা টিকা-জাতীয়তাবাদ থেকে বিরত থাকার জন্য দেশগুলিকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংস্থার প্রধান টেড্রোস অ্যাধনম বলেন, "আমাদের ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ রোধ করা দরকার।" তিনি আরও বলেন "জাতীয় স্বার্থেই প্রত্যেক দেশের উচিত কোভিড ভ্যাকসিনের অপর্যাপ্ত সরবরাহ কুক্ষিগত না করে, প্রয়োজন অনুসারে তা ভাগ করে নেওয়া।"
টিকা জাতীয়তাবাদ কী?
উন্নত দেশগুলি টাকার জোরে ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে অনেক আগে থেকেই একধরণের চুক্তি করে রাখে। ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে মানুষের শরীরে তা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা সফল হওয়া মাত্র চুক্তি অনুযায়ী সবার আগে বিত্তশালী দেশগুলোর কাছে পৌঁছে যায় জীবনদায়ী ওষুধ। এর ফলে বঞ্চনার শিকার হয় তুলনায় গরিব দেশগুলো।
করোনার আবহেও পারস্পরিক শক্তিপ্রদর্শনে পিছপা হচ্ছেনা প্রথম বিশ্বের দেশগুলো। এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রতিটি দেশই চাইছে করোনা নির্মূলকারী ভ্যাকসিন বা টিকা সবার আগে তাদের হাতেই আসুক। এই অসম প্রতিযোগিতার ফলেই টিকা জাতীয়তাবাদ চুক্তির হিড়িক লেগে গিয়েছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে।
কারা এর সুবিধে ভোগ করবে?
লন্ডনের বিশ্লেষণ সংস্থা এয়ারফিনিটির একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো এবং জাপান ইতিমধ্যেই কোভিভ-১৯ এর সম্ভাব্য ওষুধের প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডোজ অগ্রিম কিনে ফেলেছে নিজেদের দেশের জন্য।
ফাইজার ইনক, জনসন এন্ড জনসন বা অ্যাস্ট্রাজেনেকার মতো ওষুধ প্রস্তুতকারণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে এই দেশগুলো অনেক আগে থেকেই চুক্তি করে রেখেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ৬টি ওষুধ সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে আগে থেকেই ৮০০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছে নিজের দেশের রোগীদের জন্য। সংযুক্ত রাজ্যগুলিও একইভাবে ৫টি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে ২৮০ মিলিয়ন ডোজের জন্য। এ ব্যাপারে ইউরোপের দেশগুলোও পিছিয়ে নেই। তারা ইতিমধ্যেই ৩০০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন কেনার জন্য অক্সফোর্ডের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে।
অতঃকিম?
প্রথম বিশ্বের দেশগুলির এই আত্মরক্ষামূলক নীতির বিশ্বজুড়ে কালো প্রভাব পড়তে চলেছে বলে আশঙ্কা অনেকের। জীবনদায়ী ওষুধের বেশিভাগটাই যে ভাবে কিছু ধনী দেশ কুক্ষিগত করে ফেলতে চাইছে, তাতে সেই আশঙ্কা আরও জোরাল হয়েছে। তার ফলে সমস্যায় পড়েছে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলো। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এখুনি ব্যবস্থা না নিলে শুধুমাত্র প্রথম বিশ্বের গুটিকয়েক দেশের হাতেই থাকবে করোনার প্রাণদায়ী ওষুধ। আর পৃথিবীর বাকি দেশগুলোকে এই মারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়তে হবে খালি হাতে। টাকা আর ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জীবনদায়ী ওষুধের ক্ষেত্রে এই অসম বিভাজনের তীব্র সমালোচনা করেছে হু।
প্রসঙ্গত, গত ৫ অগস্টই এ ব্যাপারে তাৎপর্যপূর্ন মন্তব্য করেছিলেন মাইক্রোসফট অধিকর্তা বিল গেটস। মূলত হোয়াইট হাউসের উদ্দেশেই বিল গেটস বলেন, “আগে গরিব দেশগুলিকে ভ্যাকসিন দাও। আমরা শুধু নিজেদের সুরক্ষা নিয়েই ভাবছি। নিজেদের খেয়াল রাখার কথা ভাবছি। ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিতরণে যেন সেটা না হয়।”
আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জোটের (GAVI) প্রধান কার্যনির্বাহক শেথ বার্কলেও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, “যদি মুষ্টিমেয় অথবা ৩০-৪০ টি দেশের হাতেই শুধু ভ্যাকসিন থাকে, তাহলে বাকি দেড়শ দেশের অসংখ্য রোগীর কী হবে? মহামারি সেখানে তো আরও ভয়ঙ্কর আকার নেবে! "
খুব তাড়াতাড়িই বিশ্বের বাজারে এসে পড়বে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন। কিন্তু সে ওষুধ বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের চাহিদা অনুসারে পাবে? নাকি অন্যান্য অনেককিছুর মতো জীবনদায়ী সেই ভ্যাকসিনের দাবি নিয়েও ‘দাদাগিরি’ করবে প্রথম বিশ্বের বড়লোক দেশগুলো? আর যদি সেই আশঙ্কা সত্যি হয়, তাহলে তার আশু সমাধানই বা কী? এসব চিন্তাই এই মুহূর্তে কপালে ভাঁজ ফেলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আধিকারিকদের। কী হবে আগামীতে, সেটাই দেখার।