Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
‘ফোর্স ৩’ শুটিং জোরকদমে, পুরনো চরিত্রে ফিরছেন জন— নতুন চমক কারা?'মমতা চান না গোর্খারা শান্তিতে থাকুন, অধিকার ফিরে পান', দার্জিলিঙে ভিডিওবার্তা অমিত শাহেরগ্রাহকের পকেট বাঁচাতে ভারি খেসারত দিচ্ছে তেল কোম্পানিগুলি! প্রতিদিন লোকসান ১,৬০০ কোটিরইচ্ছেশক্তির বারুদে আগুন ধরাল ধোনির পেপ টক! নাইটদের বিঁধে দুরন্ত কামব্যাক নুর আহমেদেরময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাসকে হত্যার প্রধান আসামিকে ১ বছরের অন্তর্বর্তী জামিন, কাঠগড়ায় বিচারপতিশয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকা

মতে না মেলায় ছেড়েছিলেন প্রিয় দল, রেয়াত করেননি জীবনানন্দকেও

শাশ্বতী সান্যাল কবিতাটা লেখার পর কলম নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন কবি। নাহ! কিচ্ছু হয়নি লেখাটা। তবু 'তাকে' একবার শোনানো যাক। দেখা যাক, 'সে' কী বলে! ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে মেঝেতেই উবু হয়ে বসলেন কবির পাঠক

মতে না মেলায় ছেড়েছিলেন প্রিয় দল, রেয়াত করেননি জীবনানন্দকেও

শেষ আপডেট: 8 July 2021 08:30

শাশ্বতী সান্যাল

কবিতাটা লেখার পর কলম নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন কবি। নাহ! কিচ্ছু হয়নি লেখাটা। তবু 'তাকে' একবার শোনানো যাক। দেখা যাক, 'সে' কী বলে! ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে মেঝেতেই উবু হয়ে বসলেন কবির পাঠক। কাগজটা তুলে নিয়ে গোটা কবিতাটা ধীরে ধীরে তাকে পড়ে শোনালেন কবি। তারপর... বাধ্য ছাত্রের মত উৎসুক মুখে তাকিয়ে রইলেন পাঠকের দিকে। সেদিন ভাগ্যিস সেই পাঠকের 'ভালো লেগেছিল', তাই ছাড়পত্র পেয়েছিল সেই লেখা, নাহলে বাংলার মানুষ কোনওদিনই পড়ার সুযোগ পেতেন না সেই প্রবাদ হয়ে যাওয়া বিখ্যাত কবিতা- 'ফুল ফুটুক, না ফুটুক, আজ বসন্ত' হ্যাঁ, কথা হচ্ছে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। আর ভাবতে আশ্চর্য লাগে তাঁর এই প্রথম পাঠক, আর কেউ নয়, তাঁদের বাড়ির রান্নার মানুষ সুধাপিসি।সেসময় স্ত্রী গীতাদেবী বাড়ি না থাকলে নতুন কবিতা লিখে প্রথমে সুধাপিসিকেই পড়াতেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সুধাপিসি 'ভালো হয়েছে' বললে রাখতেন, নাহলে বাতিল কাগজের বাক্সে ঠাঁই পেত সেসব সদ্য লেখা কবিতা। লোথার লুৎসেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছিলেন সেই আশ্চর্য তথ্য। আরও অনেক কবিতার মতো তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'ফুল ফুটুক' এরও প্রথম পাঠক সেই 'সুধাপিসি'। নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মামাবাড়িতে জন্মেছিলেন সুভাষ। বাবা সরকারি চাকুরে, আবগারি দফতরের দারোগা। বদলির চাকরি বাবার, সেই কাজের সূত্রেই তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে কখনও রাজশাহীর নওগাঁয়, কখনও বা কলকাতার ৫০ নম্বর নেবুতলা লেনে। যেখানেই থাকুন না কেন, সেই ছোটবেলা থেকেই তাঁর জীবনকে ঘিরে ছিল দরিদ্র- হতদরিদ্র, দিন-আনি-দিন-খাই অগণন মানুষের মুখ। মানুষের দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট, দুর্দশা আর জীবনসংগ্রাম সেই ছেলেবেলা থেকেই ভাবিয়ে তুলত কিশোর সুভাষ'কে । রাজনীতিতে হাতেখড়িও বেশ কম বয়সে। ১৯৩২-৩৩ সাল নাগাদ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিশোর ছাত্রদলের সদস্যপদ নিলেন সুভাষ। এই সময় একদিন কবি সমর সেন তাঁর হাতে তুলে দেন এক আশ্চর্য বই। 'হ্যান্ডবুক অব মার্কসিজম' নামে সেই বইটাই না কি জীবন বদলে দিয়েছিল তরুণ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। সেটা ১৯৫১ সাল, প্রায় বছর তিনেক জেল খেটে সদ্য ছাড়া পেয়েছেন কবি। টাকাপয়সার দারুণ অভাব, তার মধ্যেই আধবেলার একটা চাকরিও জুটেছে এক প্রকাশনার দফতরে। ঠিক করলেন বিয়ে করবেন। পাত্রী  আর কেউ নন, কমিউনিস্ট পার্টির আরেক সক্রিয় সদস্য গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রেজিস্ট্রি বিয়ে, পাঁজি দেখে শুভদিন খোঁজার ঝঞ্ঝাট নেই। দুপুরে আপিস থেকে বেরিয়ে কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে সুভাষ হাজির হলেন সোজা রেজিস্ট্রি অফিস। হাজার হলেও নতুন বর। বিয়ের দিনে একটা নতুন পোশাক তো লাগবে অন্তত। সে সমস্যার সমাধান করে দিলেন বন্ধুরাই। এক বন্ধু উপহার দিলেন চেক শার্ট, আরেক বন্ধু দিলেন জলচুড়ি পাড়ের ধুতি। ফুল, মিষ্টি- সেসবের দায়িত্বেও সেই বন্ধুরা। আইনি সইসাবুদ মিটিয়ে কাছের এক দোকান থেকে চা মিষ্টি খেয়ে, তারপর যে যার বাড়ি। এই আশ্চর্য বিয়ের কয়েকদিন পরেই নতুন বউকে নিয়ে সুভাষ মুখোপাধায় চলে এলেন বজবজের ব্যঞ্জনহেড়িয়ায়। সেখানে চটকল মজুরদের বস্তিতে, মাসিক ২০টাজা ভাড়ায় নেওয়া মাটির ঘরে শুরু হল তাঁদের খেলনাবাটির সংসার। সংসার তো নামেই, আসলে দুজনেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন শ্রমিক সংগঠনের কাজে। সারা সকাল চটকল-তেলকলে কাটিয়ে দুপুরটা সুভাষ মুখোপাধ্যায় চলে যেতেন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতে। আর সে সময়টা শ্রমিক মহল্লার মেয়ে-বউদের অক্ষর শেখানো, হাতের কাজ শেখানো, আত্মনির্ভর হবার পাঠ দিতেন স্ত্রী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়।সারাদিন সংসার আর শ্রমিক ইউনিয়নের কাজ, তারই ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লেখার বিরাম নেই। এই সময়েই একের পর এক লেখা হচ্ছে 'ফুল ফুটুক' পর্যায়ের বিখ্যাত কবিতাগুলো। লেখা হচ্ছে- "আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে তারপর খুলে- মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে তারপর তুলে যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে যেন না ফেরে"র মতো পংক্তি , 'সলোমনের মা'-র মতো কবিতা। কেমন ছিল সেইসময় তাঁদের যৌথ জীবন? সেইসময়কার একটা চিঠিতে মজা করে লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ‘… বিকেলে এক পশলা বৃষ্টির পর ইউনিয়ন অফিসে ব’সে কয়লা সড়কের সন্ধ্যে নামা যদি তুমি দেখতে!... রবি ঠাকুর জোড়াসাঁকোর ছাদে সূর্যোদয় দেখেছিলেন, আমি হপ্তার দিন কয়লা সড়কে সূর্যাস্ত দেখলাম।’ পার্টি রাজনীতি নিয়ে একটু একটু করে বীতশ্রদ্ধা জন্মাচ্ছিল কি! তত্ত্ব আর বাস্তবের দ্বন্দ্ব, নেতা আর শ্রমিকের অর্থনৈতিক অসাম্যের ছবি প্রকট হচ্ছিল তাঁর সেইসময়কার চিঠিপত্রগুলোতে। যদিও সাম্যবাদী আন্দোলনে আস্থা হারাননি সুভাষ। সবার উপরে তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের উপর, মানবসংগ্রামের উপর। ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন সুভাষ। তখন সবে সবে তৈরি হচ্ছে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ। তারই সাংগঠনিক কমিটিতে কবি বিষ্ণু দে'র সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হলেন তিনিও। এরপরই মাসিক ১৫ টাকা ভাতায় সর্বক্ষণের কর্মীরূপে যোগ দেন পার্টির 'জনযুদ্ধ' পত্রিকায়। তার বেশ কিছু বছর পর ১৯৫১ সাল নাগাদ 'পরিচয়' পত্রিকায় দায়িত্বভার তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। এই 'পরিচয়' পত্রিকাতেই সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর আগের প্রজন্মের বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লিখলেন এক বিস্ময়কর প্রবন্ধ। স্তুতি নয়, জীবনানন্দের কবিতার রীতিমতো কঠোর সমালোচনা করলেন সে লেখায়। শুধু 'পরিচয়'এই নয়, সেসময় নানাজায়গায় খুল্লামখুল্লা জীবনানন্দ বিরোধিতা করতেন কবি। বলতেন, 'যে কবিতা জীবনের বিপক্ষে, সে কবিতা কবিতাই নয়'। আসলে জীবনানন্দের কবিতায় জীবন বা না-জীবনের যে এবসার্ড ছবি, তার সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দেখা রক্ত-মাংসের জীবন অনেক আলাদা, আর বিরোধ লেগেছিল সেখানেই। তাঁর সেদিনকার সেই চাঁচাছোলা গদ্যভাষা শাণিত তরবারির মতো এসে বিঁধেছিল অনেক তরুণ কবির বুকে। পক্ষে বিপক্ষে ঘুলিয়ে উঠেছিল জল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনানন্দ বিষয়ে মনোভাব বদলে যায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। এ প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট ঘটনার কথা না বললেই নয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বেশ ঘনিষ্ঠ হলেও,তাঁর এই জীবনানন্দ-বিরোধিতা একেবারেই মন থেকে মেনে নিয়ে পারেননি কবি শঙ্খ ঘোষ। পরিচয়ে সে লেখা প্রকাশের বহু পরে শঙ্খ ঘোষ তাঁর একটি গদ্য আলোচনায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেদিনকার বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। সেই লেখাটি হাতে করে কোনও এক ছদ্ম হিতৈষী সোজা পৌঁছয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। বলেন, 'আপনার বিষয়েও উনি কী রকম নিন্দেমন্দ করেছেন, দেখুন৷' সেদিন সম্পূর্ণ গদ্যটা খুব মন দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে হাসিমুখে সুভাষ উত্তর করেছিলেন, 'নিন্দেমন্দ বলছ কেন? ঠিকই তো লিখেছে৷ ও ভুলটা তো আমি করেইছিলাম৷’ এই ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। যখন যে আদর্শকে ঠিক মনে করেছেন, তার পক্ষ নিতে দুবার ভাবেননি । আবার ভুল বুঝতে পারলে সেটা স্বীকার করে নিতেও কুণ্ঠা ছিল না তাঁর। স্পষ্ট সমালোচনা করেছেন, আবার স্পষ্ট সমালোচনা গ্রহণ করতেও পিছপা হননি কখনও। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল প্রভাবহীন, আশ্চর্য সহজ আর মরমী। কিন্তু অনুকরণ করতে গেলে বোঝা যায়, সেই সহজ কথা ঠিক ততটাও সহজ নয়। নিজের লেখালিখিকে কোনওদিনই বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইতেন না সুভাষ মুখোপাধ্যায়। বলতেন, 'আমাকে কেউ কবি বলুক, আমি চাই না।' এও বলতেন, কবিতার ভাষা তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর মায়ের মুখ থেকে৷ হয়তো সেই জন্যেই তাঁর কবিতার পর কবিতা জুড়ে দেখা যায় প্রতিদিনের ঘরোয়া কথাবার্তার এক আশ্চর্য কাব্যরূপ৷ [caption id="attachment_2235852" align="aligncenter" width="600"] দিলখোলা হাসি- সমকালীন কবিদের সঙ্গে[/caption] কবিতার ছন্দপ্রকরণ নিয়ে কথা বলতে গেলেও হেসে উড়িয়ে দিতেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ধোপার কাপড় কাচার শব্দে তিনি ছন্দ শিখেছেন, এমন একটা কথা একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। মুখে যাই বলুন, কবিতার প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতা ছিল দেখার মতো। মতে না মেলায় শেষজীবনে সরে এসেছিলেন প্রিয় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়া থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অকুণ্ঠ সমর্থন জোগালেও তিনি সমর্থন করেননি পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনকে। 'কে কোথায় যায়' উপন্যাসে সেই আন্দোলনের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। উলটে সমর্থন জানিয়েছিলেন ১৯৭৭ সালে তৈরি হওয়া জরুরি অবস্থার। ১৯৮১ সালে রণকৌশল ও অন্যান্য কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নে পার্টির সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এইসময় থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে একটু একটু করে দূরত্ব তৈরি হয় কবির। সে সময় তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। দূরে সরে গেছিলেন এতদিনের প্রিয় লেখক বন্ধুরাও। রাজনীতির মঞ্চে সরে এলেও কবিতা থেকে কোনোদিন সরে দাঁড়াননি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। শারীরিক এবং অর্থনৈতিক নানা সংকটে জর্জরিত হয়েও 'পদাতিক' নায়কের মতোই আজীবন মাথা উঁচু করে হেঁটেছেন কবিতার রাজপথে। আজও তাঁর কবিতার সড়ক স্বতন্ত্র, স্বয়ংসম্পূর্ণ। জন্মের শতবার্ষিকী পেরিয়ে আজও কোনও যোগ্য উত্তরসাধক খুঁজে পায়নি তাঁর কবিতার ভাষা।

```