
শেষ আপডেট: 14 January 2024 13:29
কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দুর। কথাটা যে কতটা সত্যি সেটা গঙ্গাসাগর না এলে বুঝতাম না।
চারিদিকে থিকথিকে ভিড়। হঠাৎ কোনও জায়গা আবার ফাঁকা। জায়গায় জায়গায় ত্রিপল টাঙিয়ে অস্থায়ী তাঁবু বানিয়ে, বা প্লাস্টিক পেতে বিছানা করে 'ঘর' বানিয়েছে শত শত বিশ্বাসী। শুক্রবার সাগর মেলায় ততটা ঠান্ডা মালুম না পেলেও শনিবার রাতে যেন জমে যাওয়ার জোগাড়। সংক্রান্তি যত এগিয়ে আসছে, শীতের কামড় তেমন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
আর রাত বাড়লেই বাড়ছে কুয়াশা। সেই সঙ্গে বাড়ছে সারি সারি মানুষের শোওয়ার জন্য একটু জায়গা খোঁজার উদ্বেগ। পুণ্যস্নানের শুভক্ষণ প্রায় এল বলে। তাই মানুষ আসতে শুরু করেছেন দলে দলে। বাংলা তো বটেই, বিহার, হরিয়ানা, রাজস্থান সহ আরও দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমাচ্ছেন গঙ্গাসাগরের মেলায়।
কেবল একটু পুণ্য অর্জনের লোভ আর ভক্তির মহিমা। তার কারণেই এত কষ্ট হাসিমুখে সামাল দেওয়া যায়। বিশ্বাসীদের কাছে 'গঙ্গা মাইয়া' অনেক বড় দেব-দেবতার থেকে বেশি কাছের। গঙ্গা মাইয়া নাকি কিছু নেন না। যা তাঁকে দেওয়া হয়, উপুড় হস্তে কানাকড়িটুকুও ফিরিয়ে দেন। পৌষ-মাঘের শীত, মাথা গোঁজার জায়গার নিশ্চয়তা নেই, তবু বারবার কী দিতে আর কীই বা ফিরিয়ে নিতে তাঁরা আসেন, অবিশ্বাসীর পক্ষে বোঝা মুশকিল। যিনি দেন, আর যিনি ফিরিয়ে দেন, এ বোঝাপড়াটুকু নিতান্তই তাঁদের। বাকিদের বোঝার প্রয়োজনই বা কী!
রাতের দিকে খাবার খেয়ে হাঁটতে বেরোলাম। কপিলমুনির আশ্রমের কাছে যেতেই চোখে পড়ল, নানারকম মুখ। মুখ বদলাতেই বদলে যায় অভিব্যক্তিও। কেউ শোওয়ার জায়গা খোঁজা নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেউ আবার তা পেয়ে গেছেন বলে নিশ্চিন্তে গল্প করছেন। আবার কেউ কেউ জায়গা পেয়ে শুয়ে ঘুমিয়েও পড়েছেন।
এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডার রাতে যাঁরা মাথা গোঁজার জায়গাটুকুর বন্দোবস্ত করে উঠতে পারেননি, তাঁরা গিয়ে বসেছেন মন্দির চত্বরে গাছের তলায়। তাঁদের সবার বাহ্যিক চেহারা অবিকল একই রকম। হাঁটুদুটো ভাঁজ করে আনা বুকের কাছে, মাথা নীচু হয়ে ঝুঁকে এসেছে সেই ভাঁজ হওয়া হাঁটুর কাছেই। শীতে জবুথবু আর কাকে বলে! মন্দিরের চাতাল জুড়ে শুধুই চাদর ঢাকা দেওয়া মাথা। আর গায়ে? কারও একটা পাতলা কম্বল, তো কেউ একটা চাদর বা প্লাস্টিক জড়িয়েই বসে। মেলা শুরু হয়েছে ৮ তারিখ থেকে। তবে মানুষ আসতে শুরু করেছেন তার আগে থেকেই। ফলে জায়গা পাওয়া নিয়ে বিরাট সমস্যা। অগত্যা, গাছতলা। তবে ভক্তি আর পুণ্যের লোভ বড় বালাই! তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় আশ্রয়হীনতাও। তাই বারবার ফিরে ফিরে আসা।
কিছুক্ষণ এদিক ওদিক করে এগিয়ে গেলাম ওঁদের দিকে। কথা বললাম সুরিতা দেবীর সঙ্গে। জানলাম, এত অসুবিধে সত্ত্বেও প্রতি বছরই আসেন তিনি। ওই যে, গঙ্গা মাইয়ার টান। কয়েকটা ডুব পাল্টে দেবে এ জীবনের যাবতীয় পাপ-পুণ্যের হিসেব। বললেন, "থাকার জায়গা পাইনি ঠিকই, কিন্তু গঙ্গায় ডুব দেব, ব্যস এসব কষ্ট আর গায়ে লাগবে না। তারপর চলে যাব।" সুরিতা দেবী একা নন, তাঁর মতো আরও হাজার হাজার মানুষ এসেছেন এই গঙ্গাসাগরে, যাঁরা বিশ্বাস করেন সাগর মেলায় স্নান করলে মিটবে সব দুঃখ, সব জ্বালা, সব কামনা, সব যন্ত্রণা, সব খারাপ। বুঝলাম, মানসিক শান্তির খোঁজ পেটের জ্বালা মেটানোর খোঁজের থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায় মাঝে মাঝে।
বিশ্বাস এমনই জিনিস, সে না মানে ঠান্ডা, না কুয়াশা না কষ্ট। অদম্য ইচ্ছে আর বুকভরা বিশ্বাস নিয়ে সুরিতা দেবীর মতো গঙ্গাসাগর যাত্রায় এসেছেন বহু পুণ্যার্থী। জানি না তাঁদের সবার ইচ্ছে পূরণ হবে কিনা। তবু অটল বিশ্বাসে তাঁরা আসবেন পরের বছরও। এভাবেই কষ্ট করে থাকবেনও। তাঁদের বিশ্বাসের কাছে "সব তীর্থ বার বার গঙ্গাসাগর একবার" এই কথাটা ফিকে হয়ে যায়।