দ্য ওয়াল ব্যুরো: হাতে বড় বড় নখ। সুন্দর করে পলিশ করা, তাতে গোলাপি নেলপেন্ট চকচক করছে। কথার টানেও খানিক মেয়েলি ছোঁয়া কি? চোখের চাউনিতে কিছুটা আড়ষ্টতা, কিছুটা লজ্জা, কেমন জানি সংকোচ লুকিয়ে রয়েছে।
অটো চালককে অনেকক্ষণ ধরেই নজর করছিলেন পুনম। মুম্বইয়ের মেয়ে পুনম খিনচির অটোতেই নিত্য যাতায়াত। তাঁর রুটে এই চালকের সঙ্গে পরিচয় প্রথম। কী যেন এক ব্যতিক্রমী সত্তা এই মানুষটি। কৌতুহল থেকেই শুরু হয় পরিচয় পর্ব। আর সেই আলাপচারিতার প্রতিটা পর্যায়ে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তুলে ধরেছেন পুনম। সেটাই ভাইরাল হয়ে এখন ছেয়ে গেছে নেট দুনিয়ায়।
পুনম জানিয়েছেন, নাম জানার আগেই তিনি নিশ্চিত হয়ে গেছিলেন এই মানুষটি সমাজের দাগানো গড়পড়তা লিঙ্গের মধ্যে পড়েন না। তৃতীয় পরিসরের ছোঁয়া তাঁর সত্তা ঘিরে রেখেছে। তাই হয়তো ‘স্বাভাবিক’ সমাজের মাঝে তিনি কিছুটা আড়ষ্ট। পিছনের সিটের বাকি দুই যাত্রীর নজরও ছিল এঁর দিকেই। সে দিক থেকে কিছুটা চাপা ফিসফাস-হাসি-তামাশাও যে হচ্ছিল না সেটা নয়। সে সবে পাত্তা না দিয়ে পুনম শুরু করে কথোপকথন।
“এত বড় নখ কেন?” হাল্কা মেজাজেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেন যুবতী। খানিক লজ্জা মেশানো গলায় চালকের থেকে উত্তর আসে, “দিদি, ইদের জন্য তৈরি হচ্ছি।” উৎসবের রঙ লেগেছে মানুষটির আবেগে। মনের ভিতরে যে নারীকে নিত্যদিন লালন-পালন করেন তিনি, তাকেই সাজিয়ে-গুছিয়ে মনের মতো করে নিতে চাইছেন মানুষটি। তাই হয়তো হাতে বড় নখ, তাতে গোলাপি নেলপেন্ট। হারানোর যন্ত্রণা নেই, বরং যা আছে ঝুলিতে তাই নিয়েই বেঁচে থাকার লড়াই আপ্লুত করে পুনমকে। জানা যায়, চালকের নাম মঞ্জু।
মুম্বইয়ের রাস্তায় পাঁচ বছর ধরে অটো চালান মঞ্জু। “একটা হোটেলে কাজ করতাম। আমার লিঙ্গ নিয়ে প্রায়ই নানা মানুষের কটূক্তি শুনতে হতো। কর্তৃপক্ষেরা হাসি-মস্করা করতো। এই জন্যেই একদিন চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো আমাকে। এখন পেট চালাতে অটো চালাই,” যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সবটুকুই যেন ফুটে উঠেছিল মঞ্জুর মুখে। তিনি জানিয়েছিলেন, এই অটো চালিয়েও স্বস্তি নেই। রাত ১১টার পর অটো নিয়ে রাস্তায় থাকা সম্ভব হয় না তাঁর। কারণ রাত গড়লেই ছেলে-ছোকড়াদের অশালীন মন্তব্য আর নোংরা চাউনিতে বিদ্ধ হতে হয় তাঁকে। পুনম জানিয়েছেন, শত কষ্টের মধ্যেও হাসতে ভোলেননি মানুষটা। সেটাই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল পুনমকে।
https://www.facebook.com/poonism/posts/10157757185077223
বাড়ি ফিরে সে দিনই মঞ্জুর সঙ্গে অটো সফরের বৃত্তান্তটা ফটাফট লিখে ফেলেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে। ক্যাপশনে লেখেন, “এমন এক ভালো মনের অটোওয়ালির সঙ্গে সফর করে আমি আপ্লুত।” সাড়াও মেলে সঙ্গে সঙ্গে। মঞ্জুর লড়াই দেখে আধুনিক সমাজের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্নও তোলেন অনেক ভিউয়ার। পোস্টটা ভাইরাল হতে বেশি সময় নেয় না।
নারী ও পুরুষ এই দুই লিঙ্গের খোপে পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে যে ধরে-বেঁধে রাখা যায় না তার সত্যতা ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। রায়ের ভাষা ছিল, ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের অধিকার মানবাধিকার। রাষ্ট্র আইনি সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে এঁদের অধিকার বলবৎ করবে। শিক্ষায় ও চাকরিতে সংরক্ষণও এঁদের প্রাপ্য হবে। এ তো গেল আইনি খাতায় স্বীকৃতি। কিন্তু, সমাজে ও সংসারের বাঁধনে এই মানুষগুলো আজও সমানাধিকারের স্বীকৃতি পেয়েছেন কি না সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। আর মঞ্জুর প্রসঙ্গ টেনে সেই ভাবনাকেই ফের উস্কে দিয়েছেন একাধিক ভিউয়ার।
লিঙ্গ-স্বীকৃতি না মিললেই এখনও এ দেশে একঘরে করে দেওয়া হয়। পরিবার-পরিজন দ্বারা নির্বাসিত বৃহন্নলাদের বেছে নিতে হয় যৌনকর্মীর পেশা বা ভিক্ষুকের জীবন। নিজস্ব নারীত্ব বা পুরুষত্বের অভিব্যক্তির স্বাধীনতা কতজন পান? লিঙ্গ-বিদ্বেষ বস্তুটি অনেকটা বর্ণবিদ্বেষের মতোই। কিছু ভিত্তিহীন বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক প্রথা। তাকে ভাঙতে হলে উদ্যোগ শুধু আইনের বা রাষ্ট্রের নয়, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনও সেখানে একান্ত কাম্য। পুনমের এই পোস্টের রেশ হয়ত কিছুদিন বাদেই থিতিয়ে যাবে। কিন্তু বৃহত্তর এই সমস্যার সমাধান হবে কি? মঞ্জুর জীবনও হয়তো হতে পারত ট্রেনে ভিক্ষা করতে দেখা বৃহন্নলাদের মতো। অথবা সেই সমস্ত রূপান্তরকামীদের মতো, যাঁদেরকে জোর করে যৌন ব্যবসায় নামানো হয়। চড়া মেকআক নিয়ে রাত গড়ালেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
মঞ্জুর মতোই আরও ডজন খানেক মঞ্জু নিত্যদিন আমাদের চারপাশেই যে বঞ্চণার শিকার হচ্ছেন তার খবর কি রাখি আমরা, ঝড়টা তুলে দিয়েছেন পুনম নিজেই।