রূপাঞ্জন গোস্বামী
আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার হাইওয়েতে পান্না সবুজ রঙের গাড়িটিকে ধাওয়া করেছিল পুলিশের চার-পাঁচটি গাড়ি। চালক মদ খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একটাও সিগন্যাল মানছিলেন না। কয়েকটি গাড়িকে ধাক্কা মারার উপক্রম হয়েছিল। পুরো ট্রাফিক থেমে গিয়েছিল। আমেরিকার রাস্তাঘাটে এই দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেদিনের ঘটনাটি স্বাভাবিক ছিল না
অনেক কষ্টে গাড়িটিকে থামিয়েছিল পুলিশ। হ্যান্ডকাফ পরানো হয় ৪৬ বছরের ব্যক্তিটিকে। ব্রেথালাইজার মেশিনে ব্যক্তিটি কিছুতেই ফুঁ দেবেন না। ঈশ্বরের নামে শপথ করে দাবি করছিলেন তিনি মদ খাননি। অথচ তাঁর পা টলমল করছিল, কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল, দিক ভুল করে ফেলছিলেন অর্থাৎ ব্যক্তিটির আচরণে আকণ্ঠ মদ খাওয়ার সব বৈশিষ্ট্যই হাজির ছিল।

পুলিশ জোর করে তাঁকে ব্রেথলাইজার মেশিনে ফুঁ দেওয়ায়। তাঁর শ্বাসে ধরা পড়ে অ্যালকোহলের অস্তিত্ব। পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আরেকবার পরীক্ষা করায়। ব্যক্তিটির রক্তে যে পরিমাণ অ্যালকোহল পাওয়া যায়, তা দশটি বিয়ার পান করার পর কোনও মানুষের রক্তে মেলে।
পুলিশ ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, বিভিন্ন আইন ভাঙার জন্য মোটা অঙ্কের ফাইন দিতে হয়। কিন্তু ব্যক্তিটি থানা থেকে কোর্ট, সর্বত্র তখনও বলে যাচ্ছিলেন তাঁর প্রতি অন্যায় করে হচ্ছে। কারণ তিনি মদ খেয়ে গাড়ি চালাননি।
ব্যাক্তিটির নাম প্রকাশ না করলেও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে নজরে রাখতে শুরু করে পুলিশ। ব্যাক্তিটি এবার সত্যিই ভেঙে পড়েন। ওহায়োতে থাকা মাসিকে সব জানান। মাসি এর আগে এরকম একটি ঘটনা শুনেছিলেন, যা ঘটেছিল ওহায়োতেই। ব্যাক্তিটিকে তিনি পাঠান সেই ল্যাবরেটরিতে যেটির কথা কাগজে পড়েছিলেন।
ধরা পড়েছিল বিরল এক অসু্খ 'অটো- ব্রুয়ারি সিনড্রোম'
ল্যাবরেটরিতে সবরকম পরীক্ষার পর ব্যাক্তিটির মলে পাওয়া যায়
Saccharomyces cerevisiae বা ইস্ট নামের ছত্রাক। এই ছত্রাক সুরা শিল্পে অ্যালকোহল উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ। এছাড়াও পাওয়া গিয়েছিল
Saccharomyces boulardii। ওহায়োর ডাক্তাররা ব্যাক্তিটিকে বললেন, "আপনি ভুগছেন একটি বিরল রোগে, যার নাম
auto-brewery syndrome।
এই রোগে আক্রান্ত কোনও মানুষের শরীরে নিজে থেকেই অ্যালকোহল উৎপন্ন হয়। চিকিৎসকরা ব্যক্তিটিকে ছত্রাকনাশক ওষুধ দিলেন। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার ও আরও কিছু খাবার খেতে নিষেধ করেছিলেন যেগুলি থেকে অ্যালকোহল উৎপন্ন হতে পারে। সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন ব্যক্তিটি।
[caption id="attachment_158544" align="aligncenter" width="900"]
Saccharomyces cerevisiae বা ইস্ট[/caption]
চিকিৎসার পরেও ফিরে এসেছিল রোগ
ওহায়োর চিকিৎসকরা কিছুদিন চিকিৎসা করে ব্যক্তিটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা বন্ধ করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসে আগের সব উপসর্গ। মদ না খেয়েই একটা সময় মানুষটি এতই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন যে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। পরিবারের লোকেরা তাঁকে হাসপাতালে পাঠালে কর্তৃপক্ষেরা সেবারেও বিশ্বাস করেননি ব্যক্তিটির কথা। ব্যক্তিটির রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা দাঁড়িয়েছিল ৪০০ মিলিলিটার/ডিএল। পুলিশ যখন তাকে গ্রেফতার করেছিল সেই সময়ের চেয়ে এই মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ।
সবধরনের চিকিৎসক দেখিয়েও ব্যক্তিটির রোগ সারছিল না। বিনা কারণে লোকের চোখে হেয় হতে হতে মানুষটি ভেবেছিলেন আত্মহত্যার কথা। শেষ চেষ্টা হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে তিনি গবেষক ও বিজ্ঞানীদের সাহায্য চেয়েছিলেন। এরপর একটি অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপের সাহায্যে রিচমন্ড ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের গবেষকদের সঙ্গে ব্যক্তিটির যোগাযোগ হয়। যে গবেষকরা তাঁর চিকিৎসা ও একইসঙ্গে তাঁকে নিয়ে গবেষণা করতে উৎসাহ দেখান।
[caption id="attachment_158549" align="aligncenter" width="720"]
রিচমন্ড ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার[/caption]
গবেষক ডাক্তাররা চিকিৎসা ও গবেষণা শুরু করেছিলেন
রিচমন্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ডাক্তাররা এবারও ব্যক্তিটিকে প্রতিদিন ১৫০-২০০ মিলিগ্রাম করে
itraconazole নামের ছত্রাকনাশক ওষুধ খেতে দেন। একইসঙ্গে খাদ্যনালীতে উপকারি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যায় বাড়াতে শুরু করেন। ব্যক্তিটি আবার সুস্থ হয়ে উঠতে শুরু করেন। কিন্তু একদিন হঠাৎই আবার ব্যক্তিটিকে মাতলামি করতে দেখা যায়। জানা যায় ব্যক্তিটি লুকিয়ে পিৎজা ও সফট ড্রিঙ্কস খেয়েছিলেন।
গবেষকরা এবার ওষুধ পাল্টে ছ' সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ১৫০ মিলিগ্রাম
micafungin ইঞ্জেকশন দেন। দেড় বছরের মধ্যে রোগ ফিরে না আসায় মানুষটিকে সাধারণ জীবনযাপন করতে বলা হয়। এমনকী তাঁকে শর্করা জাতীয় খাবার খেতে দেওয়া হয়। গবেষকরা আজও রোজ ব্যক্তিটির ব্রেথালাইজার মেশিনের রিপোর্ট চেক করেন।
কেন হয়েছিল auto-brewery syndrome!
গবেষকদের মতে ব্যক্তিটির খাদ্যনালীতে ব্যাকটেরিয়া কমে গিয়ে ছত্রাক বেড়ে গিয়েছিল বলেই ঘটেছিল এই বিপত্তি। খাদ্যনালীতে
Bacteroides, Clostridium, Fusobacterium,Eubacterium, Ruminococcus, Peptococcus, Peptostreptococcus, Bifidobacterium. Escherichia ও
Lactobacillus প্রভৃতি শ্রেণির কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া থাকে।
যাদের মধ্যে অনেক ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, হজমের পক্ষে সহায়ক উৎসেচক সৃষ্টিতে, দেহে ভিটামিন বি ও ভিটামিন কে, ফলেট ও শর্ট চেন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরিতে সাহায্যে করে। এমনকী খাবারে উপস্থিত ক্যানসার সৃষ্টিকারি উপাদানকে ভেঙে ফেলে শরীরকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে।
আট বছর আগে এই ব্যক্তিটির বুড়ো আঙুলে অস্ত্রোপচার করা হয়। তখন তাঁকে টানা কয়েক মাস কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়েছিল। ফলে শরীরের উপকারি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ভীষণ কমে গিয়েছিল। ব্যাকটেরিয়ামুক্ত পরিবেশ পেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল ছত্রাকের সংখ্যা। তাঁর ক্ষুদ্রান্তে ও সিকামে বাসা বাঁধা ইস্ট সমানে কার্বোহাইড্রেটকে ইথানলে পরিণত করে চলেছিল।

ফলে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলেই খাবারকে গেঁজিয়ে তুলত ইস্ট ও অনান্য ছত্রাকের দল। কোহল-সন্ধান প্রক্রিয়ায় আপনা থেকেই পেটের ভেতর তৈরি হয়ে যেত মদ। সেই মদ মিশত রক্তে। সত্যি সত্যি চুড়ান্ত মাতাল হয়ে যেতেন রোগী। একফোঁটা মদ না খেয়ে এবং মাতালের অভিনয় না করে।
যে কারণে রোগটি ধরা পড়েনা
সাম্প্রতিক গবেষণাটির সহ গবেষক ফাহাদ মালিক, তিনি
নিউ সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনকে বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তিটির কথা একজনও বিশ্বাস করতেন না। পুলিশ, ডাক্তার, নার্স এমন কি ব্যক্তিটির পরিবারের লোকজনও বিশ্বাস করতেন না যে ব্যক্তিটি সত্যি বলছেন। সবাই ভাবতেন তিনি একজন পাঁড় মাতাল।
[caption id="attachment_158558" align="aligncenter" width="4255"]
আমেরিকার রে লুইস ভুগছেন এই রোগে[/caption]
গবেষক ফাহাদ মালিক বলেছিলেন," অনেকে ভাবেন এটা অত্যন্ত বিরল রোগ। কিন্তু আমাদের মতে এই রোগ ধরা পড়ে না। এর একটা কারণ মুখে মদের গন্ধ মেলার জন্য বেশিরভাগ সময়েই রোগী মদ্যপান করেছেন বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি যে মদ খাননি সেকথা রোগী কাউকে বিশ্বাস করাতে পারেন না।"
মেডিক্যাল জার্নাল ঘেঁটে দেখা যায়,
auto-brewery syndrome রোগটির প্রথম সন্ধান মেলে সাতের দশকে জাপানে। আমেরিকায় এরকম রোগীর খোঁজ মেলে আটের দশকে। আগের ঘটনাগুলিতে দেখা গিয়েছিল, রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতার অভাব ও
Crohn’s disease আছে এমন মানুষদের দেহে অস্ত্রোপচারের পর ছত্রাকের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারই যে খাদ্যনালীতে মদ তৈরির অন্যতম কারণ, এটা রিচমন্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদের আগে কেউ ধরতে পারেননি।
[caption id="attachment_158555" align="aligncenter" width="631"]
ইংল্যান্ডের ম্যাথু হগ (৩৪) ভুগছেন এই রোগে[/caption]
তাই রাস্তাঘাটে কাউকে টলোমলো পায়ে চলতে দেখলে বা জড়িয়ে কথা বলতে দেখলেই তাঁকে মদ্যপ ভেবে বসবেন না। হয়তো মানুষটি এই বিরল রোগে ভুগছেন। যা তিনি নিজেই জানেন না। অথবা জেনেও কাউকে বিশ্বাস করাতে না পেরে, কারও সাহায্য না পেয়ে সত্যি সত্যি মদই বেছে নিচ্ছেন হতাশার হাত থেকে পালাতে।