Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
গীতা ও চণ্ডীতে যেভাবে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেছেন ভগবান৭ শতাংশ ফ্যাট, ৫০ শতাংশ পেশি! যে ডায়েট মেনে চলার কারণে রোনাল্ডো এখনও যন্ত্রের মতো সচলগুগল এখন অতীত, AI দেখে ওষুধ খাচ্ছেন মানুষ! বেশিরভাগ রোগ চিনতে না পেরে জটিলতা বাড়াচ্ছে চ্যাটবট 'ডাহা মিথ্যে তথ্য দিয়েছে রাজ্য', সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলার শুনানি পিছতেই ক্ষুব্ধ ভাস্কর ঘোষBasic Life Support: চলন্ত ট্রেনে ত্রাতা সহযাত্রীই! সিপিআরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন মহিলামহিলা বিল পেশ হলে রাজ্য অচলের ডাক স্ট্যালিনের, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে কেন ষড়যন্ত্র বলছে ডিএমকে আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের মহারণ! উদ্দীপ্ত এমিরেটসের কতটা ফায়দা নিতে পারবে আর্সেনাল? দ্রুত রোগা হওয়ার ইনজেকশন শেষ করে দিচ্ছে লিভার-কিডনি? ভুয়ো ওষুধ নিয়ে সতর্ক করলেন চিকিৎসকরাপ্রথম দফার ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামছে ৪০ হাজার রাজ্য পুলিশ, কোন জেলায় কত‘ভয় নেই, আমিও কারও বাবা...’ সব পুরুষ সমান নয় - বার্তা নিয়ে মুম্বইয়ের রাস্তায় ছুটে চলেছে এই অটো

জিয়ন্তে প্রস্তর প্রাণী, মৃত্যুদূত ‘লাল হ্রদ’ কোথায়? যার পাশেই দাঁড়িয়ে ‘ঈশ্বরের পাহাড়’

তানজানিয়ার লেক ন্যাট্রন— একটি ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী হ্রদ, যার জল স্পর্শ করলেই জীবন্ত প্রাণী পাথরের মতো হয়ে যেতে পারে। রক্তলাল রঙের এই হ্রদের ক্ষারধর্মী জল এতটাই তীব্র যে, তার সংস্পর্শে এলে যে কোনও জীব কার্যত ‘পাথরে পরিণত’ হয়।

জিয়ন্তে প্রস্তর প্রাণী, মৃত্যুদূত ‘লাল হ্রদ’ কোথায়? যার পাশেই দাঁড়িয়ে ‘ঈশ্বরের পাহাড়’

তানজানিয়ার লেক ন্যাট্রন।

শুভেন্দু ঘোষ

শেষ আপডেট: 14 January 2026 17:58

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পৃথিবীর নানা প্রান্তে নদী ও হ্রদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কার ও কিংবদন্তি। হিন্দুদের কাছে গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা যেমন পবিত্র, তেমনই তিব্বতের মানসরোবর বা গুজরাতের বিন্দু সরোবরও ধর্মীয় মর্যাদায় পূজিত। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে জর্ডন নদী পবিত্র, কলম্বিয়ার গুয়াতাভিতা হ্রদ জড়িয়ে রয়েছে এল ডোরাডোর কিংবদন্তির সঙ্গে। আবার স্লোভেনিয়ার লেক ব্লেডের মাঝখানে রয়েছে একটি গির্জা-সহ দ্বীপ।

এইসব পবিত্র জলাধারের ঠিক উল্টো প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তানজানিয়ার লেক ন্যাট্রন একটি ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী হ্রদ, যার জল স্পর্শ করলেই জীবন্ত প্রাণী পাথরের মতো হয়ে যেতে পারে। রক্তলাল রঙের এই হ্রদের ক্ষারধর্মী জল এতটাই তীব্র যে, তার সংস্পর্শে এলে যে কোনও জীব কার্যত ‘পাথরে পরিণত’ হয়। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, প্রকৃতি এখানে কোনও রূপকথা লেখেনি— এটাই বাস্তব। তবু বিস্ময়ের বিষয়, এই মৃত্যুকূপ একেবারে প্রাণহীন নয়।

কীভাবে জন্ম লেক ন্যাট্রনের

উত্তর তানজানিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত লেক ন্যাট্রন পূর্ব আফ্রিকার দুটি ক্ষারধর্মী হ্রদের একটি। আকাশ থেকে হাজার হাজার ফুট উপর দিয়েও এর গাঢ় লাল রং চোখে পড়ে। কিন্তু কেন এই রং?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে হ্রদের জন্মকথায়। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগে এই হ্রদের সৃষ্টি। একের পর এক আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ও ভূগাঠনিক আন্দোলনের ফলেই জন্ম নেয় লেক ন্যাট্রন। একই সঙ্গে তার দক্ষিণে গড়ে ওঠে ওল ডোইনিও লেঙ্গাই— মাসাই ভাষায় যার অর্থ, ‘ঈশ্বরের পাহাড়’। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াই হ্রদটিকে অভিশপ্ত করেছে বিপুল পরিমাণ ক্যালসিয়াম বাইকার্বোনেট  সোডিয়াম কার্বোনেট দিয়ে। লাইভ সায়েন্স জানাচ্ছে, পার্শ্ববর্তী পাহাড় ও উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে আজও এই লবণ ও খনিজ পদার্থ হ্রদের জলে মিশে চলেছে। লেক ন্যাট্রন একা নয়— তার ‘সহোদর’ রয়েছে, লেক বাহি। দু’টি হ্রদই ক্ষারধর্মী এবং কোনও নদী বা সাগরে গিয়ে মেশে না। ফলে এগুলি একবাহী হ্রদ। জল ঢোকে, কিন্তু বেরোয় না। অগভীর এই হ্রদগুলির গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা উঠে যেতে পারে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।

কীভাবে প্রাণী ‘পাথর’ হয়ে যায়

২০১৩ সালে আলোকচিত্রী নিক ব্র্যান্ড্ট প্রকাশ করেন তাঁর বই Across the Ravaged Land। সেখানে লেক ন্যাট্রনের তীরে পড়ে থাকা অসংখ্য প্রাণীর দেহের ছবি প্রকাশিত হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সব প্রাণী যেন পাথরের মূর্তি। আসলে তারা হঠাৎ মারা যায়নি, কিন্তু অতিরিক্ত ক্ষারধর্মী জল ও লবণের সংস্পর্শে এসে দেহের বাইরের স্তর শক্ত হয়ে যায়—যাকে বলা হয় পেট্রিফিকেশন। ঠিক যেন হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য চেম্বার অব সিক্রেটস-এ ব্যাসিলিস্কের চোখে তাকিয়ে ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে পাথর হয়ে গিয়েছিল, সেই দৃশ্য বাস্তব হয়ে উঠেছে আফ্রিকার এই হ্রদের পাড়ে।

লেক ন্যাট্রনের ভয়াল বিজ্ঞান

আলোকচিত্রী নিক ব্র্যান্ড্ট শুধু ছবি তোলেননি—তিনি মৃত্যুকে ফ্রেমবন্দি করেছিলেন। লেক ন্যাট্রনের তীরে পড়ে থাকা মৃত প্রাণীগুলিকে তিনি জীবন্ত ভঙ্গিতে সাজিয়ে ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবিতেই প্রথম বিশ্ব দেখেছিল—পাখি, বাদুড়, প্রাণী—সবাই যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত। লেক ন্যাট্রনের লবণ ও খনিজে ভরপুর জলের সংস্পর্শে এলে প্রাণীদের শরীর শক্ত, শুকনো ও পাথরের মতো হয়ে যায়। মাংস ও পালক নিঃশেষে শুকিয়ে যায়, তৈরি হয় এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘মূর্তি’।

নিজের বইয়ে নিক ব্র্যান্ড্ট লেখেন, আমি হঠাৎ করেই লেক ন্যাট্রনের তীরে নানা ধরনের প্রাণী, পাখি থেকে বাদুড় ভেসে থাকতে দেখেছি। ঠিক কীভাবে তারা মারা যায়, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে এই রহস্যের উত্তর রয়েছে।

কীভাবে মৃত্যু ঘটে

লেক ন্যাট্রনের জল অত্যন্ত ক্ষারধর্মী। এর pH মাত্রা ১০.৫, যা সাধারণ প্রাণীদের জন্য মারাত্মক। এই জল চোখ ও চামড়া পুড়িয়ে দিতে পারে। ফলে জল স্পর্শ করলেই তৎক্ষণাৎ মৃত্যু নয়, কিন্তু শুরু হয় ধীরে ধীরে শরীর ক্ষয়ের প্রক্রিয়া। অনেকেরই প্রশ্ন, মৃত প্রাণীরা পচে যায় না কেন? কেন তারা পাথরের মতো দেখায়? এর কারণ সোডিয়াম কার্বোনেট। যা এক সময় প্রাচীন মিশরে মৃতদেহ মমি করার কাজে ব্যবহৃত হতো। এটি কার্যত প্রাকৃতিক সংরক্ষণকারীর কাজ করে। ফলে মৃত প্রাণীর দেহ সংরক্ষিত থাকে, পচন ধরে না।

বিপরীত প্রচলিত ধারণা, প্রাণীরা জলে পড়েই মারা যায় না। লেক ন্যাট্রনের তরল ধীরে ধীরে শরীরের চর্বি ও আর্দ্রতা শুষে নেয়। শরীর সম্পূর্ণভাবে জলশূন্য হয়ে পড়ে। শেষে মৃত্যু আসে। আর দেহ পড়ে থাকে শক্ত, কঠিন অবস্থায়, হ্রদের পাড়ে।

মৃত্যুকূপ হয়েও প্রাণের আধার কেন

লেক ন্যাট্রনের লাল রঙের জন্য শুধু লবণ ও খনিজ দায়ী নয়। এই হ্রদ মোটেই প্রাণহীন নয়। বরং এখানে বাস করে লবণপ্রিয় অণুজীব—হ্যালোআর্কিয়া এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীল-সবুজ শৈবাল)। এই অণুজীবগুলিই হ্রদের রঙকে আরও গাঢ় লাল করে তোলে। এই শৈবালই আবার প্রাণের উৎস। বিশেষ করে লেসার ফ্লেমিঙ্গোদের জন্য। গোলাপি এই দীর্ঘপা পাখি শৈবাল খেয়েই বেঁচে থাকে। ফলে এই ভয়ঙ্কর হ্রদই তাদের প্রজননক্ষেত্র। এ যেন প্রকৃতির নির্মম অথচ নিখুঁত পরিকল্পনা। অন্য প্রাণীদের জন্য যেখানে লেক ন্যাট্রন মৃত্যুকূপ, সেখানে ফ্লেমিঙ্গোদের কোনও শত্রু নেই। প্রজনন মরশুমে লক্ষ লক্ষ ফ্লেমিঙ্গো লাল হ্রদটিকে বদলে দেয় গোলাপি ও রক্তিম রঙের বিশাল জলরাশিতে।

আশপাশে রয়েছে প্রাণের ছায়া

নিকের ছবিতে দেখা গিয়েছে, মাছখেকো ঈগল ও ঘুঘুও। তবে তারা লেক ন্যাট্রনের জলে বাস করে না। তারা থাকে আশপাশের মিঠে জলের জলাভূমি ও লবণাক্ত জলাধারে। এই অঞ্চলে আরও দেখা যায়— উইল্ডবিস্ট, উটপাখি, পেলিকানসহ নানা বন্যপ্রাণী। অর্থাৎ, লেক ন্যাট্রন নিজে ঘাতক হলেও, তার চারপাশে জীবন থেমে নেই।


```