
অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় - ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 22 March 2024 10:00
অংশুমান কর
একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, মহাত্মা গান্ধী আর নাথুরাম গডসের মধ্যে বাছতে হলে কাকে বাছবেন–এ প্রশ্নের উত্তর তাঁকে একটু ভেবে দিতে হবে। শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই আরেকটি টিভি চ্যানেলে তিনি আরেকটি কথা বললেন। বললেন যে, নাথুরাম গডসে কেন গান্ধীকে খুন করেছিলেন তা নিয়ে গডসে একটি বই লিখেছেন। তাতে খান পঁচাত্তর-আশি যুক্তি দিয়েছেন গান্ধীকে খুনের স্বপক্ষে। বইটি তাঁর পড়া নেই। গডসের যুক্তিগুলি তিনি জানেন না। কাজেই একপক্ষের কথা না শুনে এই দুজনের মধ্যে কোনো একজনকে বেছে নেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
শুনে মনে হবে তিনি বোধহয় বিচারকের উর্দিটি গায়ে চাপিয়ে কথাটি বলছেন। বাদী-বিবাদী দু-পক্ষেরই কথা না শুনে রায় দিতে চাইছেন না। আসলে তা না। বুদ্ধিমান মানুষ তিনি। তাই বিচারকের পোশাকটি একটি চ্যানেলে তাঁর প্রদত্ত উত্তরকে সমর্থন করতে গায়ে কৌশলে চাপিয়ে নিয়েছেন। বলেওছেন যে, আগের চ্যানেলটি র্যাপিড ফায়ার রাউন্ডের ওই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার সময় তাঁর আইনজীবী বা বিচারক সত্তাটি প্রবল হয়ে উঠেছিল। তবে, বিচারকের পোশাকটি আর তাঁর গায়ে মানাচ্ছে না। ঢলঢল করছে।
বিচারব্যবস্থায় কী হয়? খুন একটি মহৎ কাজ না কি নিন্দনীয় কাজ তার বিচার কিন্তু বিচারক করেন না। বিচারক কেবল এটুকুই দেখেন যে, খুনের অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে, তিনি আদৌ খুনটি করেছেন কি না বা খুনটির সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগ আছে কি না। পৃথিবীতে এমন কোনো বিচারব্যবস্থা নেই যা খুনকে মহৎ জ্ঞান করে। কিন্তু, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় সেটাই করার চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে। নাথুরাম গডসের বইটি পড়েননি বলে তিনি বুঝেই উঠতে পারছেন না যে, মহাত্মা গান্ধীর খুনটি একটি নিন্দনীয় কাজ না কি মহৎ কাজ! ভাবা যায়! তাঁর কথা শুনে মনে হয়েছে, গডসের বইটিতে দেওয়া যুক্তিগুলি যদি তাঁর পছন্দ হয়, তাহলে তিনি গান্ধীর খুনটিকে যথাযথ এবং মহৎ একটি কর্ম বলে মেনে নেবেন এবং দুজনের মধ্যে কাউকে বাছতে হলে বেছে নেবেন নাথুরাম গডসেকেই।
মহাত্মা গান্ধী কে? সঞ্চালক যখন বলছেন গান্ধীজি ‘জাতির পিতা’, তখন এই সম্বোধনটিও মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতির পছন্দ হচ্ছে না। এই শব্দবন্ধটিকে তিনি বলেছেন ‘গোল গোল কথা’। তা বলতেই পারেন। একজন ব্যক্তিকে একটি জাতির পিতা বলার মধ্যে অতিশয়োক্তি আছে তো বটেই। কিন্তু আমরা সকলেই জানি গান্ধীজি তো কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন একজন দার্শনিক। প্রখ্যাত ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের এক ঔপন্যাসিক, রাজা রাও একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন গান্ধীর ওপরে, যে-প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল, “মহাত্মা গান্ধী: আ সেন্ট ওর আ পলিটিশিয়ান?” শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় যে, রাজা রাও মহাত্মা গান্ধীকে কেবলমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখেননি। গোটা পৃথিবীজুড়েই একাধিক পণ্ডিতেরা একই কথা বলেছেন।
গান্ধীর রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে হাজারো প্রশ্ন উঠেছে বারবার। প্রশ্ন থাকবেই। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তাঁর মহত্ত্বকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি কেউই। পৃথিবী বিখ্যাত পণ্ডিত দার্শনিকেরা কেউই তাঁর হত্যাকে একটি ন্যায্য হত্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করেননি। আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কথায় কথায় গান্ধীর নাম নেন। বোঝা যায় যে, গান্ধীর দর্শনকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ না করেই তিনি গান্ধীকে ব্যবহার করেন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে। কিন্তু এই অপচেষ্টা থেকেও এটুকু তো প্রমাণ হয় যে, গান্ধীর গুরুত্ব তিনি বোঝেন।
সত্যি বলতে কী, গত কয়েক বছরে ভারতীয় জনতা পার্টি কৌশলী উপায়ে গান্ধীকে আত্তীকরণের আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। কাজেই মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতি যা বলেছেন তা ঠিক বিজেপির কথাও নয়। তা হল আরএসএসের কথা। ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’ শীর্ষক একটি কবিতায় তারাপদ রায় লিখেছিলেন, “অ্যালসেশিয়ান ভেবে যে সারমেয় শাবকটিকে/আমরা তিন মাস বক্লস পরিয়ে মাংস খাওয়ালাম/ক্রমশ তার খেঁকিভাব প্রকট হয়ে উঠছে”। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে অন্তত এই কবিতার পঙ্ক্তিগুলি অমোঘ ভাবে বেজে উঠছে।
লেখাটির এতটুকু পড়ে একটি প্রশ্ন অনেকের মনে জাগতেই পারে। তাহলে কি গত কয়েক বছর ধরে এ রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্নীতি নিয়ে যে-সমস্ত রায় দিয়েছেন মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতি, সেগুলি সবই পক্ষপাতদুষ্ট রায়? আরএসএসের মতাদর্শ অন্তরে বহন করা মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতির রায়গুলি কি সম্পূর্ণ মূল্যহীন হয়ে গেল অত:পর? তা কিন্তু একেবারেই নয়। দুর্নীতি শিক্ষা জগতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে দিতে পেরেছে এই সরকার। পচন ছড়িয়ে পড়েছে অনেক দূর পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই প্রমাণিতও হয়েছে একাধিক দুর্নীতি। কাজেই মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতিকে একজন মসিহা মনে করেছিলাম বলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে এমনটা মনে করার কারণ নেই। এটুকুই শুধু বোঝা গেছে যে, কৃষ্ণচূড়া গাছটি আসলে বাঁদরলাঠি গাছ।
লেখক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।