.webp)
বহু ঘাত-প্রতিঘাতের ইতিহাসের সরণি বেয়ে আজ এখানে এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশ।
শেষ আপডেট: 6 August 2024 13:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার পর থেকে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের ইতিহাসের সরণি বেয়ে আজ এখানে এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। এতকাল যাঁরা দেশশাসন করেছেন, তাঁদের কেউ রাষ্ট্রপতি, কেউ প্রধানমন্ত্রী, কেউ প্রধান উপদেষ্টা আবার কেউ সামরিক শাসন জারি করে দেশ শাসন করেছেন।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে সংসদীয় সরকার করে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আবার ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পুনঃপ্রবর্তন করে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছে আওয়ামি লিগ এবং দলের সভানেত্রী তথা মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, আওয়ামি লিগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ক্ষমতায় ছিল প্রায় ১৩ বছর আর প্রয়াত হুসেন মহম্মদ এরশাদ প্রথমে সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় ৯ বছর দেশ শাসন করেছেন। একনজরে দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন কারা?
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে আটক ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনিই ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। পাকিস্তানের জেল থেকে থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি হিসেবেই শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরেন ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে। ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। আগের দিন ১১ জানুয়ারি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি আবু সইদ চৌধুরি। তাঁর পর তৎকালীন স্পিকার মহম্মদুল্লা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এর কয়েক মাস পর অগাস্টের ১৫ তারিখে একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। তখন বিদেশে থাকায় সদ্য পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান।
খন্দকার মোশতাক আহমাদ
১৫ অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তারা আওয়ামি লিগের একজন বর্ষীয়ান নেতা খন্দকার মোশতাক আহমাদকে রাষ্ট্রপতির পদে বসান। একই দিন তিনি দেশে সামরিক আইন জারি করেন। তবে বাংলাদেশের রাজনীতির সেই অস্থির সময়ে সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থানের জের ধরে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
৩ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থান আহমাদের পতন ডেকে আনে। সেদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক একজন প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি ও দু'জন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সহ চারজন শীর্ষস্থানীয় আওয়ামি লিগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করে সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার। তিনদিন পর খন্দকার মোশতাক আহমাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান পদচ্যুত হন। অভ্যুত্থানের নেতা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন এবং ৬ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করেন। পরের দিনই বদলে যায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। সেনা বিদ্রোহে নিহত হন অভ্যুত্থানের নায়ক খালেদ মোশারফ, সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আবার চলে যায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে। তবে বিচারপতি সায়েম ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন, যদিও ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে।
জিয়াউর রহমান
সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের জের ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। তাঁকে চিফ অফ আর্মি স্টাফস এবং উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। এরপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট সায়েমকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতি হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
বছরখানেক পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন জেনারেল রহমান এবং ১৯৭৮ সালের ৩ জুন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একই বছর ১ সেপ্টেম্বরে নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেন জিয়াউর রহমান যার নাম হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে নিহত হন জিয়াউর রহমান।
আব্দুস সাত্তার ও আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সান উদ্দীন চৌধুরি
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেন মহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান তিনি ও রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সানউদ্দিন চৌধুরি। কিন্তু, ২৭ মার্চ, ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব শুরু করে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে সরে যান তিনি।
হুসেন মহম্মদ এরশাদ
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করে বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক শাসন জারি করেন এরশাদ। এরপর ১৯৮৬ সালে নির্বাচনের আয়োজন করে ফের রাষ্ট্রপতি হন তিনি এবং শেষে প্রবল গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর।
সাহাবুদ্দিন আহমদ
এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। সকল বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ একটি 'নিরপেক্ষ নির্দলীয় তদারকি' সরকার গঠন করেন, যার একমাত্র দায়িত্ব ছিল তিন মাসের মধ্যে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। তাঁর শাসনকালে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি।
খালেদা জিয়া
১৯৯১ সালের অগাস্টে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাশ হলে ১৭ বছর পর আবার সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ওই বছরের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার প্রধান হন। ওই বছরেরই অক্টোবরে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ বিদায় নেওয়ার পরে রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। খালেদা জিয়ার সরকারের শেষ দিকে বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে।
ওই আন্দোলনের মধ্যেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন হলেও তা বর্জন করে আওয়ামি লিগসহ তখন অধিকাংশ বিরোধী দল। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে। নির্বাচনে জিতলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য সংবিধান সংশোধনের পর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি তিনি।
৩০ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন খালেদা জিয়া।
শেখ হাসিনা
বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন আওয়ামি লিগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর শাসনকালে আব্দুর রহমান বিশ্বাসের মেয়াদের পর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। রহমানের অধীনে ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আসেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া।
আবার খালেদা জিয়া
২০০১ সালের অক্টোবরে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন বিএনপি নেত্রী খালেদা। তাঁর এই মেয়াদের শেষ দিকে এসে সংবিধানের একটি সংশোধনীকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলো ফের আন্দোলন গড়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত তীব্র আন্দোলনের মুখে পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন খালেদা জিয়া।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাপক হিংস্র রূপ নিলে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের তৎকালীন গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমদ।
ফখরুদ্দিন আহমদ
২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সরকার প্রধানের দায়িত্ব নেন তিনি। সেনা সমর্থন নিয়ে প্রায় ২ বছর সরকার প্রধানের ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। যদিও তার পদ ছিল প্রধান উপদেষ্টার। তাঁর সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয় পেয়ে ফের ক্ষমতায় আসেন আওয়ামি লিগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর হাতেই ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়।
ফের শেখ হাসিনা
মূলত শেখ হাসিনাই এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের সরকার প্রধান। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় বারের মতো, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তৃতীয় বার এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে চতুর্থ বার এবং শেষ নির্বাচনেও জিতে প্রধানমন্ত্রী হন। তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেও এর পরের নির্বাচনগুলো শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই হয়েছে।