
শেষ আপডেট: 22 January 2019 21:10
অগ্নিযুগের ভারতবর্ষের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলা। এদেশে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদ বীজ থেকে মহীরুহে পরিণত হয়েছিল এই বাংলাতেই। বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ', স্বামী বিবেকানন্দের 'স্বদেশমন্ত্র' ভারতবর্ষের যুব সমাজকে উদ্বেল করল। 'বন্দেমাতরম' মন্ত্রে মুখরিত আকাশ বাতাস। আন্দামানের সেলুলার জেলের কাল কুঠুরিতে যে তরতাজা যুবকদের জীবনের উজ্জ্বলতম দিনগুলো অতিবাহিত হল, ফাঁসির মঞ্চে যারা জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে ভারত মাতার স্বাধীনতার জন্য শহিদ হলেন, যে মা তার কোল খালি করে ছেলেটাকে অনুশীলন সমিতিতে পাঠালেন, যে স্ত্রী তরুণ স্বামীকে অস্ত্রাগার লুন্ঠনে পাঠালেন, যে শিশুর জন্মের আগেই ইংরেজ হাকিমের আদেশে তার বাবার ফাঁসি হয়ে গেল - তাদের মধ্যে বেশির ভাগ নামই ছিল বাংলার।
ক্ষুদিরাম বসুর মতো কত না ফোটা ফুল প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই বলিদান হয়ে গেল। সুভাষ চন্দ্র বসু আই সি এস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান পেলেন। ইংরেজের চাকরি পায়ে ঠেলে দেশমাতৃকার কাজে নিজেকে নিবেদন করলেন। কারাবরণ করলেন, মান্দালয়ের অস্বাস্থ্যকর সেন্ট্রাল জেল থেকে অসুস্থ মৃতপ্রায় হয়ে বের হলেন। তারপরে ভিয়েনা, আবার ভারত,
আবার দেশের জন্য আজাদ হিন্দ ফৌজ।
কিন্তু যেদিন ভারতবর্ষ স্বাধীন হল, দেশবাসী গাইছিল “বিনা খড়্গে, বিনা ঢালে” পাওয়া গিয়েছে আজাদি, সেদিন বাংলার মায়েরা নিজেদের ইজ্জত আর স্বামী বা পুত্রের প্রাণ বাঁচানোর কথা ভাবছিলেন। দিল্লিতে মসনদ নিয়ে যখন নেতারা ব্যস্ত, তখন শিয়ালদহ স্টেশনে বাঙালি ভাবছে একটু আশ্রয় আর এক মুঠো ভাতের কথা।
স্বাধীন ভারতের শাসককুল বাংলাকে তার ত্যাগের মূল্যের কানাকড়িও দেয়নি। গোপালকৃষ্ণ গোখলে একদিন বলেছিলেন, “বাংলা যা আজ ভাবে, ভারতবর্ষ তা কালকে ভাববে।” সারা ভারতবর্ষ থেকে দেশভক্ত যুবকেরা কলকাতা আসতেন স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিপ্লবের পাঠ নিতে। কলকাতা থেকে নাগপুর পর্যন্ত যেমন বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে (বি এন আর) চলত, তেমন সশস্ত্র সংগ্রামের প্রশিক্ষণ,উপাদানের সতত প্রাবাহিত স্রোত চলত বাংলা থেকে মধ্য ভারতে।
বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, প্রশান্ত চন্দ্র মহালনবীশ জগৎ বিখ্যাত হয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ছাড়া কি ভারতবর্ষের অস্তিত্ব সম্ভব? কলকাতা থেকে চন্দননগর, গঙ্গার দুই ধার জুড়ে শোনা যেত কলকারখানার ঝমাঝম শব্দ। কিন্তু স্বাধীন ভারতবর্ষের আর্ধেক বাংলা, পশ্চিমবঙ্গ, কেবল দয়ার পাত্র হয়ে থাকল। এই অবজ্ঞা বাংলার আত্মশক্তিকে ভুলিয়ে দিল। তেজস্বী, আত্মসম্মানসম্পন্ন বাঙালি কেবল কর্তাভজা চাটুকারে পরিণত হল। তার পরের বাম জমানার কয়েক দশকে বাংলা নিজের সমাজকে হারাল। সমাজের স্থান নিল রাজনৈতিক দল। দল আর ক্ষমতা, ক্ষমতার জন্য নৃশংসতা,খুন আর প্রলোভন। শিল্পহীন, কর্মহীন, শিক্ষাহীন বাংলার আত্মসম্মানও বোধহয় হারিয়ে গিয়েছে। দুর্নীতির টাকা নিয়ে কোনও ব্যক্তি,কোনও ক্লাব বলে না টাকা কেন দিচ্ছেন? এত টাকা কোথা থেকে এল? তাই মানুষের দাম অনেক কমে গিয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে, প্রয়োজনে খুনও করতে হবে। গত পঞ্চায়েতে শতাধিক মানুষ খুন হলেন। অথচ রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ বা ছত্তীসগড়ে ক্ষমতার পরিবর্তন হল, কত জন খুন হলেন? এটাই আজকের পশ্চিমবঙ্গ!
এই দুঃখিনী, হতশ্রী, নিষ্ঠুর, দাসসুলভ দুর্বল বাংলার শুরুটা কোথায়? আজ বোধহয় ফিরে দেখার প্রয়োজন। আজ কোথাও যেন মনে হচ্ছে বাংলা মায়ের দরিদ্র বেশ, মলিন হাসি মিলিয়ে, জ্যোতির্ময় রূপ প্রকাশ পাচ্ছে। খোলস ভেঙে বের হচ্ছে সত্য। ২০১৯ সালের ২৩শে জানুয়ারি।
১৯৫৬ সালে স্বাধীন ভারতে এলেন ব্রিটেনের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল তখন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি পি সি চক্রবর্তী। অ্যাটলি ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ছাড়পত্র তিনিই দিয়েছিলেন। সেদিন অ্যাটলি রাজ্যপাল শ্রী চক্রবর্তীকে বললেন, মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলন বা অহিংস সত্যাগ্রহের জন্য নয়, ইংরেজ ভারত ছেড়েছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জন্য। আজাদ হিন্দ ফৌজের আক্রমণ আর তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে সংঘটিত হওয়া নৌবিদ্রোহ। অ্যাটলি ইংল্যান্ডের সভায় বলেছিলেন, এরপরেও কোন মা ভারতে নিজের ছেলেকে পাঠাবেন? সেদিন সুভাষচন্ত্রই ছিলেন ভারতের ন্যাচারাল চয়েস। ১৯৩৩ সালে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নিজের ভাই বিঠঠল ভাই পটেল সুভাষচন্দ্র বসুকে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা উইল করে দিয়ে যান। ১৯৩৯ সালে ২ এপ্রিল সুভাষচন্দ্রকে লেখা চিঠিতে গান্ধীজি আক্ষেপ করেছিলেন, “কংগ্রেসের মধ্যে থাকা ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়ে হয়তো আমরা একমত নই। আমি মানছি যে দুর্নীতি বাড়ছে। গত কয়েক মাস ধরে আমি বলছি যে এর আমূল তদন্ত প্রয়োজন।” চিঠি শেষে গান্ধীজির অকপট স্বীকারোক্তি “তোমাকে তো বলেছি, আমি একজন বুড়ো মানুষ, হয়তো ধীরে ধীরে ভীতু আর অত্যাধিক আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছি, তোমার সামনে তারুণ্য আর তারুণ্যের থেকে উদ্ভুত প্রত্যাশা। আশা করি তুমি সঠিক আর আমি ভুল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি সফল হবে।” সেদিন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী মুক্তকণ্ঠে বাংলার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বীরের জয়ধ্বনি করেছিলেন, বাকি ছিল শুধু অভিষেকের দিনক্ষণ।
বাংলার সেই জনগণমন অধিনায়কের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দুই শক্তি। প্রথম তো অবশ্যই পণ্ডিত নেহেরু আর তার সহযোগিতায় লিপ্ত কংগ্রেস নেতৃবৃন্ধ। দ্বিতীয়ত কমিউনিস্ট পার্টি। যখন নেতাজি সুভাষ আন্দামান আর নিকোবর দ্বীপে স্বাধীন ভারতের পতাকা উড়িয়েছেন, যখন আই এন এ মনিপুরের মইরাঙে ব্রিটিশ সেনাকে পরাজিত করে ভারতের ভূখণ্ডে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন জওহরলাল নেহরু বললেন, “যদি সুভাষ বহিরাগত সেনা নিয়ে দেশে প্রবেশ করে, তবে আমিই সর্বপ্রথম তার বিরুদ্ধে খোলা তরবারি নিয়ে বিরোধিতা করব।” কত স্পষ্ট আর নিষ্ঠুর বক্তব্য। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ছিল ‘পিপলস ওয়ার’। ওই কাগজে ১৯ জুলাই ১৯৪২ তারিখে একটা জঘন্য কার্টুন ছাপা হল। সেখানে নেতাজি সুভাষ জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজোর কুকুর। ওই পত্রিকার ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ তারিখের সংখ্যায় এস ভি সরদেশাই, ১৮ জুলাই ১৯৪৩ তারিখে জি অধিকারী লাগাতার নেতাজি সুভাষের নামে মিথ্যে কুৎসা ছড়িয়েছেন। বাংলার এই মহাবীরের বিরুদ্ধে এঁদের অপপ্রয়াস কালের প্রহসনে সফল হল। হিরোসিমা আর নাগাসাকির অমানবিক ঘটনাতে হেরে গেল অক্ষশক্তি। নিজের মতো করে ইতিহাস লেখার সুযোগ পেল মিত্রশক্তি।
স্বাধীনতার আগে নেতাজি সুভাষের সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার কংগ্রেস আর কমিউনিস্ট পার্টি করেছিল তার মাত্রা কয়েকগুন ছাড়িয়ে গেল দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে। আজ সারা পৃথিবীর কাছে পরিষ্কার যে তাইহকু বিমান দুর্ঘটনাতে নেতাজির মৃত্যু হয়নি। তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আজ অনেকে দাবি করছেন যে নেতাজির শেষ কটি দিন রাশিয়ার সাইবেরিয়ার কারাগারে কেটেছে। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে নেহরু নিজেও জানতেন সে কথা। ১৯৫১ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির যে সব পলিটব্যুরোর সদস্য রাশিয়ায় স্তালিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তাঁরাও সম্ভবত এ কথা জানতেন। যে আজাদ হিন্দ বাহিনী দেশের স্বাধীনতার জন্য সব থেকে বেশি বলিদান দিয়েছে, তাদের সৈন্য ভর্তি ট্রেন কলকাতায় না এনে করাচিতে পাঠানো হল। পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁদেরই যাঁরা নেতাজির সঙ্গে নিষ্ঠুর বেইমানি করেছিলেন।
শাহনওয়াজ খানের কমিটি জীবিত নেতাজিকে মৃত ঘোষণা করল। সত্যি যদি তখন রাশিয়ায় বন্দি থাকতেন নেতাজি, তাহলে এই কমিটির ঘোষনাই তার দেশে ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দিল। পরে এই শাহনওয়াজ চার বার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন। ফুড কর্পোরেশনের মতো দফতরের চেয়ারম্যানও হয়েছেন। এমনই আরেকজনের কথাও শোনা যায়। তাঁর নাম সি আর ডামলে। এই আইসিএস অফিসার নাকি নেহরুর নির্দেশে জাপান থেকে তিন ট্রাঙ্ক ভর্তি আজাদ হিন্দ ফৌজের সম্পদ কোনও রকম কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই ভারতে এনেছিলেন। ইনিও পরে দুবার গোয়ার রাজ্যপাল হয়েছিলেন। নেতাজি সুভাষের বুকের রক্ত জল করা তিল তিল করে সংগ্রহ করা অর্থ কোথায় খরচ হল, কে বা কারা খরচ করল সে কথাও জানা যায় না।
স্বাধীন ভারতের শেষ সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কাশ্মীরে মারা যান শ্যামাপ্রসাদ। অভিযোগ ওঠে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে বাঙালি ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে বাঙালির অপরিসীম অবদান, সে কথা ধীরে ধীরে দেশের মানুষকে ভোলানোর চেষ্টা হল। ১৯৭৩ সালের ১৫ আগস্ট ইন্দিরা গান্ধী লালকেল্লার পরিসরে একটি তামার ক্যাপসুলে ‘কালপত্র’ বলে ভারতবর্ষের ১০০০ বছরের যে ইতিহাস পুরেছিলেন তাতে কেবল নেহরু পরিবারের কথা ছিল। সেটাই নাকি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস।
১৯৯৯ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার প্রথম বার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রকৃত খোঁজ করলেন। বিচারপতি মনোজ কুমার মুখোপাধ্যায় কমিশনই হল স্বাধীন ভারতের প্রথম কমিশন যারা ভারতবর্ষের বাইরে দিয়ে তদন্ত করেছিলেন। তদন্তে উঠে এল নেতাজি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি। মুখোপাধ্যায় কমিশনে কলকাতার অধ্যাপিক পুরবী রায় এবং অধ্যাপক হরি বাসুদেবন ছিলেন। তাদের গবেষণা নেতাজির বিষয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
এরপর আবার কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে চেষ্টা করেছে জাপানের রেনকোজি মন্দিরের চিতাভস্মকে দেশে আনার। আবার সব কিছু গুলিয়ে দেওয়ার কারসাজি। কিন্তু মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত স্ত্রী এমিলি রাজি হননি। তারপরে মেয়ে অনিতা বলেছে ডিএনএ পরীক্ষা না করে অস্থিভস্ম আনা যাবে না। ফলে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেসের অসাধু প্রচেষ্টা।
কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার আসার পরেই নেতাজি সংক্রান্ত গোপন ফাইল প্রকাশ হতে থাকে। ২০১৬ সালের পর থেকে বহু বছরের সরকারি অবজ্ঞা আর লাঞ্ছনার পরে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হতে থাকে নেতাজিকে। নেতাজির সংক্রান্ত সব ফাইল গোপন করেছিল কংগ্রেস। অতি স্পর্শকাতর ফাইলগুলো সম্ভবত নষ্টই করে ফেলেছিল এত বছর কেন্দ্রে ক্ষমতাতে থেকে। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে পরপর নেতাজি সংক্রান্ত গোপন ফাইল প্রকাশ করা হচ্ছে। ভারত সরকারের ন্যাশানাল আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া থেকেwww.netajipaper.gov.in পোর্টালের মধ্যামে তা সর্বসাধারণের জন্য আপলোড করা হয়েছে।
যখন কমিউনিস্টরা নেতাজিকে তোজোর কুকুর বলছেন, নেহেরু বলছেন বিদেশিদের সঙ্গে নিয়ে নেতাজি ভারতে প্রবেশ করলে তিনি তরোয়াল হাতে তাঁদের প্রতিহত করবেন, সেই সময় নেতাজি বিদেশে থাকা ভারতীয়দের নিয়ে জীবনবাজি রেখে ইংরেজের সঙ্গে লড়াই করছেন। ১৯৪৭ সালের চার বছর আগেই স্বাধীন ভারত সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। রেঙ্গুনে আজাদ হিন্দ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল স্বাধীন ভারতের মুদ্রা ও ডাকটিকিট।
আজ ৭৫ বছর পরে কোনও ভারত সরকার তার স্বীকৃতি দিল। সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকারই যে প্রথম স্বাধীন সরকার, যার প্রধান নেতাজি সুভাষ প্রথম ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। প্রথা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লাতে জাতীয় পতাকা তুললেন, যা কেবল ১৫ অগস্ট তোলার রীতি। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী এসে প্রমাণ করলেন যে সরকার মনে করে যে আজাদ হিন্দ সরকারই প্রথম স্বাধীন ভারতীয় সরকার। ২০১৮ সালের ২১ অক্টোবর ভারতবর্ষের ইতিহাসে তাই এক নতুন অধ্যায় শুরু হল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর টুপি পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন।
গত বছর ৩১ ডিসেম্বর বাঙালির আত্মসম্মানের ইতিহাসে আরও একটি গৌরবময় দিন। ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছিল। আন্দামান আর নিকোবর দ্বীপের নাম নেতাজি দিয়েছিলেন শহিদ দ্বীপ ও স্বরাজ দ্বীপ। সেই মহামানবের বীরত্বকে স্মরণ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রোজ আইল্যান্ডের নাম নেতাজি সুভাষ বোস দ্বীপ, নীল আইল্যান্ডের নাম দেন শহিদ দ্বীপ আর পৃথিবীর প্রথম দশটি সমুদ্র সৈকতের মধ্যে অন্যতম দ্বীপ হ্যাভলকের নাম দেন স্বরাজ। নেতাজি সুভাষের এই অভিনব স্মরণ অনুষ্ঠানে যেমন নেতাজি পরিবারের অনেকে উপস্থিত ছিলেন তেমনই কলকাতার বটুকেশ্বর দত্তের পরিবার থেকে গিয়েছিলেন মেয়ে ভারতী বাগচী। সেলুলার জেলের দেওয়ালে যে বাংলার অগ্নিযুগের অগণিত বিপ্লবীদের নাম লেখা, যাঁদের রক্ত পরিশ্রম আর স্বপ্নের ফসল আজকের স্বাধীনতা। এত বছর পর যেন বাংলার সেই সম্মানকে নতমস্তকে স্বীকার করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
নেহরু যখন নেতাজির বিরুদ্ধে খোলা তলোয়ার নিয়ে বাধা দিতে চেয়েছিলেন তখন অপ্রতিরোধ্য আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের উত্তর পূর্বে দেশের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে গেছে। হারিয়ে দিয়ে বিতাড়িত করেছে ইংরেজকে। ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল মনিপুরের মইরাঙে আজাদ হিন্দ ফৌজের পক্ষ থেকে কর্নেল সওকত মালিক ত্রিবর্ণ পতাকা তোলেন। ১৯৪৫ সাল অবধি ইম্ফল থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার দূরের এই শহর আজাদ হিন্দ বাহিনীর হাতেই ছিল। ২০১৯ সালটা নেতাজির মইরাঙ জয়েরও ৭৫ বছর। তাই এ বছর ১৪ এপ্রিল সেখানে কয়েক হাজার দেশভক্ত মানুষকে নিয়ে যাবে ফোরাম ফর অ্যাওয়ারনেস অফ ন্যাশানাল সিকিউরিটি নামে একটি সংস্থা। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রবীন প্রচারক ইন্দ্রেশ কুমার থাকবেন তার পুরোধায়। সেটাও হবে এক নতুন অধ্যায়।
মুখোপাধ্যায় কমিশন গবেষণা করে জানিয়েছিল, তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনাতে মারা যাননি নেতাজি। ছ মাস আগে থেকে ছ মাস পর পর্যন্ত তাইপেয়িতে কোনও বিমান দুর্ঘটনাই হয়নি। ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান সরকার নেতাজির লুকোন ফাইল প্রকাশ শুরু করেছে।
২১ অক্টোবর লালকেল্লায় ভাষণ, ৩০ ডিসেম্বর আন্দামানে সম্মানপ্রদান বাংলার মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। স্বাধীন ভারতে একটি পরিবারের শাসন দেশের পরাধীনতার মুক্তিতে বাংলার অপরিসীম ত্যাগকে মুছে দিতে চেয়েছে। এত বছর পরে বাংলা যেন তার প্রাপ্য সম্মান পেতে শুরু করেছে। তাই এবারে ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ আর স্মরণীয়।
“তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর তুমি পূর্ণ কর।” আজকে প্রৌঢ়ত্বের আঙিনাতে আসা বাঙালি আশৈশব এই লেখা পড়ে বড় হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ জানতে চায় কেন রাশিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা গেল না নেতাজি সুভাষকে? কার জন্য? কার পাপে?
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লেখেন।