দ্য ওয়াল ব্যুরো, হুগলি : হিন্দু ধর্মমতে বিশ্বের আদি পুরুষ তিনি। আবার পার্থিব এই দেবতার কাছেই আশা আকাঙ্খা কামনা বাসনা পূরণের নানা আবদার। বছরভর তিনি আরাধ্য হলেও ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে দেশজুড়ে হয় তাঁর বিশেষ আরাধনা। শিবপুরাণ মতে, শিব চতুর্দশীর রাতেই সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের মহা তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব। আবার এই রাতেই না কী বিয়ে হয়েছিল শিব ও পার্বতীর। আর এই রাতেই পাপ বিনাশ ও মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। সেই কারণেই মহা শিবরাত্রিতে দেশজুড়ে ভক্তরা মেতে ওঠেন বিশেষ পুজোপাঠ ও উৎসবে। ব্যতিক্রম নয় এ রাজ্যও।
শিবমহাপুরাণে শিব রাত্রির যে মাহাত্ম্যের উল্লেখ রয়েছে, সেই অনুযায়ী অতি প্রাচীনকালে কাশীধামে বাস করতো এক ব্যাধ। একদিন শিকারে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে হিংস্র জন্তুর ভয়ে এক গাছের উপর আশ্রয় নেয়। সারাদিন শিকার মেলেনি কোনও, তাই আনমনেই গাছের উপর বসে একেকটি করে পাতা ছিড়ে নীচে ফেলতে থাকেন ওই হতাশ ব্যাধ। কোনও শিকার না পেয়ে সে হতাশ হয়ে গাছ থেকে একটা করে পাতা ছিঁড়ে নীচে ফেলতে থাকেন। সেই গাছটি ছিল বেলগাছ। আর সেই বেলগাছের নীচে একটি শিবলিঙ্গ ছিল। তিথি ছিল শিবচতুর্দশী অর্থাৎ মহাশিবরাত্রি। আর শিকার না পেয়ে দিনভর যেহেতু উপবাসী ছিল ব্যাধ, আর তাঁর ফেলা বেলপাতাগুলো যেহেতু শিবলিঙ্গের মাথায় পড়ে, এর ফলে অজান্তেই ব্রতর ফল লাভ হয় তাঁর।
এর কিছুদিন পরে সেই ব্যাধের মৃত্যু হলে যমদূতরা তাঁকে নিতে আসে। কিন্তু শিবচতুর্দশী ব্রতের ফলে শিবদূতরা এসে যুদ্ধ করে যমদূতদের হারিয়ে ব্যাধকে নিয়ে যায়। যমরাজ স্বীকার করেন যিনি শিবচতুর্দশীর ব্রত পালন করেন, তাঁর উপরে তাঁর কোনও অধিকার থাকে না। তিনি মুক্তিলাভ করেন।
আবার তারকেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত সন্দীপ চক্রবর্তী বলেন, “কথিত আছে পাণ্ডু পুত্র ভীম জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে রাতে ফিরতে না পেরে একটি বেল গাছে আশ্রয় নেন। সেই গাছের নিচেই ছিল শিবলিঙ্গ। গাছ থেকে বেলপাতা ছিড়ে অজান্তেই শিবলিঙ্গের মাথায় ফেলেছিলেন তিনি। মৃত্যুর পরে শিবলোক প্রাপ্ত হন ভীম। সেই থেকেই শিবরাত্রির মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে হিন্দু সমাজে।
ভারতবর্ষের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ তথা সোমনাথ, মল্লিকার্জুন, মহাকালেশ্বর, ওঙ্কারেশ্বর, কেদারনাথ, ভীমশঙ্কর, বিশ্বেশ্বর, ত্র্যয়ম্বকেশ্বর, বৈদ্যনাথ, নাগেশ্বর, রামেশ্বর ও ঘুশ্মেশ্বরে এই বিশেষ দিনে বহু মানুষের সমাগম হয়। ভক্তদের ভিড় উপছে পড়ে অন্যান্য শিবতীর্থেও।
https://www.youtube.com/watch?v=xKYiT2NqSmg&feature=youtu.be
আজ সকাল থেকে হুগলির তারকেশ্বর মন্দিরেও উপছে পড়েছে ভক্তদের ভিড়। শিবরাত্রি উপলক্ষে সাজিয়ে তোলা হয়েছে গোটা মন্দির চত্বর। সাধারণত শ্রাবণ মাসে শ্রাবণী মেলা উপলক্ষে গোটা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় তারকেশ্বরে। চৈত্র মাসেও শিবের মাথায় জল ঢালতে বৈদ্যবাটি নিমাই তীর্থ ঘাট থেকে গঙ্গার জল নিয়ে পায়ে হেঁটে তারকেশ্বরে যান বহু ভক্ত। তবে প্রতিবছরই শিব চতুর্দশীতে মহিলাদের ভিড় থাকে নজরকাড়া। যে কোনও রকম অপ্রীতিকর অবস্থা ঠেকাতে নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসন। ভক্তদের সুবিধার জন্য সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।