
শেষ আপডেট: 10 January 2023 14:10
গত ১ ডিসেম্বর জি ২০ গোষ্ঠীর সভাপতি হয়েছে ভারত। ডিসেম্বরের শুরুতেই নাগাল্যান্ড মেতে উঠেছিল হর্নবিল উৎসবে। সেখানে জি ২০-র সভাপতি হিসাবে প্রথমবার বিভিন্ন দেশের কর্তাব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানায় ভারত। এরপর সোমবার থেকে কলকাতায় শুরু হয়েছে গ্রুপ অব টোয়েন্টি-র বৈঠক। দেশের ৫০টি শহরে এমন বৈঠক হবে। তারপর সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবেন ৩০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। কয়েকটি দেশে মোদী নিজে গিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আসবেন।

বড়লোকরা যখন পারে না, তখন মধ্যবিত্তদের ডাক পড়ে। বিশ্বের ধনীতম সাতটি দেশকে নিয়ে একসময় তৈরি হয়েছিল জি সেভেন গোষ্ঠী। তারা বিশ্ব জুড়ে আর্থিক মন্দা, সন্ত্রাসবাদ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারেনি। তখন স্থির হয়, মাঝারি আয়ের দেশগুলিকে নিয়ে আরও বড় একটি গোষ্ঠী (group of countries) গড়ে তোলা হবে। তাতে কিছু কাজ হতে পারে।
সেইমতো ১৯৯৯ সালে গঠিত হয় গ্রুপ অব টোয়েন্টি। তাতে আছে মোট ১৯টি দেশ। সেগুলি হল, আমেরিকা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মেক্সিকো, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চিন, জার্মানি, ব্রিটেন, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইতালি, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং ভারত। এছাড়া আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অর্থাৎ ধনী ও মধ্যবিত্ত দেশগুলিকে নিয়ে ওই গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে।

জি ২০-র শীর্ষ বৈঠকে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (আইএমএফ)-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। জি ২০-র সদস্য না হয়েও বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর, স্পেন ও নাইজেরিয়া শীর্ষ বৈঠকে দূত পাঠায়।
ওই গোষ্ঠীর কোনও স্থায়ী সম্পাদকমণ্ডলী নেই। জি ২০-র সদস্য দেশগুলি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। পর্যায়ক্রমে বিশ্বের এক-একটি অঞ্চল থেকে একটি করে দেশ সভাপতি হয়। ওই পদের মেয়াদ এক বছর। ভারতের আগে সভাপতি ছিল ইন্দোনেশিয়া। ২০২৪ সালে সভাপতি হবে ব্রাজিল। ২০২৫ সালে ওই পদ পাবে দক্ষিণ আফ্রিকা।

জি ২০ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলিতে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ বাস করে। বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ আসে ওই দেশগুলি থেকে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে জি-২০। প্রথমদিকে ওই গোষ্ঠীর বৈঠকে মূলত সদস্য দেশগুলির অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নররা উপস্থিত থাকতেন। ২০০৭ সাল থেকে বৈঠকে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশ নিতে থাকেন। ২০০৮ সালে বিশ্ব জুড়ে আর্থিক সংকটের সময় স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে জি ২০। এর ফলে বাজারে আতঙ্ক হ্রাস পায়।
আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি জি ২০-র সভাপতি হিসাবে সফল হতে পারবে? চারদিকে এখন অনেক টালমাটাল। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের এক বছর পূর্ণ হতে চলেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কড়া নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটছে পশ্চিমী দুনিয়া। তাইওয়ানের দিকে হাত বাড়াচ্ছে চিন। আমেরিকার সঙ্গে চিনের শত্রুতা বাড়ছে। প্যানডেমিকের ধাক্কা থেকে এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বিশ্বের অর্থনীতি। সর্বত্র বাড়ছে দুর্নীতি, বেকারত্ব, খাদ্যাভাব, জাতিবিদ্বেষ। এই অবস্থায় কি বিশ্বের সামনে নতুন পথ দেখাতে পারবে গৌতম বুদ্ধ ও মহাত্মা গান্ধীর দেশ?

প্রধানমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ভারতের নেতৃত্বে জি ২০ মূলত তিনটি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করবে। সেগুলি হল, পরিবেশ দূষণ, সন্ত্রাসবাদ ও অতিমহামারী। যুদ্ধ করে এই সমস্যাগুলির সমাধান হবে না। সব দেশকে একসঙ্গে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বের নানা প্রান্তে খাদ্য, সার ও ওষুধ সরবরাহের পথে রাজনীতি যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তবেই মানবিক সংকট এড়ানো যাবে।
ইতিমধ্যে নানা মহল থেকে সমালোচনা করা হয়েছে, জি ২০ নেহাতই একটা 'টক শপ'। অর্থাৎ সেখানে শুধু কথা হয়। বড় বড় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয় না। এই বদনাম ঘোচাতে হলে ভারতকে আগামী এক বছরের মধ্যে বড় কিছু করে দেখাতে হবে। মোদী সম্ভবত চাইবেন, ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর জন্য জি ২০ গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিক।

নভেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে জি ২০-র শীর্ষ বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে গুরুতর মতভেদ দেখা যায়। রাশিয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে নানা দেশ মতপ্রকাশ করে। শেষে অবশ্য সব দেশ মিলে একটি বিবৃতি দেয়। নানা দেশকে ঐকমত্যে আনার ক্ষেত্রে মোদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তখনই তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে বার্তা দেন, 'এযুগে আর যুদ্ধ করা চলে না।' সব দেশই তাঁকে সমর্থন করে। আগামী একবছরে মোদী নিশ্চয় চাইবেন, রাশিয়া যুদ্ধ থামিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় বসুক। সেজন্য তাঁর নেতৃত্বে জি ২০ পুতিনের ওপরে চাপ দেবে। তাঁকে বার বার বোঝাবে, এযুগে যুদ্ধ করে কোনও সমস্যার সমাধান হয় না।
জি ২০-র শীর্ষ বৈঠকে মোদী সম্ভবত চিনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধের কথাও তুলবেন। গত কয়েক বছরে একাধিকবার লাদাখ আর অরুণাচলের দিকে হাত বাড়িয়েছে চিন। ভারত চাইবে, জি ২০ থেকে চিনকে বলা হোক, তারা যেন সংযত হয়। ভারতের জমি দখল করার চেষ্টা না করে।

বালিতে শীর্ষ বৈঠকে মোদী বলেছিলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল যেন অল্প কয়েকজনের মধ্যে আটকে না থাকে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে যাতে প্রত্যেকের কাছে নতুন প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দেওয়া যায়, তার জন্য চেষ্টা করতে হবে। এবার মোদী নিশ্চয় ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের জন্যও জি ২০-কে কাজে লাগাতে চাইবেন।
উপনিষদে আছে, অয়ম্ নিজ পর ভেতি গণনা লঘুচেতসাম/ উদারচরিতানাং তু বসুধৈব কুটুম্বকম্।
অর্থাৎ, হীন চরিত্রের মানুষজনের মধ্যে ভেদবুদ্ধি থাকে। তারা আপন-পর ভেদাভেদ করে। কিন্তু যাদের চরিত্র উদার, তারা সারা বিশ্বের মানুষকে মনে করে কুটুম্ব।

ভারত ঘোষণা করেছে, জি ২০-র থিম হবে 'বসুধৈব কুটুম্বকম্'। অর্থাৎ লক্ষ্যপূরণের জন্য ভারত সব দেশকে কুটুম্বিতার বন্ধনে বাঁধতে চায়। কাজটা খুবই শক্ত। জাতিবিদ্বেষ ও প্রভুত্বের আকাঙ্ক্ষা দেশে দেশে শত্রুতা তৈরি করে। জি ২০-র সভাপতি হিসাবে ভারত এই শত্রুতা দূর করার চেষ্টা করবে। যদি সফল হয়, তাহলে নানা সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
ওরা যেদিন গরম জামা পাবে, সেদিন আমিও পরব: রাহুলকে আবিষ্কার করছে দেশ