দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত ১৫ অগস্টই মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার করে তাঁকে ‘শোওন অ্যারেস্ট’ করে রেখেছিল আরামবাগ মহিলা থানা। শেষপর্যন্ত আদালতের লড়াইয়ে জেল থেকে মুক্তি পেলেন আরামবাগ টিভি ইউটিউব চ্যানেলের সম্পাদক সফিকুল ইসলাম।
এদিন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায়ের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে মুক্ত হন সফিকুল। বেরিয়ে এসে সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আজকে তাৎক্ষণিক খুশি হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আসল খুশি হব যেদিন সাংবাদিক হিসেবে সত্যিটা সোচ্চারে বলার পরিবেশ তৈরি হবে।” আশঙ্কাপ্রকাশ করে সফিকুল বলেন, “আমি জানি না কালকে আবার কোনও মামলায় আমায় গ্রেফতার করবে কিনা!”
তিনি আরও বলেন, গত দু’মাস ধরে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের উপর উপর ঝড় বয়ে গিয়েছে। তবে আরামবাগ কোর্টের আইনজীবী অরূপ রতন হাজরা, হাইকোর্টের আইনজীবী তথা রাজ্য সভার সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় যে ভাবে লড়াই করেছেন তার কথা উল্লেখ করে সফিকুল বলেন, “এঁরা নিরলস ভাবে কাজ করে গিয়েছেন। আমার জামিন নাকচ হয়েছে। কিন্তু তাঁরা হাল ছাড়েননি।”
গত এপ্রিল মাসে আরামবাগ টিভি ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, লকডাউনের মধ্যেও থানা থেকে ক্লাবগুলিকে চেক বিলি করা হচ্ছে। প্রথমে পুলিশ অস্বীকার করলেও পরে কাগজে কলমে মেনে নেয় চেক বিলি হয়েছিল। সফিকুলের অভিযোগ ছিল, পুকুর চুরি হওয়া মানুষের সামনে তুলে ধরার কারণেই এই পুলিশ উঠেপড়ে লেগেছে তাঁকে জেলে পাঠাতে। সেই সময়ে অনেকে বলেছিলেন, যে ক্লাবগুলিকে পুলিশ সরকারি চেক বিলি করেছিল তার অধিকাংশের কোনও অস্তিত্বই নেই। সবটাই শাসকদলের নেতাদের লুটে খাওয়ার বন্দোবস্ত।
সেই মামলায় জামিন পেয়ে যান সফিকুল। কিন্তু জুন মাসে তাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হয়। সেই মামলায় সস্ত্রীক সফিকুল ও ক্যামেরাম্যান সুরজ আলিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২৯ জুন একটি এফআইআর দায়ের হয় সফিকুল ও সুরজের বিরুদ্ধে। তাতে বলা হয়, গাছ কাটা নিয়ে এক ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী পুলিশকে বলেন, সুরজ তাঁকে হুমকি দেন, ৩০ হাজার টাকা না দিলে গাছ কাটার খবর ফাঁস করে দেবেন! তাঁর বক্তব্য, তিনি সুরজকে বলেছিলেন পঞ্চায়েতের নির্দেশে গাছ কাটছেন। তাও টাকা চাওয়া হয়।
অনেকের অভিযোগ, সুরজের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই মামলা সাজিয়েছিল পুলিশ। তাঁদের এও বক্তব্য, বিভিন্ন খবরের জেরে প্রশাসনের উপর মহলে নাড়াচাড়া পড়ে গিয়েছিল। তাতে বাঁহাতি রোজগারে টান পড়পছিল পুলিশের। সেই জন্যই সফিকুলদের জেলে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
সফিকুলের গ্রেফতার নিয়ে হইচই পড়ে যায় রাজ্যে। সরব হন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ও। রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান টুইট করে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন, “সরকারি টাকা ভুয়ো ক্লাবগুলির মধ্যে বিলি করা তুলে ধরাতে সফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার হয়েছে।” রাজ্যপাল এও লিখেছিলেন, “সাংবাদিকদের চুপ করিয়ে রাখা মানে গণতন্ত্রের মুখ বন্ধ করে দেওয়া।”
তা ছাড়াও সফিকুলদের মুক্তির দাবিতে সব্যসাচী চক্রবর্তী, অপর্ণা সেন, কৌশিক সেন, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়, চলচ্চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, রবীন্দ্র ভারতীর প্রাক্তন দুই উপাচার্য শুভঙ্কর চক্রবর্তী, পবিত্র সরকার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি অশোকনাথ বসু থেকে কার্টুন কাণ্ডে জেলে যাওয়া অম্বিকেশ মহাপাত্র-সহ বিশিষ্টরা সরব হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আট সপ্তাহ পর জামিন পেলেন আরামবাগ টিভির সম্পাদক।