
শেষ আপডেট: 4 May 2020 12:31
বিষ মধুর সন্ধানে
পাহাড়গুলির পাদদেশে দলটি পৌঁছে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। সামনে কয়েক মাইল এলাকা জুড়ে প্রায় হাজার থেকে দেড়হাজার ফুট উঁচু খাড়া পাথুরে দেওয়াল। দেওয়ালের বিভিন্ন দুর্গম স্থানে ঝুলছে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অর্ধচন্দ্রাকার মৌচাক। এক একটি মৌচাক প্রায় ছয় সাতফুট লম্বা। যার ভেতরে আছে কম করে নব্বই কেজি মধু। এ মধু যে সে মধু নয়। এ মধু খেলে নেশা হয়। কালোবাজারের এ মধুর দাম কেজি প্রতি ২৫০০০ টাকা।
মৌচাকগুলিকে ঘিরে আছে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি। যে সে মৌমাছি নয়, সবচেয়ে বড় মৌচাক নির্মাতা দৈত্যাকৃতি মৌমাছি Apis dorsata। খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে লক্ষ লক্ষ মৌমাছির আক্রমণ প্রতিহত করে ছিনিয়ে আনতে হবে ঝিম ধরানো আঠালো মধু। বছরের সব সময় এই মধু পাওয়া যায় না। প্রতি বছর মার্চ এপ্রিলে গিরিখাতের রডোডেনড্রন গাছগুলিতে উজ্বল গোলাপি, লাল, সাদা ফুল ফোটে। ফুলের মৌ-এর মধ্যে থাকে বিষাক্ত উপাদান, যা মধুতে আরও ঘনীভূত হয়। সে মধু পান করলে মানুষের চড়া নেশা হয়। যদিও কুলুংরা কয়েক শতাব্দী ধরে বিষ মধু পান করে আসছে কফ সিরাপ ও অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে।
উঠে দাঁড়ায় ৬২ বছরের মউলি কুলুং
৪৭ বছর ধরে দুর্গম পাহাড় থেকে বিষ মধু পেড়ে আনছে সে। আজ তাকে প্রায় হাজার ফুটের পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে। তারপর পাহাড়ের মাথা থেকে নামাতে হবে তিনশ ফুটের দড়ির মই, যার পা-দানিগুলি বাঁশের। ধীরে ধীরে দলটা গিরিগিটির মত পাহাড় বাইতে থাকে। কারও কোমরে পর্বতারোহীদের মত সেফটি রোপ লাগানো নেই। তবে সবাই ওপরে উঠবে না। একেবারে ওপরে উঠবে মউলি কুলুং আর তার ১৫বছরের বিশ্বস্ত সঙ্গী আসধন কুলুং। বাকিদের কেউ থাকবে মাঝে, কেউ নীচে।
প্রথম যে দিন মধু শিকারে গিয়েছিল মউলি, খাড়া দেওয়াল বাইতে গিয়ে মাকড়শার প্রকাণ্ড জালে আটকে পড়েছিল। জালে ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছিল সে। জালটাও মউলির ভারে ছিঁড়তে শুরু করেছিল। হঠাৎ পাথরের আড়ালে একটি বাঁদরের দেখা পেয়েছিল মউলি। বাঁদরটি তার বড় লেজ বাড়িয়ে দিয়েছিল। মউলি বাঁদরের লেজ ধরে উঠে এসেছিল।
[caption id="attachment_217107" align="aligncenter" width="945"]
মউলি কুলুং[/caption]
ঘটনাটি আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও মউলির গ্রামের বয়স্করা বলেছিলেন, বাঁদরটি হল মৌমাছি আর বাঁদরদের আত্মা রাংকেমি। যেখানে মানুষ যেতে পারে না সেখানে তিনি বিরাজ করেন। যে সমস্ত সাহসী মানুষ কেবল মাত্র বেঁচে থাকার জন্য মধু আহরণ করতে যায় তাদের রক্ষা করেন রাংকেমি। কিছুক্ষণ আগে পাহাড়ের নীচে এই রাংকেমি ও তাঁর সঙ্গী জঙ্গলের আত্মা বানেসকান্দির পুজো করছিলেন কুলুং পুরোহিত।
ইতিমধ্যে ওপর থেকে নেমে এসেছে আসধন। মৌমাছিদের তীব্র গুঞ্জনে সঙ্গীর নির্দেশের সবটা কানে ঢোকে না। মইয়ে ঝুলে থাকে থাকে আসধন, তার পিঠে বাঁধা প্যাঁচানো কয়েকশো ফুটের দড়ির কুণ্ডলী খুলতে শুরু করে। সংকীর্ণ স্থানে কোনওমতে দেহের ভারসাম্য রেখে শুখনো ঘাসে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মউলি।
বাতাস সহায় ছিল, তাই ধোঁয়া মৌচাক অবধি পৌঁছেছিল। নাহলে আর একটু এগোলেই এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ত মৌমাছির দল। ভারসাম্য হারিয়ে মউলিকে আছড়ে পড়তে হত কয়েকশো ফুট নীচে। নিশ্চিত মৃত্যু। নিজের ভুলে বা বাতাসের ঝাপটায় ভারসাম্য হারালেও মৃত্যু অনিবার্য।
ঘন ধোঁয়ায় উড়তে শুরু করেছে লক্ষ লক্ষ বিরক্ত, ক্রুদ্ধ ও হতভম্ব মৌমাছি। মন্ত্র পড়ে চলে মউলি “হে রাংকেমি, তুমি মৌমাছির দেবতা, আমরা চোর ডাকাত নই। আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা আমাদের সঙ্গে আছে। দয়া করে মৌমাছিদের দূরে পাঠাও। রক্ষা করো।” মন্ত্র পড়তে পড়তে পিঠ থেকে বাঁশ নামিয়ে সেটার ছুঁচাল ডগা ঘষে ঘষে মৌচাকটা খণ্ড খণ্ড করে কাটতে থাকে সে।
মুখ কান হাত পায়ের খোলা অংশে বিষাক্ত হুল ফোটায় মৌমাছিরা। সেই অবস্থায় মৌচাকের প্রায় পঞ্চাশ কেজি ওজনের কাটা টুকরোটি বোঝাই করতে থাকে বেতের ঝুড়িতে। তারপর নিচে নামিয়ে দেয় ঝুড়িটা। একটা দুশো কেজির মৌচাক ভেঙে, মউলিরা আবার দড়ির মই বেয়ে উঠে যায় ওপরে। আবার মই নামায় অন্যদিকে। মাঝের ও নীচের দলগুলি সেভাবেই জায়গা পরিবর্তন করে।
এই ভাবে ১০ ঘণ্টার অমানুষিক পরিশ্রমে প্রায় গোটা পনেরো চাক ভেঙে অবসন্ন দেহটাকে নীচে নামিয়ে আনে মউলি। মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনা বিষ মধু চলে যাবে বিদেশে। ব্রোঞ্জ স্ট্যাচু ঢালাইয়ের কাজের জন্য মোম চলে যাবে কাঠমান্ডুতে।
মৌমাছির কামড়ে সারাদেহ ফুলে গেছে, রক্তে নাচতে শুরু করেছে মৌমাছির বিষ। আগামী কয়েকদিন মউলির কাটবে বিছানায়, অচৈতন্য হয়ে। সামনের বছর বসন্ত পর্যন্ত দশটি পরিবারের হাতে বাঁচার রসদ তুলে দিয়েছে সে। টলতে টলতে গ্রামের দিকে এগোয় নেপালের শেষ ‘হনি হান্টার’ মউলি। গ্রামটাকে বড় দূরে মনে হয় তার।