
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ আপডেট: 9 May 2024 17:26
রাজর্ষি রীত
প্রতিটা মানুষ বাইরে থেকে দেখতে একইরকম হলেও, কেউ কেউ সংখ্যাগুরু জনতার ভিড়ে নিজের ভিতর থেকে অনেক আলাদা। এতটাই আলাদা, যা জীবনের চলার পথে তৈরি করছে বাধা। এই বিষয়টি কয়েক বছর আগেও খুব একটা চর্চায় ছিল না। মানুষ এখনকার দিনেই বেশি করে বুঝতে শুরু করেছে যে, এই 'বাধা'র বৈজ্ঞানিক পরিচিতিও রয়েছে। ডিসলেক্সিয়া, ডিসক্যালকুলিয়া, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার প্রভৃতি। বহু জ্ঞানী মানুষ মনে করেন, এগুলি মানব বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসলে সংখ্যাগুরু সমাজের বাঁধাধরা রীতিনীতির অনড়তাই এই প্রকার মানুষদের ভোগান্তির কারণ। এঁরা সারাজীবন হয়তো বুঝতেই পারেন না, এঁদের কোনও দোষ ত্রুটি ছিল না, বরং সারা জীবন নিজেকে চালাক করে তোলার ব্যর্থ চেষ্টায় অপরাধবোধে ভোগেন। সমাজচ্যুত, বর্জিত এইসব ব্যক্তি প্রায়ই তামাশা-মস্করার শিকার হয়ে থাকেন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের নানা সমস্যায় ভোগেন, একাকী জীবন কাটান। এঁদের গড় আয়ুষ্কালও তাই সংখ্যাগুরু সমাজের চাইতে অনেকাংশে কম হয়।
কিন্তু এই বৈচিত্র্য যে মানব বৈচিত্র্যেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই ধারণাই হলো 'নিউরোডাইভার্সিটি'। জীববৈচিত্র্যের মতোই এটি গুরুত্বপূর্ণ। মনে করা হয়, পাশ্চাত্যের বেশ কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি, যাঁরা জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পেরেছেন, তাঁরা আসলে নিউরোডাইভার্জেন্ট ছিলেন। এঁদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, ভ্যান গোখ, সালভাদর দালি, সাহিত্যিক ও দার্শনিক জর্জ বার্নার্ড শ, বারট্রান্ড রাসেল, আর্থার কনান ডয়েল, অগাথা ক্রিস্টি, লুই ক্যারল; বিজ্ঞানী লর্ড ক্যাভেন্ডিস, আইনস্টাইন, টমাস আলভা এডিসন, এলান টুরিং, তালিকাটি অগুনতি।
আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথও এমন ধরনের মানুষদের শনাক্ত করতে পেরেছিলেন, তাঁদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিলেন এবং এমন কিছু সামাজিক প্রথা বা সমস্যা তুলে ধরেছিলেন, যেগুলির বিষয়ে আমরা অতি সম্প্রতি ভাবতে শিখছি। আমি মনে করি যে রবীন্দ্রনাথ নিজেও নিউরোডাইভার্জেন্ট ছিলেন। তিনি স্কুলে ‘বুলিং’-এর শিকার হন, এবং সবার মাঝে ‘ইনক্লুডেড’ অনুভব করতে চেয়েও স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। সেই যুগেই তাঁকে ‘হোম স্কুলিং’ পদ্ধতিতে শিক্ষিত করা হয়। স্বভাবে লাজুক রবীন্দ্রনাথের মুখ দাড়িতে ঢাকা থাকার সম্ভাব্য একটা কারণ হয়তো বা তিনি একটা মোড়কে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত রুষ্ট ছিলেন, যা তাঁর বিভিন্ন লেখায় ফুটে উঠেছে।
সাহিত্যিকরা সাধারণত বাস্তব জীবনের বিভিন্ন চরিত্র থেকেই গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেন। রবীন্দ্রনাথ সেটাই করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লেখায় এমন কিছু চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়, যাদের জীবনযাত্রা, চিন্তাপদ্ধতি আর পাঁচটা মানুষের থেকে অনেক ভাবে আলাদা। স্কুলে পড়ার সময়ই আমি লক্ষ্য করি যে অন্যান্য আগেকার এবং এখনকার অনেক সাহিত্যিকের চাইতে, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট চরিত্রগুলি বিশেষ ভাবে আলাদা। সে চরিত্রগুলি বীর (হিরোইক) নয়। আবার অতি সাধারণ ও নয়। সামাজিক জটিলতা নিয়ে তারা খুব বেশি ভাবিত নয়। সমাজের দৃষ্টিতে তাদের অনেক 'খুঁত' আছে, আবার, তারা সমাজ থেকে শেখে কম, প্রকৃতি থেকে শেখে বেশি।
১। গল্প: পণরক্ষা
এই গল্পের ‘রসিক’ চরিত্রটি তাঁতিদের ছেলে, মূল ধারার খেলার চাইতে নানারকম জিনিস তৈরিতে তার আগ্রহ। একগুঁয়ে এই বালকটির শৈল্পিক দক্ষতার জন্য ওর বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুবান্ধব বেশি। কিন্তু সে সময়কার সমাজচিত্র অনুসারে প্রথামাফিক বন্ধু নেই বললেই চলে। রসিক ছেলেটি নানা রঙের সুতো দিয়ে অসম্ভব সুন্দর নকশা তৈরি করতে পারে। সে কোন প্রচলিত বাঁধাধরা নকশা সৃষ্টি করত না। সে নিজের মন থেকে নানারকম প্যাটার্ন সৃষ্টি করতে পারত। অথচ সে কাজগুলিকে অসম্পূর্ণ ফেলে রেখে দিত। তখনকার দিনে গরিব পরিবারে বাইসাইকেল কেনার একগুঁয়ে জেদের পরিণাম কী হতে পারে, তা আগাম অনুধাবন করার ক্ষমতা এই ছেলেটির ছিল না। একই সঙ্গে প্রতিভাবান এবং অপরিণামদর্শী, অস্থিরচিত্ত এই ছেলেটির খুব সম্ভবত অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার অর্থাৎ 'এডিএইচডি' ছিল।
২। গল্প: হৈমন্তী
এই গল্পে, তখনকার দিনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে, হৈম মেয়েটিকে দিয়ে মিথ্যা কথা বলানো যায়নি। হৈম নেহাত শিশু নয়, সতেরো বছর বয়স, অর্থাৎ 'অ্যাডোলেসেন্ট'। অথচ সে ইশারার ভাষা বুঝতে পারে না। সে সময়কার সমাজে জবরদস্তি বাল্যবিবাহের জন্য রাজি হওয়াটাই রীতি ছিল। সেই তুলনায় সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত একটি মেয়ের বিয়ে না হওয়া খুবই লজ্জাজনক হিসেবে দেখা হতো। যখন পাত্রপক্ষ মেয়েটিকে বয়স জিজ্ঞাসা করে, তখন সবাই তাঁকে আকারে ইঙ্গিতে চোখের ইশারায় বয়স কমিয়ে বলতে বলে। অথচ সে এই ইশারা বুঝতে পারে না । যখন তার বাবা তাঁকে বলেন যে মিথ্যে কথা বলতে হবে না, শুধু চুপ করে থাকতে হবে, তখনও সে স্তম্ভিত হয়ে থাকে। মানসিক যন্ত্রণায় দিন কাটানো এই চরিত্রটির কমপক্ষে নন-ভার্বাল এবং সোশাল কমিউনিকেশনে সমস্যা রয়েছে বলে মনে হয়, যা তাকে ছকবাঁধা সমাজের ত্রুটিগুলি দেখতে সাহায্য করেছিল।
৩। গল্প: ছুটি
এই গল্পে এক অত্যন্ত দুরন্ত বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলের সমস্যাগুলি দেখানো হয়েছে। প্রবলভাবে শাসিত ও কটূক্তির শিকার এই ছেলেটি নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করে। নিজের হীনতা তাকে ‘মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়’। এই গল্প 'এডিএইচডি'র 'রিজেকশন সেনসিটিভ ডিসফোরিয়া' এবং অন্যান্য ট্রমাটিক ঘটনাবলির জীবনযাত্রা তুলে ধরে।
৪। গল্প: বলাই
এই গল্পে সরাসরি নিউরোডাইভার্সিটির ধারণার একটা আভাস পাওয়া যায়। কিছু কিছু মানুষের সবদিক ছাপিয়ে একটা দিকের প্রাবল্য বেশি হয়। যেরকমটা দেখা যায় অটিজম স্পেকট্রামে। এইসব মানুষের কগনিটিভ প্রোফাইল অসমান হয়। অর্থাৎ কোনও কোনও বিষয়ে প্রবল সামর্থ, আবার কোনও বিষয়ে অতি দুর্বলতা। বলাইয়ের স্বভাব নড়ে চড়ে বেড়ানো নয়। সে স্থির হয়ে বসে থাকে আর সবকিছু দেখে, পর্যবেক্ষণ করে। তার এমন অনেক অনুভূতি আছে, যেগুলো সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। যেমন পাহাড়ের ঢাল দেখে তার এমন একটা বিশেষ অনুভূতি হতো (গড়িয়ে চলা খেলা), যেটা সে ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে পারত না। এই ছেলেটি বেশি কথা বলতে পারত না, কিন্তু মনে মনে সে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকত প্রকৃতিকে দেখতে, অনুভব করতে। এই ছেলেটি ছবিতে চিন্তা করে (থিঙ্কিং ইন পিকচারস)। গাছপালা ছিল তার ‘স্পেশাল ইন্টারেস্ট’। গাছেদের ভিতর সে খুঁজে পেত অনেক চরিত্র। সে বুঝতে পারত না, ছেলের দল কেন গাছের ডাল ভেঙে দিয়ে চলে যায়। কিংবা ঘাস ‘আগাছা’ কেন লোক ডেকে কাটিয়ে ‘পরিষ্কার’ করে দেওয়া হয়। এগুলি তাঁকে যন্ত্রণা দিত। এই গল্পে ‘হাইপারফিক্সেশন’-এর গভীরতা কতখানি, তা বোঝা যায়। সর্বদা নীচের দিকে তাকিয়ে থাকা এই ছেলেটির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা (ডিটেইল ওরিয়েন্টেড থট) অতি প্রবল। যখন সে একদিন আবিষ্কার করে চলার রাস্তার মাঝখানে এক শিমুল গাছের চারা বেরিয়েছে, তখন তার জীবনের ধ্যান জ্ঞান হয়ে যায় ওই গাছটি। যখন ছেলেটি বড় হয়, সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে সেই সুযোগে গাছটি কেটে দেওয়া হয়, যা বলাইয়ের জীবনে ভীষণ বেদনাদায়ক ‘ট্রমা’ ছিল। বলাই গল্প পড়লে মনে হয়, এটি কোনও সেমি-স্পিকিং অটিস্টিক মানুষের গল্প।
৫। গল্প: সুভা
সুভা ভাষাগত প্রতিবন্ধী, চলতি কথায় বোবা। এই গল্পটি ঠিক নিউরোডাইভার্সিটিকে প্রতিফলিত না করলেও, একজন ভাষাহীন ব্যক্তিকে কী কী সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মা তাঁকে নিজের একটা ত্রুটি হিসেবে দেখতেন। সমবয়সিরা তাঁকে ভয় পেত, এড়িয়ে চলত। প্রকৃত বন্ধু বলতে সে শুধু পশুপাখিদের পাশে পেয়েছিল।
৬। গল্প: গিন্নি
আজকাল আমরা জেন্ডার স্টিরিওটাইপ, জেন্ডার ফ্লুয়িডিটি, জেন্ডার ডাইভার্সিটি নিয়ে লেখালেখি করি। জেন্ডার স্টিরিওটাইপের খাপে যদি কোনও বাচ্চা খাপ খাওয়াতে না পারে, তার কী পরিণতি হয়, তা নিয়ে এই গল্পে আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষকদের ছোট ছোট ইয়ার্কি কীভাবে ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের কাছে 'ট্রমা'র কারণ হতে পারে, সেটাও এই গল্পে দেখানো হয়েছে। এই গল্পে এক শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের নানা বিকৃত নামকরণ করতেন এবং ওইসব নাম বাকি শিক্ষার্থীদের কাছে বলে বেড়াতেন। আপাতদৃষ্টিতে রসিক এই শিক্ষক মহাশয়ের রসিকতা শিশুদের আত্মবিশ্বাসে বড় ঘা দিতো। যাকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, মানুষ 'সোনার চেয়ে বানি এবং প্রাণের চেয়ে মান'কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এখানে মান অর্থে ‘ডিগনিটি’। সবথেকে বড় কথা, এই গল্পে শিশুদের শিশু হিসেবে নয়, বরং অনুভূতিশীল মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই গল্পে জাজমেন্টাল হওয়া, বাচ্চার ‘প্রাইভেসি’কে ভেদ করে এক বাচ্চার বিকৃত নামকরণ বাকিদের কাছে বলে বেড়ালে তার কী প্রভাব হয়, তা উল্লেখ করা আছে। গল্পটির অন্তত দু'জায়গায় শিশুর নিজের প্রতি ঘৃণা করার প্রবণতার কথা উল্লেখ আছে। এই গল্পে আশু নামে একটি ছোট ছেলে তার বোনের সাথে পুতুল খেলায় ওই শিক্ষক মহাশয় তার নামকরণ করেন ‘গিন্নি’। আশু খুব ঠেকে শেখে, যে সমাজে 'মেয়েদের খেলা' ছেলেদের খেলতে নেই। বাচ্চারা যে ‘বিশেষ’ বা কেউকেটা, 'প্রিভিলেজড' হিসেবে পরিগণিত হতে চায় না, সবার মতোই বাঁচতে চায়, এটা স্পষ্ট হয় যখন দাসী আশুর জন্য টিফিন নিয়ে আসে। এই গল্পে চাইল্ডহুড ট্রমার একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
পরিশেষে মনে হয়, এই ধরনের সামাজিক অন্ধকার থেকে আমরা এখনও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। অথচ এই বিষয়গুলি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বহু বছর আগেই লিখে গেছেন, যা নিয়ে আজ সারা বিশ্বজুড়ে চর্চা ও আলোচনা চলছে।
(লেখক একজন অটিস্টিক ব্যক্তি, তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পিএইচডি করছেন। মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।)