
শেষ আপডেট: 2 January 2024 12:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাঁচ বছর আগের ঘটনা। ঘাড়ে স্পন্ডিলাইটিসের ব্যাথার কারণ দেখিয়ে লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন সুব্রত বক্সী। তৃণমূলের রাজ্য সভাপতির শরীর এখনও যে বিশেষ ভাল তা নয়। তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা হল, দলের মধ্যেই এখন লাগাতার বিদ্রোহের মুখে পড়ছেন তিনি। কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ সূত্রে খবর, এহেন পরিস্থিতিতে দেওয়াল লিখন এবার প্রায় স্পষ্ট। রাজ্য সভাপতি পদ থেকে অচিরে বিদায় নিতে পারেন তৃণমূলের ‘বক্সীদা’। তা লোকসভা ভোটের আগেই হবে, না ভোট মিটে যাওয়ার পর তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট বা চূড়ান্ত নয়।
১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক ভাবে তৈরি হয়েছিল তৃণমূল। সেদিন থেকে এখনও পর্যন্ত একটানা জোড়াফুলের রাজ্য সভাপতি পদে রয়েছেন সুব্রত বক্সী। সেদিক বলতে গেলে সনিয়া গান্ধী-লালকৃষ্ণ আডবাণীদের রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছেন তিনি।
বিজেপিতে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সভাপতি পদে ছিলেন লালকৃষ্ণ আডবাণী। তিনটি মেয়াদ মিলিয়ে প্রায় ১১ বছর। সাবেক জাতীয় দল কংগ্রেসের সভানেত্রী পদে এই রেকর্ড রয়েছে সনিয়া গান্ধীর। ২২ বছর কংগ্রেসের সভানেত্রী ছিলেন সনিয়া। বক্সী তাঁদের দুজনকে অনেক আগেই টপকে গিয়েছেন। সূত্রের খবর, দলে বয়সের উর্ধ্বসীমা বাঁধতে চেয়ে এবার রাজ্য সভাপতি পদ থেকে বক্সীকে সরানোর দাবি ক্রমশই জোরালো হচ্ছে।
সুব্রত বক্সীর নিয়ন্ত্রণ যে শিথিল হচ্ছে বা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে তা গত ৭২ ঘণ্টায় দুটি ঘটনাতেও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। শনিবার নৈহাটিতে গিয়েছিলেন তিনি। ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলায় সাংসদ অর্জুন সিং ও বিধায়ক সোমনাথ শ্যামের মধ্যে যে আকচাআকচি চলছে তা মেটাতে দুজনকে নিয়ে মিটিং ডেকেছিলেন তিনি। কিন্তু অর্জুন গেলেও সোমনাথ সেই মিটিংয়ে যাননি। উল্টে সোমবারও জনসভা থেকে অর্জুনের সমালোচনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, সোমবার তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা দিবসে বক্সীর বক্তৃতার বাক্য গঠন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ।
শুধু তাই নয়, কুণাল এও বলেছেন যে নন্দীগ্রামে বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের জন্য দায়ী তৃণমূল নেতৃত্ব। এই মন্তব্যেরও নিশানা সুব্রত বক্সীই। কারণ, নন্দীগ্রামে ভোটের জন্য সুব্রত বক্সীর নেতৃত্বে চার জনের কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছিল।
দলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন নেতা বলে পরিচিত কুণাল। সোমনাথ শ্যামও তাই। ফলে বক্সীর বিরুদ্ধে এহেন বিদ্রোহের নেপথ্যে প্রশ্রয় রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। আবার ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তাপস রায়ও অভিষেকের আস্থাভাজন।
তৃণমূলের নবীন প্রজন্মের অনেকের বক্তব্য, বক্সীদা ভাল মানুষ। কিন্তু ঘটনা হল, রাজ্য সভাপতি হিসাবে তিনি গত পাঁচ বছরে রাজ্যের পাঁচটি জেলাতেও গিয়েছেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। কলকাতায় তৃণমূল ভবনে তিনি আকছার বসেন ঠিকই, কিন্তু নিচুতলার নেতা কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ভয় পান। কারণ কথায় কথায় গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠেন তিনি। এখন মাঝে মধ্যে আবার সুব্রত বক্সীর হয়ে মাঝে মধ্যে প্রক্সি দিচ্ছেন জয়প্রকাশ মজুমদার। কিন্তু কংগ্রেস থেকে বিজেপি ঘুরে আসা এই নেতার দলের মধ্যে বিশেষ ওজন নেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নবীন প্রজন্মের নেতারা যে কথা বলছেন, তা কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন না? পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, দিদি হয়তো সবটাই জানেন। কিন্তু এও ঠিক যে রাজ্য সভাপতি পদে একজন আস্থাভাজন ও ভরসা করার মতো নেতার প্রয়োজন ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সুব্রত বক্সীর আনুগত্য অপরিসীম। হতে পারে সেদিক থেকে বক্সীর কোনও বিকল্প পাননি দিদি। তা ছাড়া কমফোর্ট জোন বলেও একটা ব্যাপার থাকে। দ্বিতীয়ত, ত়ৃণমূল তৈরির পর দীর্ঘদিন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মুকুল রায়। সেই সঙ্গে মহা সচিব ছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। মুকুল কার্যত বক্সীকে অপ্রাসঙ্গিক করে রেখেছিলেন। সংগঠনে প্রশাসনিক কিছু দায়িত্ব পালন করা বক্সীর সেরকম কাজ ছিল না। মুকুল দল ছাড়ার পর সেই জায়গাটা আবার নিয়ে নেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
অনেকের মতে, সংগঠনের শীর্ষ পদে বছরের পর বছর থেকেও অনেক প্রবীণ নেতা যে কোনও কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারছেন না সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতেই সাময়িক ভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন অভিষেক। এই অবস্থায় প্রবীণদের দুর্বলতাগুলোও ধরা পড়ছে। তাতে নবীন প্রজন্মের অবস্থান আরও জোরালো হচ্ছে। তা ছাড়া দলের মধ্যে নবীনদের প্রশ্নের মুখে পড়ে রাজ্য সভাপতি পদে টিকে থাকাও এখন সুব্রত বক্সীর পক্ষে কিছুটা অস্বস্তিকরও হয়ে পড়ছে। তবে এটা ঠিক যে, সুব্রত বক্সী চাইলেও নিজে থেকেই সরে যেতে পারবেন না। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে না বলা পর্যন্ত বক্সীর সরে যাওয়া মুশকিল। হতে পারে মমতা-অভিষেক আলোচনার মাধ্যমে এই চেঞ্জ অফ গার্ডের একটা টাইমলাইন এবার স্থির হবে।