দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁদের মধ্যে যতই শুভেচ্ছা বিনিময় হোক ভাইফোঁটায়, কালীপুজোয় 'দিদি'র বাড়িতে যতই আমন্ত্রিত হয়ে আসুন 'ভাই', তাঁদের মধ্যে সম্পর্কটা যে একেবারেই মধুর নয়, তা প্রকাশ পেয়েছে বারবারই। কখনও বাস্তব জীবনে পরস্পরকে এড়িয়ে গেছেন তাঁরা, কখনও আবার পরস্পরকে আক্রমণ করার জন্য আশ্রয় করেছেন সোশ্যাল মিডিয়া। তাঁরা হলেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। তাঁদের সম্পর্ক যে শীতলতা থেকে সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে, তা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেছে রাজ্যবাসীর কাছে। এবার মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করার নতুন কৌশল নিলেন রাজ্যপাল।
মুখ্যমন্ত্রীর দু'টি ভিডিও ক্লিপ একসঙ্গে করে বানানো একটি ভিডিও টুইটারে শেয়ার করেন জগদীপ ধনকড়। তাতে একটি ক্যাপশনও লেখেন তিনি: "ভিডিওটি বিশ্লেষণ করলে যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।" ভিডিওয় দেখা যাচ্ছে, ২০০৫ সালে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে লোকসভায় বক্তব্য রাখছেন মমতা। অনুপ্রবেশকে বিপর্যয়ের সঙ্গেও তুলনা করছেন তিনি। পরবর্তী ক্লিপিংয়েই দেখা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তৃতা, যেখানে এনআরসি ও ক্যাবের বিপক্ষে বক্তব্য রাখছেন তিনি।
দেখুন সেই ভিডিও। ফেসবুকের এই ভিডিওটিই নিজের টুইটার হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছেন রাজ্যপাল।
https://www.facebook.com/TheFrustratedBengali/videos/575250406640972/?v=575250406640972
এর আগেও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে টুইটারে বাগযুদ্ধ হয় রাজ্যপালের। দু'পক্ষই নিজের নিজের যুক্তি সাজান পরপর, নানা বিষয়ে। কিন্তু এই বার রাজ্যপাল অন্য অস্ত্র নিলেন। মমতারই পুরনো কথা তুলে এনে তা নতুন কথার সঙ্গে বসিয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন, দ্বিচারিতা করছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বলছে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে যত অ-মুসলিম ব্যক্তি ধর্মীয় কারণে উৎপীড়িত হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতে এসেছেন, তাঁরা সকলেই শরণার্থী হিসেবে এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অন্য বিরোধীদের বক্তব্য, নাগরিকত্ব পাওয়ার মাপকাঠি কখনওই ধর্ম হতে পারে না। এটা সংবিধান বিরোধী।
নতুন আইনটির মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করে অবৈধ অভিবাসীদের দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী। আবার মুসলিম ব্যক্তিদের শুধু ধর্মের কারণে দেশ ছাড়তে হবে। মামলাকারীদের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী ভারত এটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। যে কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে সমান আচরণ করতে বাধ্য এ দেশের সরকার। নতুন আইন সেই সংবিধানকে আঘাত করছে। এই আইন নাগরিকদের জীবন ও মৌলিক অধিকার তথা সাম্যের অধিকারও লঙ্ঘন করে।
তাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বলেছেন, নাগরিকত্ব আইন এবং এনআরসি, দুটোর কোনওটাই পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োগ করতে দেবেন না তিনি। আর এই নাগরিকত্ব আইন নিয়েই নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী-রাজ্যপাল সম্পর্ক। সম্প্রতি জগদীপ ধনকড়কে "বিজেপির এজেন্ট" বলেও উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই নিয়ে রাজ্যজুড়ে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হওয়ায় সোমবারই পুলিশের মহানির্দেশক এবং মুখ্যসচিবকে তলব করেন রাজ্যপাল। কিন্তু তাঁরা যাননি, কিছু জানানওনি। এর পরে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ডেকে পাঠান রাজ্যপাল। মমতা নিজেও যাননি, উল্টে একটি চিঠি লেখেন রাজ্যপালকে।
রাজ্যপালকে লেখা সংক্ষিপ্ত চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, “রাজ্য সরকার এবং রাজ্যের সিনিয়র অফিসারদের সমালোচনা করে আপনি ঘন ঘন যে সাংবাদিক বৈঠক করছেন ও টুইট করছেন, তা দেখে আমি খুবই মর্মাহত। আপনি নিশ্চয়ই বুঝবেন যে গোটা দেশে যে পরিস্থিতি চলছে তার নিরিখে রাজ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাটাই এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য”।
এর পরেই রাজ্যপালকে খোঁচা দিয়ে চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, “আমি মনে করি শান্তি ও সদ্ভাবের পরিবেশ বজায় রাখতে রাজ্য সরকারের পাশে থাকাটাই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা, বিশেষ করে যারা শৃঙ্খলার পরিবেশকে নষ্ট করতে চাইছে তাদের উস্কানি না দেওয়াটাই কর্তব্য। দয়া করে শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করুন।”
মুখ্যমন্ত্রীর চিঠির শেষ লাইনের বার্তা পরিষ্কার। অনেকের মতে, মমতা বোঝাতে চেয়েছেন রাজ্যপাল আসলে উস্কানি দেওয়ার কাজটাই করছেন।
নবান্নের ওই চিঠি পাওয়ার পর রাজ্যপালও জবাব দিতে আধ ঘন্টার বেশি সময় নেননি। চিঠিতে তিনি লেখেন, “আপনার চিঠি পেয়েছি। চিঠিতে যেভাবে আপনি তির্যক উক্তি করেছেন তা পড়ে আমি বিস্মিত শুধু নই, প্রচণ্ড মর্মাহতও হয়েছি। আপনি যা বোঝাতে চেয়েছেন তার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই তাই অনুরোধ করছি আপনি আত্মসমীক্ষা করুন।”
চিঠিতে রাজ্যপাল আরও লিখেছেন, “আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে সাংবিধানিক এক্তিয়ারের মধ্যে থেকে আমি সুচিন্তিতভাবে কিছু পদক্ষেপ করেছি। শান্তি, সদ্ভাব ও আইনের শাসন যাতে বজায় থাকে সেজন্য বহুবার সাধারণ ও সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি।”
এর পরেই চিঠিতে তাঁর ক্ষোভ উগরে দিয়ে রাজ্যপাল লিখেছেন, “রাজ্যপাল পদে এই কম সময়ের মধ্যে আপনার মন্ত্রীরা আমার সম্পর্কে প্রকাশ্যে গালমন্দ করে ভরিয়ে দিয়েছে। আমার অমর্যাদা করেছেন। আমার সাংবিধানিক পদের গুরুত্বও ভুলে যাওয়া হয়েছে। সেই বিষয় এবং সংবিধানের ১৬৬ ও ১৬৭ ধারার অমর্যাদা করার ঘটনা নিয়ে আপনারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, কিন্তু কোনও জবাব পাইনি। এমনকি চলতি সংকটের পরিস্থিতি সম্পর্কে রাজ্য সরকারের কোনও স্তরের কেউই ( পড়ুন কোনও আমলা বা পুলিশ কর্তা) আমাকে বিশদে কিছু জানাননি”।
সব শেষে রাজ্যপাল লিখেছেন, “যাই হোক সেই সব কথা নিয়ে এখন আর ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইনা। বরং জনস্বার্থে দু’জনে মিলে সমন্বয় করে চলে চলতি হিংসার পরিস্থিতি থেকে মানুষকে রেহাই দিয়ে শান্তি কায়েম করা উচিত বলেই মনে করছি। এবং আগামী কালের মিটিংয়ের ব্যাপারে আপনার থেকে ইতিবাচক জবাব আশা করছি।”
অর্থাৎ এত কিছু পরেও রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে গতকাল মঙ্গলবার রাজভবনে মমতাকে তলব করেছিলেন তিনি। শেষমেশ যাননি মুখ্যমন্ত্রী। ফলে এই চিঠি ঠোকাঠুকিতেই সংঘাত আপাতত শেষ হচ্ছে না বলেই অনেকে মনে করেছিলেন। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হয়েছিল।
হলও তাই।
বুধবার রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ভিডিওটি শেয়ার করে রাজ্যপাল আক্রমণ করলেন মমতাকে।