বাংলাদেশে (Bangladeshi ilish) মা ইলিশ রক্ষা অভিযান ঘিরে বরিশাল ও ভোলার নদীগুলিতে উত্তেজনা বাড়ছে। অবৈধভাবে মাছ ধরায় প্রশাসনের নজরদারি শুরু হতেই জোট বেঁধে আক্রমণ চালাচ্ছে জেলেদের একাংশ।

ছবি: এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 18 October 2025 19:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশে (Bangladeshi ilish) মা ইলিশ রক্ষা অভিযান ঘিরে বরিশাল ও ভোলার নদীগুলিতে উত্তেজনা বাড়ছে। অবৈধভাবে মাছ ধরায় প্রশাসনের নজরদারি শুরু হতেই জোট বেঁধে আক্রমণ চালাচ্ছে জেলেদের একাংশ। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, এবারের অভিযান অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
কীর্তমখোলা, কালাবদর, মেঘনা নদী পরিদর্শনে গিয়ে বিবিসির প্রতিবেদক দেখতে পান— প্রশাসনের অভিযান টের পেতেই পালাচ্ছে জেলেরা, আবার কোথাও কোথাও সংঘবদ্ধ হয়ে ইট-পাটকেল ছুড়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। কালাবদর নদীর মোহনায় তো সাংবাদিকদের স্পিডবোটকেই ঢিল ছুঁড়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
জেলেরা নিজেরাও স্বীকার করছেন, কারেন্ট জাল (অবৈধ সূক্ষ্ম জাল) বন্ধ না হলে ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই জালের উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ না করলে অভিযান ব্যর্থ হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে এই কারেন্ট জাল কী?
কারেন্ট জাল হল এক ধরনের বিশেষ জাল যা দিয়ে জলের নিচে বিদ্যুৎ প্রবাহ ব্যবহার করে মাছ ধরা হয়। এই জালে বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে মাছেরা স্তব্ধ বা নিস্তেজ হয়ে যায়, যার ফলে তাদের ধরা সহজ হয়। তবে, এটি মাছের বংশবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মৎস্য সম্পদের জন্য ক্ষতিকর এবং অনেক দেশে এটি নিষিদ্ধ।
কারেন্ট জালের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক প্রবাহ ব্যবহার করে মাছকে সাময়িকভাবে অচৈতন্য করা হয়, যাতে তারা জালে আটকা পড়ে। এটি মাছ ধরার প্রক্রিয়াকে সহজ করলেও, এটি মাছের প্রজনন এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
মৎস্য কর্মকর্তাদের অভিযোগ— নদীতে অভিযান চালাতে গেলেই জেলেদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে। একজন সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, “শুধু এই এগারো দিনেই পাঁচবার ধাওয়া খেয়েছি। ওদের হাতে বাঁশ, দা, ট্যাঁটা— সব রকম অস্ত্র থাকে।”
ভোলার সহকারী কমিশনার এস এম মশিউর রহমান বলেন, জেলেদের মধ্যে এখন এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে— “প্রশাসনের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দাঁড়াতে পারলে অভিযানকারীরা ফিরে যেতে বাধ্য।” এই মানসিকতাই পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে বলে জানান তিনি।
প্রশাসনের দাবি, বড় স্পিডবোট ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক না থাকায় কার্যকরভাবে অভিযান চালানো যাচ্ছে না। অনেক সময়ে ছোট নৌকা নিয়ে অভিযান চালাতে গিয়ে কর্মকর্তারা হামলার মুখে পড়ছেন। বরিশালের এক ঘটনায় একটি স্পিডবোট ডুবে যায় এবং আনসারের একটি আগ্নেয়াস্ত্রও হারিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত জেলেদের একটি বড় অংশ বলছে, মাছ ধরা ছাড়া তাদের আর কোনও উপায় নেই। এক জেলে বলেন, “জাল কিস্তিতে কিনেছি। টাকা না তুললে কীভাবে চলব? সরকারি চাউল সবাই পায় না। সহায়তা না পেলে জেলেরা নদীতে নামবেই।”
এ বছর প্রজনন মৌসুমে প্রায় ৭ লক্ষ ৪৩ হাজার জেলে নদীতে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার জেলে কোনও সরকারি সহায়তার আওতায় নেই।
বাংলাদেশে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও ভারতের সঙ্গে কোনও যৌথ উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশি জেলেরা অভিযোগ করছেন, ভারতীয় জেলেরা সীমান্ত পেরিয়ে ইলিশ শিকার করছে। তবে কোস্টগার্ড দাবি করেছে, এ বছর এখনও কোনও ভারতীয় অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি।
অভিযানের প্রথম দশ দিনে ৪,২৫৪টি অভিযান ও ৯৭৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। ৫৩.৫ মেট্রিক টন ইলিশ বাজেয়াপ্ত হয়েছে, ১,০৭৬টি মামলায় জরিমানা আদায় হয়েছে ৩৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ৮৬৪ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাজেয়াপ্ত সরঞ্জাম নিলামে বিক্রি করে ২৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫.৭১ লাখ টন। ২০২৩–২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫.২৯ লাখ টনে। প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, এই বছরও উৎপাদন কমার আশঙ্কা প্রবল।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র মা ইলিশ রক্ষা অভিযান যথেষ্ট নয়। জাটকা নিধন রোধ ও অবৈধ জাল উৎপাদন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে।