
শেষ আপডেট: 18 June 2022 11:27
ইংল্যান্ড তখন শাসন করছিলেন রাজা স্টিফেন। শরতের এক সকাল। ইংল্যান্ডের সাফোক কাউন্টির উলপিট গ্রামের লোকজন মাঠে নেমে পড়েছিলেন ধান কাটতে। গ্রামের অদূরে জঙ্গল। সেখানে নেকড়ের বাস(Green Children) তাই ওই জঙ্গলে গ্রামবাসীরা কেউ যেতেন না। হঠাৎ সেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছিল দুটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে। তা দেখে একজন গ্রামবাসী আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিলেন। চাষের কাজ ফেলে সবাই দৌড়ে এসেছিলেন।
গ্রামবাসীরা এর আগে এরকম মানুষ দেখেননি। ছেলেটির বয়স বছর সাতেক আর মেয়েটি নয়ের কাছাকাছি। তাদের পরনে ছিল অদ্ভুত পোষাক এবং তাদের গায়ের রঙ ছিল সবুজ। উলপিট গ্রামের মানুষ কালো, সাদা আর তামাটে মানুষ দেখেছেন। তাই সবুজ রঙের মানুষ দেখে তাঁরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এত মানুষ দেখে শিশু দু’টিও আতঙ্কে লুকিয়ে পড়েছিল পাথরের আড়ালে।
[caption id="attachment_2484899" align="aligncenter" width="600"]
উলপিট গ্রাম[/caption]
কেউ কেউ বলেছিলেন শিশুদুটি শয়তানের ছেলে মেয়ে, তাদের মেরে ফেলা উচিত। তীর ধনুক নিয়ে প্রস্তুত হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই মুহুর্তে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন গ্রামেরই এক মাঝবয়সী মহিলা। ভয়ে কাঁপতে থাকা শিশুদুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। হাতে থাকা কাস্তে দেখিয়ে মহিলা হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন গ্রামবাসীদের। বলেছিলেন শিশুদুটিকে মারতে এলে মরতে হবে। মহিলাটির রুদ্রমূর্তি দেখে পিছিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা।
বুকে আগলে শিশুদুটিকে মহিলা নিয়ে এসেছিলেন নিজের বাড়ি। অদ্ভুত দর্শন শিশুদুটিকে ভীষণ ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। মহিলা তাদের খাবার দিয়েছিলেন। কিন্তু শিশুদুটি খেতে চায়নি। খাবার হাতে নিয়ে একবার শুঁকে হাত থেকে নামিয়ে রেখেছিল। শিশুদুটি কী একটা দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছিল। যা গ্রামবাসীদের কেউ বুঝতে পারছিলেন না। অগত্যা মহিলাটি শিশুদুটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় জমিদার স্যার রিচার্ড ডি কেন-এর বাড়ি। জমিদারের লোকেরা বিভিন্ন খাবার শিশুদুটির সামনে এনে রেখেছিলেন, যেটা পছন্দ সেটা যদি খায়। কিন্তু শিশুদুটি সেই খাবারও ছোঁয়নি। বিপদে পড়েছিলেন জমিদার সহ গ্রামবাসীরা। না খেয়ে ক্রমশই দূর্বল হয়ে পড়ছিল শিশুদুটি।
কয়েকদিন পর শিশুদুটির চোখে পড়েছিল জমিদারের বাগানে থাকা শিমগাছটি। ছুটে গিয়ে গাছ থেকে শিম ছিঁড়ে তারা গোগ্রাসে গোটা গোটা শিম খেতে শুরু করেছিল। উদ্ধারকারী মহিলা শিশুদুটিকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে শিমের বীজ খুলে খেতে হয়। এরপর বেশ কিছুদিন ধরে শিশুদুটি কেবল শিমের বীজই খেয়েছিল। কিন্তু ছোট ছেলেটি দিন দিন রোগা আর অসুস্থ হয়ে যেতে শুরু করেছিল। তার মনমরা ভাব কিছুতেই কাটছিল না। কিছুদিনের মধ্যেই দিদির কোলে মাথা রেখে মারা গিয়েছিল ভাইটি।
[caption id="attachment_2484902" align="alignnone" width="600"]
শিল্পীর কল্পনায় শিশুদুটি[/caption]
কারও কথা শুনত না বালিকাটি। মহিলাটি ছাড়া অন্য কেউ তার কাছে গেলেই হাতের কাছে যা পেত তাই ছুঁড়ে মারত। নিজের পরিবার ও সন্তানদের ভুলে মহিলাটি রাতদিন বসে থাকতেন বালিকাটির পাশে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। বালিকাটির চোখের নীচে লেগে থাকা জলের দাগ পরম মমতায় নিজের কাপড় দিয়ে মুছিয়ে দিতেন।
গ্রাম্য মহিলাটির অক্লান্ত পরিশ্রমে বেঁচে গিয়েছিল বালিকাটি। শিমের বীজের পাশাপাশি অন্যান্য খাবারও সে ধীরে ধীরে খেতে শুরু করেছিল। কয়েক মাসের মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছিল বালিকাটির গায়ের সবুজ রঙ। তার গায়ের রঙ হয়ে উঠেছিল আর পাঁচটা ইউরোপীয় মানুষদের মতোই। জমিদার মেয়েটিকে ইংরেজি ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। পরিবেশের সাথে কোনওমতে খাপ খাইয়ে নিলেও মেয়েটি সারাক্ষণ উদাসীন থাকত। কোনও কাজেই যেন তার মন ছিল না। একমাত্র সেই গ্রাম্য মহিলাটিকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠত।
বালিকাটি ইংরেজিতে কথা বলা শেখার পর, সন্ধান মিলেছিল এক গভীর রহস্যের। তাকে তার অতীত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, বালিকাটি গ্রামবাসীদের শুনিয়েছিল এক অদ্ভুত কাহিনী। সে আর তার ভাই নাকি এসেছিল একটি কুয়াশাচ্ছন্ন অঞ্চল থেকে। যেখানে সূর্যের আলো ছিল গোধূলির মতো নরম। সেখানকার সব মানুষের গায়ের রঙ ছিল সবুজ। বালিকাটি বলেছিল, তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এক নদীর কথা।
দুই ভাইবোন একদিন তাদের হারিয়ে যাওয়া গরু খুঁজতে নদীটির পাশে থাকা ফসলের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। হঠাৎ পাশের পাহাড়ের গুহা থেকে এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়েছিল তারা। শব্দের উৎস খুঁজতে দুজনে গুহায় ঢুকেছিল। কিন্তু গুহার অলিগলিতে হারিয়ে গিয়েছিল ভাইবোন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে গুহার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তারা এক সময় গুহার অন্য প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রখর সূর্যের আলোতে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। হতবুদ্ধি অবস্থায় চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ গুহার মুখে শুয়ে ছিল শিশুদুটি। কৃষকদের ক্ষেতে কাজ করার শব্দ শুনে সেদিকেই হাঁটতে শুরু করেছিল তারা। এভাবেই এসে পৌঁছেছিল উলপিট গ্রামে।
সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন উলপিট গ্রামের লোকজন। জমিদারের নির্দেশে সবুজ চামড়ার মানুষদের গ্রাম খুঁজতে বের হয়ে গিয়েছিলেন কয়েকজন ডাকাবুকো গ্রামবাসী। কিন্তু আশেপাশের কয়েকশো কিলোমিটার তন্নতন্ন করে খুঁজেও, সবুজ মানুষদের গ্রাম খুঁজে পাননি গ্রামবাসীরা।
[caption id="attachment_2484912" align="aligncenter" width="600"]
এরকমই এক গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছিল শিশুগুলি[/caption]
চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি নিয়ে শত শত বছর ধরে চলেছিল রীতিমতো গবেষণা এবং এখনও তা চলছে। গবেষকদের কেউ বলেছেন, শিশুদুটি ছিল নরফোক কাউন্টির অত্যাচারী জমিদারের আত্মীয়। অনাথ শিশুদুটিকে মেরে তাদের সম্পত্তি হাতিয়ে নেবার জন্য খাবারে আর্সেনিক মিশিয়ে দিয়েছিলেন জমিদার আর্ল। বিষের প্রভাবে শিশুদুটির গায়ের রঙ হয়ে গিয়েছিল সবুজ। কথাবার্তাও হয়ে গিয়েছিল অসংলগ্ন। পরে কারও সাহায্যে নরফোক থেকে পালিয়ে উলপিটে চলে এসেছিল শিশু দুটি। চার্লস ওমান নামে এক গবেষক তাঁর গবেষণায় বলেছিলেন, শিশুদুটিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গুহার ভিতর এবং তাদের নেশগ্রস্থ করে রাখা হত বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যে। কোনও ভাবে তারা পালিয়ে এসেছিল উলপিটে।
কোনও গবেষক বলেছেন, শিশুদুটি এসেছিল উলপিটের পাশের গ্রাম সেন্ট মার্টিন থেকে। গ্রামে যুদ্ধ লাগলে প্রাণ বাঁচাতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল পরিত্যক্ত খনির ভেতর। খনিগর্ভে লুকিয়ে থাকার সময় শ্যাওলা লেগে বদলে গিয়েছিল গায়ের রঙ। কিংবা তারা হয়ত ভুগছিল রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায়। যাকে তখন বলা হত 'গ্রিন সিকনেস'। এই রোগের সাথে তখনও অপরিচিত ছিলেন উলপিট গ্রামবাসীরা। তাই সবুজ রঙের শিশু দুটিকে দেখে আতঙ্কে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। পরে পুষ্টিকর খাবার পেয়ে ফিরে এসেছিল বালকাটির ত্বকের স্বাভাবিক বর্ণ।
[caption id="attachment_2484915" align="aligncenter" width="600"]
এরকমই ছিল ত্বকের বর্ণ[/caption]
তিনি বলেছিলেন, একাদশ-দ্বাদশ শতকে, উত্তর বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্স থেকে দলে দলে জার্মান বংশদ্ভুত ফ্লেমিশরা এসেছিল ব্রিটেনে শরণার্থী হয়ে। ওই শতকেই, ১১৭৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরি ও প্রধান বিচারপতি রবার্ট ডি বিউমন্টের মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন অসংখ্য ফ্লেমিশ। যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল সেন্ট এডমন্টবারির উত্তরে। যেখান থেকে মাত্র ১১ কিমি দূরে ছিল উলপিট গ্রাম।
পল হ্যারিস বলেছিলেন, প্রাণে বাঁচতে একটি ফ্লেমিশ পরিবার পালিয়ে এসে উলপিট গ্রামের কাছে থাকা একটি নেকড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। বাবা-মা মারা গেলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিল শিশু দুটি। একদিন গুহা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছিল তারা। দীর্ঘদিন ধরে অনাহারে থাকতে থাকতে শিশুদুটির শরীরে হাইপোক্রোমিক অ্যানিমিয়া বা গ্রিন সিকনেস হয়েছিল বলে শিশুদুটির গায়ের রঙ হালকা সবুজ হয়ে গিয়েছিল।
গ্রিন সিকনেস, ফ্লেমিশ পোশাক ও ফ্লেমিশ ভাষার সাথে উলপিট গ্রামবাসীদের পরিচয় না থাকায় তাদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। তাই তারা শিশুদুটিকে মেরে ফেলতে গিয়েছিল। পরে সুষম খাবার পাওয়ার ফলে বালিকাটির গায়ের রঙ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। আতঙ্কের মেঘ কেটে গিয়েছিল উলপিটের আকাশ থেকে।

উলপিটের সেই জমিদার, স্যার রিচার্ড ডি কেনের পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে গবেষক ডানকান লুকান ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, জমিদার পরে মেয়েটির নাম রেখেছিলেন অ্যাগনেস। খ্রিস্টধর্মে দীক্ষাও দেওয়া হয়েছিল মেয়েটিকে। জমিদারের বাড়িতে মেয়েটি থাকত। বড় হওয়ার পর জমিদার মেয়েটির সঙ্গে নরফোক কাউন্টির এক যুবকের বিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি ছিলেন রাজা দ্বিতীয় হেনরির কর্মী।
কিন্তু একই সঙ্গে গবেষক লুকান দিয়েছিলেন ঘটনাটির এক আজব ব্যাখ্যা। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডানকান লুকান বলেছিলেন, শিশুদুটি ভিনগ্রহ থেকে পৃথিবীতে এসেছিল তাদের দলের সঙ্গে। সবাই ফিরে গেলেও তারা ফিরতে পারেনি। কারণ তারা নেকড়ের গুহায় ঢুকে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। শিশুগুলির গায়ের রঙ সবুজ ছিল কারণ তাদের গায়ে উদ্ভিদের মতো ক্লোরোফিল ছিল। তাঁর মতে সেই গ্রহের সব মানুষের গায়ে ক্লোরোফিল ছিল। ঘটনাটি ঘটার হাজার বছর পরেও ঘটনাটিকে নিয়ে চলেছে, সত্য বনাম মিথ্যা, বাস্তব বনাম কল্পনা, বিজ্ঞান বনাম ইতিহাস, গবেষণা বনাম লোকগাথার দ্বন্দ্ব। তাই অগুণতি ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও আজ রহস্যের তিমিরেই রয়ে গিয়েছে উলপিট গ্রামের সবুজ শিশুরা।