দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাসার কন্ট্রোল রুম শুনতে পেয়েছিল মিশন কম্যান্ডারের গলা, “রজার..”। তার পরে টানা নিস্তব্ধতা।
টেলিস্কোপে চোখ রেখে দেখা গেছিল, অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে আসছে তিনটে আলোর রেখা। ঘন বাষ্প জমাট বাঁধা চাপ চাপ মেঘের মতো হয়ে আছে। তার পর সব ঝাপসা। কলম্বিয়ার সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। ফিকে হয়ে আসা আলোর রেখা এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার বার্তা বয়ে আনে। রক্তজল হয়ে যায় গ্রাউন্ড স্টেশনে নাসার বিজ্ঞানীদের। চাপা কান্না গোঙানির মতো ঠেলে বের হয়.. ‘তাহলে কি সব শেষ?’
হ্যাঁ, এভাবেই সব শেষ হয়ে গেছিল। মহাকাশ অভিযান সেরে পৃথিবীতে ফেরার পথে মাটি থেকে প্রায় দু’লক্ষ ফুট উঁচুতেই দাউদাউ করে জ্বলে যায় মহাকাশযান কলম্বিয়া।

সুনীতার ফিরে আসার আনন্দে মনে পড়ে কল্পনাকে হারানোর বিষাদও
অবশেষে অপেক্ষার অবসান হয়েছে আজ। ২৮৬ দিন পর পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন সুনীতা উইলিয়ামস (Sunita Williams) এবং ব্যারি বুচ উইলমোর (Barry Wilmore)। ভারতীয় সময়, বুধবার ভোর ৩টে ২৭ মিনিটে তাঁদের নিয়ে ফ্লোরিডার সমুদ্রে অবতরণ করেছে স্পেস এক্স-এর মহাকাশযান। এর পরেই ক্যাপসুল থেকে হাসি মুখে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় সুনীতাদের।
ভোররাতে নাসা এই ঐতিহাসিক গোটা পর্বের লাইভ টেলিকাস্ট করেছে, হাঁ করে দেখেছে বিশ্ববাসী। কেউ হেসেছে আনন্দে, কেউ কেঁদেছে আবেগে। সেই হাসিকান্নাতেই মিশে ছিল ২৩ বছর আগের একটা দিনও।

২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে কলম্বিয়ার দুর্ঘটনা ফলার মতো জেগে আছে। সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল প্রযুক্তি, সাড়া দেয়নি যন্ত্র। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে গোটা কন্ট্রোল রুম দেখেছিল সাত সাতজন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত মহাকাশচারী কীভাবে মহাকাশের বুকেই অনন্ত সমাধি নিলেন। এই দুর্ঘটনার পর টানা দু’বছর সব রকমের মহাকাশ অভিযান বন্ধ রেখেছিল নাসা।
মহাকাশ কেড়ে নিয়েছিল কল্পনা-সহ ৬ মহাকাশচারীকে
এর আগে ১৯৮৬ সালে উৎক্ষেপণের ৭৩ সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল নাসার মহাকাশযান ‘চ্যালেঞ্জার’। সেই ঘটনাও নাড়িয়ে দিয়েছিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাকে। সেই দুর্ঘটনার পরে কলম্বিয়া-মহাকাশযানের বিপর্যয়ই ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় হৃদয়বিদারক ঘটনা।

কলম্বিয়ার যে মহাকাশচারীরা সে দিন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন—রিক হাসব্যান্ড, তিনিই ছিলেন মহাকাশযানের কম্যান্ডার। ছিলেন পাইলট উইলিয়াম ম্যাককুল, পে লোড কম্যান্ডার মিশেল অ্যান্ডারসন, আয়ান রামান, ডেভিড ব্রাউন ও লরেল ক্লার্ক। তাঁদের সঙ্গেই মহাকাশে বিলীন হয়ে যান ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভশ্চর ও মহাকাশবিজ্ঞানী কল্পনা চাওলাও।

সারা পৃথিবী কল্পনাকে এই নামে চিনলেও, তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের আদরের মন্টো। মাত্র ৪২ বছরে শেষ হয়ে যায় তাঁর জীবন। জীবনের ৩১ দিন মহাকাশেই কাটিয়েছিলেন তিনি। প্রথম সফল অভিযানের পরে, দ্বিতীয় অভিযান শেষে ফেরার সময় তাঁর মৃত্যু ঘটে। কয়েক হাজার মাইল ভ্রমণ করেছেন মহাকাশে। তাই তাঁর মুখেই হয়তো মানায়, "আমি কোনও নির্দিষ্ট দেশের নয়, সৌরজগতের নাগরিক।"

অকেজো হতে শুরু করেছিল সেন্সর, আগুন ধরে গিয়েছিল মহাকাশযানে
সেদিন ঠিক কী হয়েছিল সে নিয়ে দফায় দফায় তদন্ত করেছে নাসা। কী জানা গেছে সেই তদন্তে জানিয়েছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা।
তথ্য বলছে, কেপ কানাভেরাল থেকে উৎক্ষেপণের ৮২ সেকেন্ড পর থেকেই গন্ডগোলটা শুরু হয়েছিল। স্পেস সেফটি ম্যাগাজিনে লেখা হয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটিই কলম্বিয়া ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ। মহাকাশবিজ্ঞানের আরও উন্নতির জন্যই মহাকাশ-বীরদের পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মহাকাশযানে কী ধরনের বদল দরকার, তাতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

ম্যাগাজিনে মহাকাশ গবেষকরা বলেছেন, মহাকাশযানের সমস্ত সেন্সর একে একে অকেজো হতে শুরু করেছিল। রেডিও সিগন্যাল কাজ করছিল না সেভাবে। মরিয়া হয়ে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন সেই মিশনের কম্যান্ডার। তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন কন্ট্রোল রুমের আধিকারিকরা। তার পর সব শান্ত হয়ে যায়। যোগাযোগ পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায় কলম্বিয়ার সঙ্গে।

এদিকে হাইড্রলিক ট্যাঙ্কে লিক হতে শুরু করেছিল। গ্যাস বেরিয়ে আসছিল বাইরে। ঘর্ষণ আর তাপে তাতে আগুন ধরে গিয়েছিল। মহাকাশযান সেই তাপিত পরিবেশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। শব্দের চেয়ে ১৮ গুণ দ্রুত গতিতে ছুটছিল কলম্বিয়া। ভূমি থেকে ৬১ হাজার ১৭০ মিটার ওপরে হাইপারসনিক বেগে ধাবিত কলম্বিয়া অনিয়ন্ত্রিত হয়ে তাতে আগুন ধরে গিয়েছিল। সেই আগুনের রেখাই দেখা গিয়েছিল কলম্বিয়ার আকাশে। মহাকাশযান থেকে বেরনো বাষ্প জমাট বেঁধে মেঘের মতো সমাধি তৈরি করেছিল। সেখানেই ছাই হয়ে মিশে গেছিলেন কল্পনা চাওলা ও তাঁর ৬ সঙ্গী।

হরিয়ানা দিয়ে শুরু, 'স্কাই ইজ় দ্য লিমিট'
১৯৬১ সালের ১৭ মার্চ হরিয়ানার কার্নালে একটি গোঁড়া পরিবারে জন্মেছিলেন কল্পনা। যে রাজ্যে মেয়েদের জন্মাতে দেওয়া হয় না, জন্মালেও সম্মান রক্ষার্থে খুন হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, যে রাজ্যে মেয়ের সংখ্যা কম হওয়ায় একই মেয়েকে পরিবারের পাঁচ ভাই মিলে বিয়ে করার ঘটনা ঘটে, যে রাজ্যে লিঙ্গ বৈষম্য দেশের মধ্যে সব চেয়ে বেশি, সেই রাজ্যে জন্ম নেওয়া একটা মেয়ের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখাটাই ছিল অলীক কল্পনা।

সেই কল্পনাকেই সত্যি করেছিলেন কল্পনা নিজে। শুধু নিজের জন্য নয়। তাঁর এই স্বপ্ন সফল করার উড়ান সারা দেশেই সামাজিক ভাবে প্রান্তিক করে রাখা মেয়েদের স্বপ্ন দেখার ইচ্ছেটাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন কয়েক ধাপ। তাই তাঁর জন্যই বোধ হয় বলা যায়, 'স্কাই ইজ় দ্য লিমিট'।
ছোটবেলায় সবেতেই তুখোড় ছিলেন কল্পনা। পড়াশোনায় সব সময় প্রথম দিকেই থাকত নাম। ভালোবাসতেন কবিতা আর নাচ। সাইক্লিং-এ ছিলেন ওস্তাদ। প্রতিটি দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান ছিল তাঁর বাঁধা। ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। হরিয়ানার মতো জায়গায়, সংরক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে উঠেও, চাপা ছিল না তাঁর প্রতিভা ও জেদ।

সেই জেদের জোরেই পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন তিনি। পরে আমেরিকা যান ১৯৮২ সালে। দু'বছর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে মাস্টার অফ সায়েন্স ডিগ্রি পান। আরও চার বছর পরে, ১৯৮৮ সালে নাসায় যোগ দেন। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং চট করে যে কোনও কিছু শিখে নেওয়ার প্রতিভা তাঁকে আরও দক্ষ করে তোলে।
পাঞ্জাবে স্নাতক স্তর পর্যন্ত পাশ করা কল্পনা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, নাসায় যোগ দিতে হলে যে বিদেশেই পড়াশোনা করতে হবে, তার কোনও মানে নেই। কয়েক বছরেই স্বীকৃত পাইলট হয়ে ওঠেন কল্পনা। পরে নাসা রিসার্চ সেন্টারে ওভারসেট মেথডসের ভাইস প্রেসিডেন্টও হন।

বাণিজ্যিক উড়ান চালানোর অনুমোদনও ছিল তাঁর। ছিল সামুদ্রিক বিমান এবং মাল্টি-ইঞ্জিনের প্লেন চালানোর লাইসেন্সও। পরে ফ্লাইট ইনস্ট্রাকটরও হয়েছিলেন তিনি।
কেনেডি স্পেস সেন্টারের হইচই বদলে গেছিল হাহাকার আর বিষাদে
এর মধ্যেই বিয়ে করেন মার্কিন লেখক জাঁ-পিয়ের হ্যারিসনকে। তিনিই পরে কল্পনা চাওলার জীবনী লেখেন ও প্রকাশ করেন। দ্য এজ অফ টাইম। ১৯৯১ সালে কল্পনা মার্কিন নাগরিকত্ব পেলে নাসার অ্যাস্ট্রোনট কোরের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পান কল্পনা। এর ছ’বছর পরে পাড়ি দেন প্রথম মহাকাশ অভিযানে।

১৯৯৭ সাল। মহাকাশযান কলম্বিয়া এসটিএস ৮৭-তে মিশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ৩৭২ ঘণ্টা মহাকাশে কাটান তিনি। পৃথিবীর কক্ষপথে ২৫২ বার পরিক্রমা করেন। ১০০ লক্ষ মাইলেরও বেশি ভ্রমণ করেন মহাকাশে। ২০০০ সালে কলম্বিয়া এসটিএস ১০৭-এর মহাকাশ অভিযানে ফের মহাকাশে যাওয়ার সুযোগ পান কল্পনা।
নানা কারণে পিছিয়ে যাওয়ায় শেষমেশ ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি মহাকাশযাত্রা করেন কল্পনারা। তিনি ছাড়াও আরও ছয় মহাকাশচারী ছিলেন ওই অভিযানে। ১ ফেব্রুয়ারি ফেরার পথে ঘটে যায় দুর্ঘটনা।

কেনেডি স্পেস সেন্টারে সেদিন রীতিমতো হইচই চলছে। মহাকাশযাত্রা শেষে পৃথিবীর বুকে ফিরে আসছিলেন ৭ মহাকাশচারী। মহাকাশ অভিযানের চরমতম সাফল্যের দিন হতে চলেছিল সেটি। মহাকাশচারীদের অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত ছিল নাসার কন্ট্রোল রুম। সেসবই বদলে গেছিল হাহাকার আর বিষাদে। ব্যর্থতায়। হতাশায়।

‘তোমরা যখন নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে চেয়ে থাকবে...’
মৃত্যুর পরে বহু সম্মান জুটেছে কল্পনার। তাঁর নামে একটি গ্রহাণু ও একটি উপগ্রহের নামকরণ করা হয়েছে। মঙ্গল গ্রহে কলম্বিয়া হিলস অঞ্চলে একটি পাহাড়েরও নাম রাখা হয়েছে চাওলা হিল। প্রথম আবহাওয়া উপগ্রহের নাম দেওয়া হয় কল্পনা-১। তাঁর নামে একটি সুপার কম্পিউটারও আছে। এ ছাড়াও যে সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েছেন, সেখানকার ডর্মিটরি, প্রবেশপথের নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে। তাঁর নামে চালু হয়েছে বৃত্তি, পদক, সম্মান। তিনি নিজেও বহু মরণোত্তর সম্মান পেয়েছেন।
সৌরজগতের নাগরিক হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়া কল্পনার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল দেশ জুড়ে। আজও ভারতের মহাকাশ চর্চায় তাঁর অবদান ভোলেননি কেউ। তিনি বলেছিলেন— ‘তোমরা যখন নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে চেয়ে থাকবে, তখন তোমাদের মনে হবে তোমরা কোনও নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নয়, এই সৌরজগৎ থেকেই এসেছো।’

সৌরজগতের সেই বিশালতার সামনেই ক্রমে ফিকে হয়েছে মানুষের মনে তাঁর অস্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুর শোকেও সময়ের প্রলেপ পড়েছে। তবু এই বিশেষ দিনগুলোয় জেগে ওঠে তাঁর স্মৃতি। মনে পড়ে, গোটা দেশের মুখ উজ্জ্বল করে তিনি নিজেই বিলীন হয়ে গিয়েছেন নক্ষত্রের দুনিয়ায়।