
শেষ আপডেট: 1 September 2023 07:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চাঁদের (Chandrayaan-3) মাটিতে যত রহস্য লুকিয়ে। সেখানেই ‘খুল যা সিম সিম’ বলতে হবে ইসরোকে। কাল্পনিক গল্পগাথা নয় কিন্তু, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই খুলবে রত্নভাণ্ডার। সেই পদ্ধতির খোঁজ পেয়েছেন আইআইটি মাদ্রাজের বিজ্ঞানী নীলেশ ভাসা।
চাঁদের মাটিতে সালফার ও অক্সিজেনের খোঁজ পেয়েছে প্রজ্ঞান (Chandrayaan-3)। হাইড্রোজেনের সন্ধান চলেছে। সেই সঙ্গেই চাঁদের মাটিতে তেজস্ক্রিয় মৌলের খোঁজও করছে প্রজ্ঞান। ২০০৮ সালে ইসরোর পাঠানো চন্দ্রযান-১ খবর দিয়েছিল চাঁদের মাটিতে বরফ জমে আছে। চাঁদের গহ্বর বা ক্রেটারে খনিজের ছড়াছড়ি। ‘মুন মিনারালোজি ম্যাপার ইনস্ট্রুমেন্ট (এম-থ্রি)’ দিয়ে চাঁদের মাটিতে বিভিন্ন খনিজের হদিশ দিয়েছিল চন্দ্রযান-১। প্রথম চন্দ্রযানের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করেই চাঁদের মাটিতে তেজস্ক্রিয় মৌলের খোঁজ শুরু হয়েছে।
কিন্তু সেই খোঁজ পাওয়া যাবে কীভাবে? তার জন্যই নতুন পদ্ধতির ব্যাখ্যা করেছেন বিজ্ঞানী-অধ্যাপক নীলেশ ভাসা। ইসরো ইতিমধ্যেই এই পদ্ধতিতে চাঁদের মাটিতে সালফার খুঁজে পেয়েছে।
চাঁদের মাটিকে গভীরভাবে চিনতে সাহায্য করছে লেজ়ার ইনডিউসড ব্রেকডাউন স্পেকট্রোস্কোপি (LIBS)। এই পেলোডই চাঁদের মাটিতে সালফার ও অক্সিজেনের খোঁজ দিয়েছে। চন্দ্রপৃষ্ঠে (Chandrayaan-3) কী কী খনিজ রয়েছে সে খোঁজ চালাচ্ছে ইসরোর ইলেকট্রো-অপটিকস সিস্টেম ল্যাবরেটরি (LEOS) এবং মাদ্রাজের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (IIT)। আইআইটির ইলেকট্রনিক্স বিভাগের গবেষক নীলেশ ভাসা বলছেন, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনকে কাজে লাগিয়ে তেজস্ক্রিয় মৌলের খোঁজ চলছে।
বিজ্ঞানীরা খনিজের খোঁজ করতে ন্যানোসেকেন্ড পালস লেজ়ার ব্যবহার করছেন। চাঁদের মাটি এমনিতেই উত্তেজিত। কারণ চাঁদের ধুলো রেগোলিথ আয়নিক কণায় ভর্তি। ধুলোর মধ্যে থাকা ইলেকট্রনেরা সবসময় লাফালাফি করে। মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণে উত্তেজিত হয়ে ওঠে চাঁদের ধুলো রেগোলিথ (Chandrayaan-3)। চাঁদে যেহেতু পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল নেই, তাই মহাজাগতিক রশ্মি, সৌরবায়ু সরাসরি আছড়ে পড়ে চাঁদে। আর মহাজাগতিক রশ্মিদের বিকিরণে চাঁদের ধুলো আরও উত্তেজিত হয়ে লাফালাফি শুরু করে। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি বা অন্য কোনও মহাজাগতিক রশ্মি চাঁদের মাটিতে সরাসরি আছড়ে পড়ার সময় এই সূক্ষাতিসূক্ষ ধূলিকণাগুলিকে আঘাত করে। ফলে ধুলোর মধ্যে থাকা ইলেকট্রনেরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে (Chandrayaan-3)।

এই চাঁদের ধুলো (Lunar Dust) বা রেগোলিথের (Regolith) মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, টাইটানিয়াম এবং আয়রনের মতো খনিজ মৌল। তাদের অণু-পরমাণুর মধ্যে নিরন্তর ধাক্কাধাক্কি, মারামারি চলছে। উত্তেজিচ ইলেকট্রনেরাই আগলে রাখছে তাদের। চাঁদের মাটির রহস্য ভেদ করতে হলে তাই আগে এই উত্তেজিত ইলেকট্রনদের শান্ত করা দরকার। চাঁদের আয়নিত ধূলিকণার মধ্যে খনিজের সন্ধান করতে যাওয়া বিপজ্জনক। তাই যে জায়গায় খনিজ রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা, সেই জায়গায় চাঁদের মাটিতে ইলেকট্রনদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
অধ্যাপক নীলেশ বলছেন, লেজ়ার রশ্মি ফেলে প্লাজমা তৈরি করা হচ্ছে। প্লাজমা হল আয়নিত গ্যাস ও ইলেকট্রনের সমন্বয়ে তৈরি পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। আসলে প্লাজমা হল আয়নিত গ্যাস যেখানে মুক্ত ইলেকট্রন ও ধনাত্মক আয়ন প্রায় সমান সংখ্যায় থাকে। প্লাজমা তড়িৎ পরিবহণ করতে পারে তবে এখানে আয়নিত কনারা ছটফটে নয়, ধীরস্থিরভাবে থাকে। চাঁদের মাটিতে লেজ়ার দিয়ে সেই অবস্থা তৈরি করে ইলেকট্রনদের উত্তেজনা কমাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেছে, চাঁদের ধুলো শান্ত হলেই নানারকম মৌলের কণা ফুটে উঠছে। প্রজ্ঞানের স্পেকট্রোমিটার সেই প্লাজমা অবস্থানে বিভিন্ন অনু-পরমাণুর গঠন দেখে সেখানে কী কী মৌল থাকতে পারে তা বিশ্লেষ করছে। এভাবেই সালফার ও অক্সিজেনের খোঁজ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানী বলছেন, চাঁদের মাটিতে লোহা ও টাইটেনিয়াম অক্সাইড আছে। চাঁদের পিঠে এক একটি বড় গহ্বরে যার পরিধি প্রায় ৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি, সেখানেই নাকি জমে আছে লোহা, টাইটেনিয়াম অক্সাইডের মতো ধাতু। সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, টাইটেনিয়াম ও আয়রনের মতো খনিজও আছে। পৃথিবীতে এইসব খনিজের খোঁজ পেতে হলে অনেক গভীরে যেতে হয়, কিন্তু চাঁদের মাটির উপরেই ধাতুর ছড়াছড়ি। এই ধাতব ভাণ্ডার রত্নভাণ্ডার থেকে কোনও অংশেই কম নয়। একবার এই ধাতুর ভাঁড়ারের খোঁজ পেলে সত্যি সত্যিই চাঁদ হাতের মুঠোয় চলে আসবে। সেই সঙ্গেই পৃথিবীতে জ্বালানির আরও কোনও সমস্যাই হবে না বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।