
শেষ আপডেট: 7 March 2019 11:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পুরুলিয়া : গোল হয়ে বসে রয়েছে ফারজানা, লতিকা, শিবু, তসলিমা, সুমন, তনিশার মতো আরও অনেকে। আর তাদেরই মধ্যমনি হয়ে বসে রয়েছেন তিনি। বসে রয়েছেন বললে ভুল হবে, কখনও কবিতা বলছেন, কখনও গেয়ে উঠছেন গান, কখনও পা মেলাচ্ছেন নাচের তালে। কখনও আবার হাতে রঙ তুলি নিয়ে পৃথিবীটাকে রঙিন করে তোলার পাঠ দিচ্ছেন তাঁকে ঘিরে থাকা খুদেদের।
পুরুলিয়ার মানবাজার ১ ব্লকের প্রত্যন্ত চাপাতি গ্রাম। এখানকার অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র জুড়ে গিয়েছে তাঁর জীবনের সঙ্গে। সেই ১৯৭৫ সাল থেকে। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ছোটদের সঙ্গে প্রতিদিন নিজের শিক্ষা-অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন বীথিকা মাহাতো। সেই কাজেরই স্বীকৃতিতে সম্প্রতি মিলেছে কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় অঙ্গনওয়ারি কর্মী পুরস্কার। দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন, তাই নিজে যেতে পারেননি সেই পুরস্কার আনতে, সরকারের প্রতিনিধিই স্মারক ও ৫০ হাজার চাকার চেক পৌঁছে দিয়ে গেছে বাড়িতে। একই সঙ্গে ঝুলিতে এসেছে রাজ্য সরকারের উৎকর্ষতা পুরস্কারও।
রাস্তার ধারে অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রটি ছোট। কিন্তু সর্বত্র পরিচ্ছন্নতা আর পরিশীলতার ছাপ। পুরোটাই যেন বীথিকার মননে সমৃদ্ধ। ছোটদের হাতে কলমে পাঠ দেওয়ার নিদর্শন দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন গোটা কেন্দ্র। রোজ সকাল হতেই চলে আসেন। তারপরেই গুটি গুটি আসেন এলাকার ছোটরা। শুধু যে চারপাশ সম্পর্কে ছোটদের অবহিত করা, তাই নয় হাসতে খেলতে তাঁরা যেন শেখে সব, সে দিকেই নজর তাঁর। অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র থেকে খাবার দেওয়া হয় শিশু ও প্রসূতি মায়েদের। সেই খাবার খাওয়ার আগে যাতে ছোটরা হাত ধোয় তার জন্য জলের বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন নিজে।
https://www.youtube.com/watch?v=8mQgYSdAkd4&feature=youtu.be
ক্লাস চলাকালীন কখনো কবিতা বলছেন, কখনো ফল চেনাচ্ছেন, আবার কখনও ওজন নিচ্ছেন শিশুদের। আবার ওরা খেতে বসলে পরম যত্নে ভাত তুলে দিচ্ছেন ওদের পাতে। বললেন, “যে ভাবে চারপাশটা দেখে ওরা বড় হচ্ছে, আমার শেখানোর ধারাটাও সেই অনুযায়ীই চলে। তবেই ওরা বুঝতে পারে। ভাষা, অঙ্ক সবই শেখাই গল্পচ্ছলে।”
শরীর বিদ্রোহ না করলে একদিন ও বন্ধ হয় না কেন্দ্রে আসা। এটাও যে একরকম বাড়িই তাঁর। তবে পরিবার এখানে অনেক বড়। আর তার দায়িত্বও অনেকখানি। আন্তরিক ভাবে চান প্রত্যেকটা শিশু দেশের সু নাগরিক হয়ে উঠুক।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছেন “এই প্রত্যন্ত এলাকাতেও অনেক শিশুই মেধা নিয়ে জন্মায়। কিন্তু মায়েরা শিশুদের বোধের বিকাশে সে ভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে না।”
তাই তাঁর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ভাবনা, “শিশুরা যেমন শিখছে, মায়েরাও শিখুক। তাহলেই ছোটদের শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে।”