
বিহারের ভোট-যুদ্ধে বাজিমাৎ করবেন কে?
শেষ আপডেট: 5 May 2024 13:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বিহারের রাজনীতিতে প্রায় সাড়ে তিন দশকের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ল। রাজ্য থেকে জাতীয় জাতীয় রাজনীতিতে এই সাড়ে তিন দশকে বিহারের মুখ ছিলেন রামবিলাস পাশোয়ান, সুশীল কুমার মোদী, লালুপ্রসাদ যাদব এবং নীতীশ কুমার।
লোক জনশক্তি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হরিজন নেতা রামবিলাস পাশোয়ান চার বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। বিজেপি নেতা সুশীলকুমার মোদী গুরুতর অসুস্থ। তাঁর ক্যান্সার হয়েছে। তিনি প্রার্থী হননি। প্রচারেও নেই।
পশুখাদ্য কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত জেল ফেরৎ লালুপ্রসাদ গুরুতর অসুস্থ। তাঁর পক্ষে ঘুরে ঘুরে প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজ্যের চার তারকা রাজনীতিকের মধ্যে এবার সক্রিয়ভাবে ময়দানে আছেন শুধু নীতীশ কুমার। তাঁরও দিন দিন অসুস্থতা বাড়ছে। অসংলগ্ন কথা বলার প্রবণতাও বেড়ে গিয়েছে। সেটা এতটাই যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে নীতীশকে আর যৌথ সভায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী তথা দলীয় সভাপতি নীতীশকে নিয়ে চিন্তিত তাঁর পার্টি জনতা দল ইউনাইটেড এবং জোট সঙ্গী বিজেপি।
নীতীশ বাদে তাঁর সমসাময়িক তিন নেতা নির্বাচনী প্রচারে না থাকায় শূন্যস্থান পূরণ করছে নবীন প্রজন্ম। লালুপ্রসাদের ছোট ছেলে তেজস্বী আগেই দলের হাল ধরেছেন। তিনি এর আগে দু-দফায় নীতীশ কুমারের মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বিহারের বিরোধী জোটের তিনিই নেতা। যদিও বাড়িতে বসে অসুস্থ লালুপ্রসাদ তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। সেই কারণেই উপমুখ্যমন্ত্রী কিংবা বর্তমানে বিরোধী দলনেতা হওয়া সত্ত্বেও বাসা বদল করেননি তেজস্বী। তবে আগের তিনটি ভোটে লালুপ্রসাদ তাঁকে প্রচারে সঙ্গ দিলেও কিডনি বদলের পর এবার ঘরে বসে গিয়েছেন পুরোপুরি।
রামবিলাসের মৃত্যুর পর তাঁর দল ভেঙে যায়। ভাই পশুপতি পারস এবং ছেলে ও ছেলে চিরাগ পাশোয়ান আলাদা হয়ে গিয়ে দুই শিবিরই বিজেপির সঙ্গে ছিল। এবার লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি রামবিলাসের ভাইকে ত্যাগ করে শুধু ছেলেকে এনডিএ-র শরিক করেছে। রাম বিলাসের পুত্র হিসাবে চিরাগই দলের ভবিষ্যৎ ধরে নিয়ে এই সিদ্ধান্ত বিজেপির। ২০১৯-এ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাম বিলাস। বাবার জায়গায় এবার ময়দানে পুরোমাত্রায় হাজির চিরাগ।
নীতীশ কুমারের একমাত্র ছেলের সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই। তিনি মানসিক সুস্থ নন। অন্যদিকে, বিজেপি নেতা সুশীলকুমার মোদী নিঃসন্তান। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর বিহার বিজেপির মুখ সুশীলের জায়গায় এবার দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বয়সে নবীন সম্রাট চৌধুরী। তিনি রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী এবং দলের রাজ্য সভাপতি। বছর চল্লিশের সম্রাটকে বেছে নিয়েছেন অমিত শাহ। নীতীশ কুমারকে ফের বিজেপির শিবিরে নিয়ে আসার পিছনে এই নবীন নেতার বিশেষ ভূমিকা ছিল।
নীতীশ ফের বিজেপির হাত ধরায় এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সভাপতি তথা উপমুখ্যমন্ত্রী নবীন নেতা সম্রাট চৌধুরীর দিকেই প্রচারের আলো বেশি। যেমন প্রচারের আলো বেশি তেজস্বী এবং চিরাগদের উপরও। তাঁদের মধ্যে অভিভাবকহীন বলা চলে একমাত্র চিরাগকেই।
লালুপ্রসাদ এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি বলেছেন, আমি ময়দানে নেই। ময়দানে আমার ছেলে তেজস্বী আছে। সে রোদ মাথায় গোটা রাজ্য ঘুরছে। আমি বাড়ি বসে টিভিতে দেখছি। প্রয়োজন মতো পরামর্শ দিচ্ছি।
এখন প্রতিপক্ষ হলেও লালুপ্রসাদ, নীতীশ এবং সুশীল কুমার মোদীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি একই সময়, গত শতকের সাতের দশকের মাঝামাঝি জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সুবাদে। তিনজনই ছিলেন পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রনেতা। সুশীল মোদী ছিলেন বিদ্যার্থী পরিষদের। লালু ও নীতীশ একই সঙ্গে জনতা পার্টির ছত্রছায়ায় ছাত্র মোর্চার নেতা ছিলেন। সেই সূত্রে তিনজনের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
একই সময়ে রাজনীতিতে উত্থান রাম বিলাসেরও। ১৯৮৯-এর লোকসভা ভোটে হাজিপুর আসন থেকে ছয় লাখের ব্যবধানে জিতে বিশ্ব রেকর্ড করেছিলেন তিনি। সেই সূত্রে গোটা দেশ চিনে গিয়েছিল বিহারের এই নেতাকে, পরবর্তীকালে যিনি কেন্দ্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন।
লালু, নীতীশ, রাম বিলাস এবং সুশীল মোদীর মধ্যে প্রথম দু’জন এবার ভোটের লড়াইয়ে আছেন। নীতীশ ক্যাপ্টেন হিসাবে সরাসরি ময়দানে। লালুপ্রসাদ বাড়ি বসে কোচের ভূমিকায় অবতীর্ণ। একাধিক নির্বাচনী সমীক্ষা বলছে, রাজ্যের ৪০টি আসনের মধ্যে ৩৭টিই পেতে পারে বিজেপি-জেডিইউ জোট। যদিও লালুপ্রসাদের দাবি, ফলটা ঠিক উল্টো হবে। এই ভোটেই নীতীশের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটবে।
নীতীশকে নিয়ে চিন্তিত তাঁর দলও। লালুপ্রসাদের সঙ্গে জোট থাকার সময় তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন তাঁর পর মুখ্যমন্ত্রী হবেন তেজস্বী। এখন জোট নেই। দলেরই কেউ তাঁর উত্তরসূরি হবেন। প্রশ্ন হল কে হবেন? দলের কাকে বেছে নেবেন নীতীশ? জবাব কারও জানা নেই।