
শেষ আপডেট: 9 May 2023 15:42
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhaskar Banerjee), নয়ের দশকের বাংলা ছবির চকোলেট হিরো। যদিও এখন টেলিভিশনে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে ভাস্কর জনপ্রিয় মুখ। কিন্তু তখন ভাস্কর মানেই মিষ্টি মুখ মিষ্টি হাসি। তাঁর সঙ্গে মারপিটের গল্প একদমই যায় না। ভাস্কর মুখ্য ভূমিকায় যে দু'টি ছবি দিয়ে টলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেন, সে দু'টি ছবি হল 'বৌরাণী' এবং 'শ্বেত পাথরের থালা'। আজও দু'টি ছবি টেলিভিশনে সর্বাধিক টিআরপি দেয়। এই দু'টি ছবিই ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনেরও প্রথম হিট।
কিন্তু ভাস্কর এর আগেই কাজ করেছেন মুখ্য চরিত্রে, নায়কের ভূমিকায়। সেই ছবিগুলি আজ আলোচনার বাইরে, অনেকেই জানেন না। তবে ভাস্করের প্রথম কাজ, সমরেশ মজুমদারের কাহিনি অবলম্বনে 'কালপুরুষ' (Samaresh Majumdar Kalpurush)। প্রৌঢ় অনিমেষের ছেলে অর্কর ভূমিকায় অভিনয় করেন ভাস্কর। কালপুরুষে অর্কই যেন নতুন যৌবনের দূত। এমন একটি চরিত্র দিয়ে ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র জগতে আসা। কিন্তু দুঃখের কথা এই 'কালপুরুষ' ছবিটি মুক্তির আলো কখনও দেখেনি। 'কালপুরুষ' এই চলচ্চিত্রটি কখনও দেখতে পেল না বাঙালি। এই দিয়েই হয়তো ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরের অভিনয় জীবন শুরু হত। আসলে সমরেশ মজুমদারের হাত ধরেই ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের টলিপাড়ায় আসা। সেই গল্পই শোনালেন ভাস্কর।
আমার বাবা মন্টু ব্যানার্জীর প্রথম অভিনীত ছবি ‘জীবন মৃত্যু’। ছবিটার প্রযোজকও ছিলেন বাবা নিজে এবং ওঁর কয়েকজন বন্ধু। পরিচালক হীরেন নাগ। উত্তম-সুপ্রিয়া ছিলেন নায়ক-নায়িকা। কিন্তু আমার বাবা কারও কাছেই পার্ট চাইতে পারতেন না। তাই বাবার ছবির সংখ্যাও কম অভিনয় জীবনে। কিন্তু উত্তমকুমার খুব স্নেহ করতেন বাবাকে। কারণ আমার বাবা উত্তম কুমারের স্তাবকদের মতো ছিলেন না। সমালোচনাও করতেন উত্তমের, ওঁর সামনেই। খোলাখুলিই বলতেন, এই ছবিতে এই জায়গাটা ওরকম না করতে পারতেন। উত্তম কুমার শুনতেন, বুঝতেনও। ভালবাসতেন বাবাকে। ‘জীবন-জিজ্ঞাসা’ ছবিও বাবা প্রযোজনা করেন পরে। এছাড়া অভিনয় করেছেন জয় জয়ন্তী, নবরাগ, রোদন ভরা বসন্ত, ধন্যি মেয়ে, রৌদ্র ছায়া, হার মানা হার, বহ্নিশিখা প্রভৃতি অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন বাবা।
বাবা কফি হাউসে যেতেন আড্ডা দিতে। সেখানে বাবার বন্ধু ছিলেন সমরেশ মজুমদার। বাবার সঙ্গে ঘুরতে, পকোড়া খেতে কয়েকবার কফি হাউসে গেছিলাম। বাবা একদিন বললেন “সমরেশ মজুমদার তোকে দেখেছেন, একটা উপন্যাস লিখেছেন। ‘কালপুরুষ’। তাতে অর্কর চরিত্রে তোকে নেবেন বলছেন। উনি তোকে কফি হাউসে দেখেছেন। আমি বলেছি লেখাপড়া করছে এখন সিনেমা করলে উচ্ছনে যাবে।” এর পরে সমরেশ কাকা আমাদের বাড়িতে এসে বললেন, লেখাপড়া বাঁচিয়েই কাজ করাব। খুব বেশি দিন লাগবে না। তো সেই করলাম প্রথম ছবি।
এর আগে আমার প্রথম টেলিভিশনে কাজও সমরেশ কাকার কাহিনি, 'উৎসবের রাত' সিরিয়ালে। সব পরপর। সোনেক্সের প্রোডাকশন, বিভাস চক্রবর্তী পরিচালক ছিলেন। ১৯৮৫ তখন। 'উৎসবের রাত' দিয়ে আমার প্রথম অভিনয়ে হাতখড়ি। প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো। তারপর প্রথম ছবি 'কালপুরুষ' করলাম। দুটোই সমরেশ কাকুর রেকমেন্ডশানে।

‘কালপুরুষ’ অনেকবার হয়েছে। আমারটা প্রথম ‘কালপুরুষ’, সেখানে অনিমেষ করেছিলেন প্রদীপ মুখোপাধ্যায় আর মাধবীলতা করেছিলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। আমার জীবনের প্রথম শট সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আবার আমার গুরু উত্তম কুমারের শেষ অভিনয়ের শেষ নায়িকা সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কালপুরুষ ছবিটা রিলিজ করল না শ্যুটিং করেও। ডিরেক্টর ছিলেন চন্দন চন্দ। ইনি বেহালা বিবেকানন্দ কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। এটাই ওঁর প্রথম পরিচালনা ছিল।
আশি ভাগ শ্যুটিং হয়েছিল। শ্যুটিংয়ের আউটডোরে আমরা জলপাইগুড়ি গেছিলাম। জলপাইগুড়িতে সমরেশ মজুমদারের বাড়ি আছে। উনি তো উত্তরবঙ্গের ছেলে আদতে। টেকনিক্যাল ফল্টের জন্য ছবিটা আর রিলিজ করল না।
সমরেশ কাকা আমাদের বাড়ি খুব আসতেন। তেলেভাজা-মুড়ি খাওয়া হত। সেসব একটা দিন গেছে। ওঁর মেয়েদের সঙ্গেও আমার ভাল সম্পর্ক। কাকিমা মানে ওঁর স্ত্রী কয়েক মাস আগেই চলে গেলেন, এবার সমরেশ কাকাও চলে গেলেন।
সেটাও সমরেশ কাকার হাত ধরে। বলতে গেলে আমার চলচ্চিত্র দুনিয়াতে আসা সমরেশ মজুমদারের হাত ধরেই। 'উৎসবের রাত' সিরিয়াল তো সম্প্রচার হয়েছিল। যখন জলপাইগুড়িতে 'কালপুরুষ'-এর কাজ করছি তখন দ্বিতীয় ছবির জন্য আমাকে পছন্দ করা হয়।
কালপুরুষ রিলিজ না হলেও সমরেশ মজুমদার মারফত অগ্রগ্রামীর সহকারী পরিচালক জয়ন্ত ভট্টাচার্য আমায় নিয়ে গেলেন চিত্রলিপি ফিল্মসের অফিসে বিমল দে-র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। ওঁরা ছবি করছিলেন ‘টুনি বউ’। তাঁর পরিচালকও ছিলেন হীরেন নাগ। এটা একটা অদ্ভুত সমাপতন, বাবা আর আমার দু’জনের প্রথম রিলিজড ছবি হীরেন নাগের পরিচালনায়। ১৯৮৭-এর পয়লা বৈশাখে রিলিজ করেছিল 'টুনি বউ'।
সমরেশ মজুমদারের গোরা-টিনাকে প্রথমে পছন্দ ছিল না, 'তেরো পার্বণ' নিয়ে অজানা গল্পে খেয়ালি