
শেষ আপডেট: 19 October 2021 08:06
প্রশ্নটা এর জন্য উঠছে কারণ কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সেলিব্রিটি আমাদের ভুল বোঝাচ্ছিলেন। বিষয়টা ছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের। বাংলাদেশ থেকে প্রাণ বাঁচাতে, স্ত্রী-কন্যার সম্মান বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দুরা সম্মানজনক নাগরিকত্ব পেতেন এই আইনের বলে।
এই বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বহু টাকা ব্যায়ে তারকা শিল্পীদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল উপস্থাপনা, "আমরা অন্য কোথাও যাবো না।" বাংলার ইতিহাসে মিথ্যাকে শিল্পের মোড়কে পরিবেশনের নিষ্ঠুরতম দলিল হয়ে থাকবে সেটি। বাংলাদেশ-সহ (bangladesh) সর্বত্র হিন্দু বাঙালির অস্তিত্ব যত বিপন্ন হবে দুই বাংলার মানুষ ততবার চরম ঘৃণার সঙ্গে ওই মিথ্যাকে স্মরণ করবেন।
কঙ্কালীতলায় ৫১ কন্যা পূর্ণ করেন খন্ডিত সতীকে, এই কুমারীপুজোয় জড়িয়ে প্রাচীন কাহিনি
বিগত দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় হিন্দুদের উপর অত্যাচার হয়েছে। নিরীহ হিন্দু খুন হয়েছেন, দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙা হয়েছে, ইসকনের মন্দির, রামঠাকুরের আশ্রম, রামকৃষ্ণ মিশন-সহ সব মঠ মিশনের উপর আক্রমণ হয়েছে। তিন শতাধিক ছোট বড় মন্দিরে ভাঙচুর হয়েছে। হিন্দুদের ঘরে ঘরে ঢুকে লুঠপাট হয়েছে, গণধর্ষণ হয়েছে।
এই নিদারুণ অত্যাচারের দিনেও ওইসব শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, পরিচালক একটি কথাও বলেন নি। যেন ভোটের পরে তাঁদের নাটকের কনট্রাক্ট শেষ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ২৫টি জেলায় এবছর হিন্দুদের বিরূদ্ধে হিংসার ঘটনা ঘটেছে। সেই সবকটি স্থানেই কোনও না কোনও হিন্দু স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম পাওয়া যাবে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, বিপিনচন্দ্র পাল, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বাঘাযতীনের মত অগনিত হিন্দু বাঙালি বিপ্লবীর জন্যই ভারতের স্বাধীনতা এসেছে। তাই সমগ্র ভারতবর্ষের দায়িত্ব এটা দেখা, তাঁদের জন্মস্থানে যেন তাঁদের সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন না হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রবুদ্ধ মানুষ যদি বুঝেও না বোঝার ভান করেন তবে তাঁদের এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে। কারণ জেহাদি মৌলবাদ এ বাংলাতেও ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। নোয়াখালির ইসকন মন্দিরের ভক্ত পার্থ দাসেরও অধিকার ছিল তাঁর জন্মভূমিতে বেঁচে থাকার।
আমি বারবার অন্য কোথাও যাবো না বলছি কেন, সেটা একটু বলা বোধহয় প্রয়োজন। বিগত ৭০-৮০ বছরে আমাদের হিন্দু বাঙালির প্রায় ২০% অন্য কোথাও যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ হিংসার বলি হয়েছেন, কেউ ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ বাঁচার জন্য দণ্ডকারণ্য, মালকান গিরি বা আন্দামানে পালিয়েছেন। ১৯৪১ সালের আদমশুমারীতে ব্রিটিশ বেঙ্গলে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৪২ শতাংশ। এর সঙ্গে কোচবিহারের মতো দেশীয় রাজ্যের জনসংখ্যা যোগ করলে অখন্ড বাংলায় প্রায় ৪৭ শতাংশ হিন্দু ছিল। ২০১১ সালের আদমশুমারীতে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ২৫ কোটি ৪৫ লক্ষ। তার মধ্যে হিন্দু কমে হয়েছে ৩১ শতাংশ। এবছর ২০২১ সালের আদমশুমারী আরও ভয়ানক চেহারা নিয়ে আসছে। এই ৭০-৮০ বছরে প্রায় ২০% বাঙালি হিন্দু অন্য কোথাও যেতে বাধ্য হয়েছে।
আমি হিন্দু বাঙালির কথা বারবার বলছি কারণ এটা আমার সংস্কৃতি। নজরুল ইসলামকে, সৈয়দ মুজতবা আলির মতো মনীষীকে নিয়ে আমি গর্ব করি, কিন্তু শ্রীচৈতন্যদব বা স্বামী বিবেকানন্দকে আমি ছাড়তে পারবো না। আমাকে দুর্গাপুজো করতে দিতেই হবে। আমি বাঙালি হিন্দু, আমারও বাঁচার অধিকার আছে। আমার পূর্বপুরুষের বাসভূমি ছেড়ে আমি অন্য কোথাও যাবো না!
এবছর নোয়াখালি দাঙ্গার ৭৫ বছর পূর্ণ হবে। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে এমনই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে হিন্দুদের উপর হিংস্রতা দেখেছিল বাংলা।
৭৫ বছর পরে অন্তত নিজের বুকে হাত রেখে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলি, "আমরাও অন্য কোথাও যাবো না"। এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে ২৯ শতাংশ থেকে বাঙালি হিন্দু নিশ্চিহ্ন হতে হয়তো ৭৫ বছর সময়ও লাগবে না।
মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব
লেখক সাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস লেখেন।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'