দ্য ওয়াল ব্যুরো: "আপনি তো মেয়েই নন", মডেলিং কেরিয়ারের শুরুর দিকে শুনতে হয়েছিল আর্চিকে। প্রত্যুত্তরে আর্চি জবাব দিয়েছিলেন, "আমি তো মেয়েই। আমি হিজড়ে। আবার আমি একজন নারীও। আমার অফিসিয়াল গভর্নমেন্ট আইডিতে আমি যে মেয়ে, সেটাই লেখা। এর জন্যে আমি তো অপারেশনও করিয়েছি। তাহলে অসুবিধা কোথায়!" কিন্তু ফোটোশ্যুটের জন্য তাঁদের নারী শরীরই প্রয়োজন ছিল। বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন আর্চিকে।
সেই থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু দিল্লির ২২ বছরের রূপান্তরকামী মডেল আর্চি সিংয়ের। ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা আর্চি ছোট থেকেই নিজের শারীরিক চাহিদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি মনে মনে নিজেকে মেয়ে বলে মেনে নিতেন। আসল সত্যিটা জানার পর পরিবারের সদস্যদের থেকে পেয়েছিলেন ভরসাও। সমাজ আর্চিকে ক্ষত-বিক্ষত করলেও আজ ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আর্চি সিং কলোম্বিয়াতে 'মিস ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্স ২০২১'-এ অংশগ্রহণ করতে চলেছেন।

নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখেননি, এক মুহূর্ত ভেঙেও পড়েননি। বরং দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছেন দেশের মানুষকে রূপান্তরকামীদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়ার জন্য। কাজও শুরু করেছিলেন এই নিয়ে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিজের আসল পরিচয় নিয়েই মডেলিং কেরিয়ারে পা রাখেন আর্চি। "শুরু থেকেই চেয়েছিলাম আমি যেমন, আমি যা, মানুষ আমাকে সেভাবেই চিনুক। পরিচয় লুকিয়ে আমি জিততে চাইনি কখনও"-- বলেছেন আর্চি।
মডেলিং কেরিয়ারের আগে আর্চি সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখনও আছেন। এসম্পর্কে আর্চি বলেন, "সামাজিক কাজকর্মের মধ্যে ট্রান্সজেন্ডারদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলাম নিজের কাঁধে। মডেলিং শুরু করার পর কাজটা একটু সহজ হয়েছে আমার জন্য। ট্রান্স মডেল হয়েই আমি কাজ করছি। আমাকে দেখে সাধারণ মানুষ ভাববে, তাঁদের ধারণা বদলাবে, এটাই আমি চাই।"

মডেলিংয়ের শুরুর দিকে নানাভাবে টিকা-টিপ্পনি, হাসাহাসি, অপমান করা হত আর্চিকে। সবটা সহ্য করে কয়েক মাস পরে নিজেকে নারীর সম্মান দেওয়ার জন্য তিনি লিঙ্গ পরিবর্তন করেন। সেই থেকেই শুরু আর্চির উত্থান। বলা যেতে পারে তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ একেবারে উর্ধ্বমুখী। এরপরেই 'মিস ট্রান্স ইন্ডিয়া'র মুকুট ওঠে আর্চির মাথায়। তার পরেই নানা ফোটোশ্যুটে, কয়েকটি নামকরা ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ড-অ্যাম্বাসেডর, ফ্যাশন শোয়ের শো-স্টপার হিসেবে আর্চির মুখ দেখা যায়।
এক সাক্ষাৎকারে আর্চি বলেন, "আমার স্কিল বা লুকের কারণে আমাকে বাদ দেওয়া হত না। বরং আমি ট্রান্স, এটা জেনেই আমাকে দূরে ঠেলে দিতেন কেউ কেউ।" আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার আগেই আর্চি জানালেন হয়তো এরপর ট্রান্স মহিলাদের সম্পর্কে ধারণা বদলাবে মানুষের। প্রয়োজনে তিনি এই নিয়ে ভারতের সর্বত্র ক্যাম্পেন করতেও রাজি।

একুশ শতকে দাঁড়িয়েও "তাঁদের মুখ দেখলে দিন খারাপ যাবে"র ধারণা এখনও বদলায়নি। শিক্ষিত মানুষরাও রূপান্তরকামীদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেন। সবার মাঝে এমন কাউকে পেলে, মজা করতে ছাড়েন না কেউ। চাকরিক্ষেত্রেও সুযোগ কম। বাচ্চা হলে, কখনও বা ট্রাফিক সিগন্যালে হাত পেতে ঘুরতে দেখা যায় অনেককেই। এই রুচির পরিবর্তন ঘটাতে চাইছেন আর্চি। বলেছেন, "লিঙ্গ কখনই কোনও কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মানুষের যোগ্যতা মনুষ্যত্বের মধ্যেই বিরাজ করে। আমি চাইব দেশের মানুষ দেখুক শুধু রূপান্তরকামী হিসেবে নয়, আমি ভারতবর্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখছি।"